ফ্রান্স ভ্রমণ

দুনিয়া দেখি প্রবাস কথায়: আধুনিকতাও যেখানে শিল্প

শেয়ার করুন

প্যারিস বললেই মনে যে ছবি ভেসে উঠে তা হলো আইফেল টাওয়ার। এরপর ল্যুভর মিউজিয়াম, প্যারিস গেট। আরেকটু বেশি জানলে হয়ত ভার্সাই প্যালেস। আমজনতার দৌড় এটুকুই। আমারও। এই জেনে, এগুলা দেখার জন্যই এতদুর যাওয়া। ভাগ্য সারাজীবন আমার সাথে লুকোচুরি খেলে। এখানেই বা বাদ যাবে কেন ! এয়ারপোর্টে নেমে মনে হলো কোন যুদ্ধাক্রান্ত দেশে চলে এসেছি। দৈত্যের মত সব সৈন্য দিয়ে চারদিক সাজিয়ে রাখা। একেকজনের সাইজ যেমন, উনাদের হাতে ও গায়ে প্রদর্শিত অস্ত্রের বাহারও তেমন। খুব মজার একটা বিষয় হলো এদের হাতে এক বিশাল রাইফেল থাকার পরেও কোমরে ছোট্ট একটা পিস্তল ঝুলতে থাকে। আহা , মানুষ মারতে কত কিছুই না লাগে ! তবে, ইনারা আশ্চর্যজনক বন্ধুসুলভ। যখন তখন যারে তারে ধরে কান ধরায় না বা কিল-ঘুসি-ধমক দেয় না।

প্যারিসে আমার দ্বিতীয় দিন থেকেই আকাশের মন খারাপ। হয় ছিচকাঁদুনে কান্না কাঁদছে, নয় মুখ ভার করে আছে। কেমন লাগে বলুন !

ঘোরাঘুরির পদ্ধতি পাল্টালাম। শখের পদব্রজন বিসর্জন দিতে হলো কিছুটা। ট্রাম-ট্রেন-বাস এর উপর চাপ বাড়ালাম। এতে কিছু অভাবিত সৌন্দর্য উপভোগ করা হলো। শাপে বর আর কি !

ট্রেনে করে ঘুরছিলাম, টো টো করে ঘোরা যাকে বলে। উদ্দেশ্যহীন- ঘোরার জন্য ঘোরা। জানলার ওপাশে প্যারিস দেখা !

12987091_1663987707201628_7075978118532523616_n

এক জায়গায় এসে নামলাম একটু হালকা হওয়া এবং কিছু খাওয়ার জন্য। নেমে দেখি সুন্দর মার্কেট মত। কি মনে হতেই স্টেশন কাম মার্কেট থেকে একটু বের হয়ে দেখার ইচ্ছা হলো। বের হলাম, মাথার উপর তাকিয়ে অজান্তেই মুখ হা হয়ে গেলো। চারদিকে এক পলক দেখেই ভিমরি খাওয়ার জোগাড়। রীতিমত সারপ্রাইজড !

13000277_1663986977201701_7049933956575475793_n

এ যেন টাইম ট্রাভেল ! প্রাচীন আর আর্টিস্টিক এক শহর থেকে দুম করে গ্লাস আর স্টিল এর চকচকে জগতে। প্যারিস আসার আগে আমরা আসলে ভুলে যাই যে এটা শুধু শিল্প, কলা আর প্রণয়ের শহরই নয়। প্যারিস ব্যবসা বাণিজ্যের জন্যও দুনিয়ার এক প্রভাবশালী নগরী।

১৯৫০ এর গোড়ার দিক থেকেই বোঝা যাচ্ছিল যে বিশ্ব অর্থনীতি কৃষি খামার আর কলকারখানার উৎপাদনমুখী যুগ থেকে চকচকে অফিস কেন্দ্রিক সেবা খাতের দিকে ঝুঁকছে। ফরাসীরা প্যারিসের আশেপাশে এক নতুন ঝকমকা ব্যবসা অঞ্চল গড়ে তোলা শুরু করলো। ১৯৯০ এর দিকে এটা পরিণত হলো ইউরোপের সবচেয়ে বড় ব্যবসা কেন্দ্রে ( Europe’s largest purpose-built business district)।

13000313_1663987333868332_2659940523990620218_n

এখানে ৭২টি আকাশচুম্বী ভবনে প্রায় এক লাখ আশি হাজার লোক কাজ করেন। পঁচিশ হাজার আবাসিক নাগরিক আর পঁয়তাল্লিশ হাজার ছাত্রের থাকাও হয় এখানে। আর এই বিশাল কর্মযজ্ঞের ক্ষুদ্র নগর দেখতে বছরে ভিড় করে প্রায় আশি লাখ পর্যটক। জ্বি, মাত্র আশি লাখ !

যাই হোক, এর মধ্যে Grande Arche নামক ১১০ মিটার লম্বা বিল্ডিং টা অসাধারণ সুন্দর। এটাকে অনেকটা গেটের মত করে বানানো হয়েছে আর এই কারণেই বোধহয় এর এই নাম। এখানে দাড়িয়ে সামনে সোজা তাকালে বহুদূরে Arc de Triomphe বা প্যারিস গেট দেখা যায়। Champs-Élysées ও কিছুটা দেখা যায়। আর দশ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত দেখা গেলে ল্যুভরও দেখা যেত !

13012726_1663986743868391_5927318244840628478_n

সর্ব পশ্চিমে Grande Arche থেকে পুব প্রান্তের Louvre পর্যন্ত টানা এই দশ কিলোমিটার লম্বা পথ Historical Axis of Paris নামে পরিচিত।

কি পরিকল্পনা ! প্রজন্ম প্রজন্মন্তারে! আমার মনে হয়েছে প্যারিসের সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার এটি। কি ধৈর্যে, পূর্বপুরুষদের প্রতি কি সীমাহীন সম্মানে এরা এই অপূর্ব ধারাবাহিকতা বয়ে চলেছে।

12993515_1663987763868289_8991757727939477360_n
শৈল্পিক ভাবনা ছাড়া বুছি ভবনও তৈরি করা সম্ভব নয় এখানে

পুরো এলাকাটাই পায়ে হেঁটে ঘুরার। বিশাল খোলা চত্বর। আক্ষরিক অর্থেই বিশাল। প্যারিস শহরতলীর গায়ে গা লাগানো ভিড় এখানে একদমই নেই। চত্বরে অনেকেই স্কেটিং করে। বাচ্চারা এলোমেলো দৌড়াদৌড়ি করতে থাকে, যেন এই বিশাল খোলা জায়গা পেয়ে বুঝে উঠতে পারে না কি করবে !

13043565_1663986917201707_5603605338755041959_n

শপিং করার জন্য এটা স্বর্গের মত। আছে বিশাল বিশাল সব সুপার মার্কেট। Grande Arche থেকে পুবদিকে ল্যুভর এর দিকে হাঁটতে থাকলে দুই পাশের মনমুগ্ধকর দৃশ্যে নিতান্তই হারিয়ে যেতে হয়।

  • ছবিগুলো লেখকের।

collage-2016-04-18(4)

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.