Featured আমেরিকা ভ্রমণ যুক্তরাষ্ট্র

ভ্রমণের গল্পে জীবনের গল্প; ‘নিউইয়র্ক সেন্ট্রাল পার্ক’ পর্ব- ০৩

প্রতিদিন আমার কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার সময় এই পার্কটির নিচ দিয়ে আসা যাওয়া হত, মানে সাবওয়ে ট্রেনে করে যখন মাটির নিচ দিয়ে আসা যাওয়া করতামসবার মুখে শুনতাম এটি অনেক বড় একটি পার্কপার্কটি নিউ ইয়র্ক স্টেটের ম্যানহাটান সিটির কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত

প্রতিবছর প্রায় ৪০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ এই পার্কটি ভ্রমণ করতে আসেন। এটি নর্থ ১১০ নাম্বার স্ট্রিট থেকে শুরু হয়ে সেন্ট্রাল পার্ক সাউথ ৫৯স্ট্রিট, এবং সেট্রাল পার্ক ওয়েস্ট ৮ নাম্বার এভিনিউ থেকে ৫ নাম্বার এভিনিউ পর্যন্ত বিস্তৃত।

এই ভ্রমণগুলো বেশির ভাগ সময়ই একা একা করেছি, যখন নিউ ইয়র্কে একেবারে নতুন তখনকার কথা। তো একদিন ছিল শুক্রবার এবং ঐদিন আমার ছুটির দিন। চিন্তা করলাম জুম্মাহ পড়ে বাসায় খাওয়া দাওয়া করে এই পার্কে ঘুরে বেড়াবো। যেই কথা সেই কাজ। বাসা থেকে ফুফুরা জিজ্ঞেস করছিলো কোথায় যাচ্ছি? বললাম একটু ঘুরে আসি। ব্যস বিকেল তিনটের দিকে এফ ট্রেন নিয়ে সাটপিন বুলেভার্ড থেকে রওয়ানা দিলাম। ৫৭ স্ট্রিটে গিয়ে ট্রেন থেকে নামলাম।

সাবওয়ে থেকে উপরে উঠেই দেখি মানুষ আর মানুষ। এযেন এক জনসমাবেশ। আসলে রাস্তায় যে পরিমান মানুষ হাঁটা চলা করছে সেটা দেখেই আমি এক প্রকার আর্শ্চয্য হয়ে গেলাম। ছোট বেলায় একটা ধারণা ছিল আমেরিকায় সব মানুষ বড় লোক, এরা সবাই গাড়ি নিয়ে চলাফেরা করে।

এদের মধ্যে তেমন কাউকে দেখবোনা ফুটফাতে হাঁটা চলা করতে। কিন্তু ম্যানহাটানে এই জিনিস দেখার পর আমার ভুল ভাঙতে শুরু করলো। আসলে ওটা ছিল ছেলেবেলার ভাবনা। এই দেশে মানুষ যে পরিমান হাঁটে তা সত্যিই বলা বাহুল্য। শরীর ভালো রাখার জন্য হলেও ওরা প্রচুর হাঁটে।

যাই হোক, ৫৭ স্ট্রিট ধরে পার্কের উদ্দেশ্যে হাঁটতে শুরু করলাম। পার্কে ঢুকার আগেই যে জিনিসটি আমাকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছে সেটা হচ্ছে পেইন্টিং। এক ভদ্রলোক পার্কের এন্ট্রেন্স পয়েন্টে বসে আছে, যদি কেউ নিজের প্রতিকৃতি অঙ্কন করাতে চায় তাহলে এই সেই ব্যক্তি, যে হুবহু ৯০ পার্সেন্ট মানুষের ছবি তুলির রঙে এঁকে যাচ্ছে।

কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে উনার চিত্র অঙ্কন দেখলাম। ভদ্রলোক হঠাৎ করে জিজ্ঞেস করে ‘তুমি কি তোমারটা আঁকাতে চাও’, আমি ধুরু ধুরু মনে কিছুই বলিনি, কারণ আমার পকেটে ছিল মাত্র ২০ ডলার। সেই লোক চার্জ করতেছিলো যতদূর মনে পড়ে ৫০ ডলারের মত। তাই আর নিজের ছবি আঁকানো হল না।

পার্কে আমি ঢুকতেই পারছিনা, কারণ পার্কে ঢুকার পূর্বেই যা দেখছি তাতেই আমি মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছি। দেখি কিছু ঘোড়ার গাড়ি। টগবগ টগবগ করে মানুষদেরকে নিয়ে ঘুরছে। ওখানেও জানি কত ডলার করে লাগে ঘোড়ার গাড়িতে চড়তে গেলে, সেটাও হয়নি। যেটা সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল সেটা হচ্ছে, প্যান্ট পরে অনেকেই দেখি রিক্সা চালাচ্ছে, আর সব গুলো রিক্সাচালক দেখতে এত সাদা এবং সুন্দর, কি বলবো শুধু ভাবছিলাম এত সুন্দর সুন্দর ছেলেরা রিক্সা চালায় কেন?

তখন ভাবলাম এই রিক্সাতেই মনে হচ্ছে ঘুরে বেড়ানোর ক্ষমতা আমার আছে। জিজ্ঞেস করলাম, কত নিবে সেন্ট্রাল পার্কের ভিতর ঘুরতে গেলে? বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না, এই রিক্সা চালক মুহূর্তেই আমার হৃদয় ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। ওর চার্জই হচ্ছে ১০০ ডলার। তারপর আছে বকশিস। এই কথা শুনে আমি আস্তে করে হাঁটা দিলাম এবং পার্কের ভিতরে হাঁটার পথ খুঁজতে লাগলাম।

কিছুক্ষন হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে দেখি, কেউ জগিং এর জন্য দৌঁড়াচ্ছে, কেউ বাই সাইক্লিং করছে, কেউ পার্কের মধ্যে লেকের ছোট্ট ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে ফটোশুট করছে, কেউ হংসমিথুনদের ডেকে ডেকে খাবার বিলিয়ে দিচ্ছে। রাস্তার পাশে ছোট ছোট ভ্যান গাড়ি গুলোতে নানান রকমের খাবার সামগ্রী। পাশে আবার আইসক্রিমের গাড়ি গান শুনিয়ে শুনিয়ে আইসক্রিম বিক্রি করছে।

পার্কের ভিতরে অনেক জায়গায় বিশাল আকৃতির অনেকগুলো পাথর আছে, যেগুলো পার্কের সৌন্ধর্য্য বৃদ্ধিতে অনেক সহায়তা করেছে। পার্কের ভিতরেই একটি লেক আছে, যেখানে অনেক মানুষ বোটিং করতে করতে নিজেদের আনন্দগুলো প্রিয়জনের সাথে শেয়ার করছে। এই পার্কে প্রতি মৌসুমে অনেক ধরণের ইভেন্টের আয়োজন করা হয়, যেমন সামারস্টেজ প্রোগ্রাম, কনসার্ট, দৌঁড় ইভেন্ট, সিটি সাইকেল এবং ট্যুর প্রোগ্রামসহ আরো অনেক কিছুই।

একটু দূরে গিয়ে দেখি খোলা সবুজ মাঠ, অনেকেই ফুটবল খেলছে। মন চেয়েছিলো একটু খেলি কিন্তু কারো সাথেই তো পরিচয় নেই, আর হঠাৎ করে কেউ কি আমাকে খেলতে নিবে? তাই অনেক হাঁটাহাঁটি করে এসে ওই সবুজ ঘাসের উপর শরীরটা রেখে আকাশের পানে চেয়ে চেয়ে দেখলাম।

আর তখন আমি অভিজাত শহরের এক খোলা মাঠে ঘাসের উপর শুয়ে নিজেকে আবিষ্কার করার চেষ্টা করছি। এই শহরেই বুঝি আমাকে থাকতে হবে, যেখানে কাউকে চিনি না জানি না, এবং ধীরে ধীরে এইভাবেই একজন একজন করে চিনতে চিনতে একদিন ওই শহর আমার প্রাণের স্পন্দন হয়ে যায়।

বাসায় ফিরে যাবো, তখনি ঘটলো বিপত্তি। এই পার্কের অনেকগুলো এন্ট্রেন্স। ঘুরতে ঘুরতে অনেক দূর চলে গিয়েছি। আসার পথও হারিয়ে ফেলেছি। একজন পথচারীকে জিজ্ঞেস করলাম, এফ ট্রেন কোথায় গেলে পাবো, সে বললো আমি নাকি প্রায় ২০ ব্লক দূরে আছি।

আমাকে সে দেখিয়ে দিলো ওই রাস্তা বরাবর সোজা হাঁটলেই আমি এফ ট্রেনের স্টেশন খুঁজে পাবো। অবশেষে আমার রথ গাড়ি চলতে চলতে খুঁজে পেলো এফ ট্রেনের স্টেশন। ব্যস ট্রেনের মেট্রো কার্ড ঘষে ভিতরে ঢুকেই ট্রেনের জন্য অপেক্ষা। ট্রেন আসলো আর আমি অনেকগুলো স্মৃতি জমা করে বাসায় ফিরলাম।

  • গোলাম মাহমুদ মামুন, ভার্জিনিয়া ,যুক্তরাষ্ট্র 

আরও পড়ুন- ভ্রমণের গল্পে জীবনের গল্প; ‘স্ট্যাচু অফ লিবার্টি’ পর্ব- ০২

প্রবাসীদের সব খবর জানতে; প্রবাস কথার ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.