Uncategorized

তাহলে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে কবে আসবেন?

সুইডেনের সব জায়গা বিখ্যাত না,তবে সব জায়গার নিজস্ব সৌন্দর্য আছে। সুইডেনে ট্যুরিস্ট আসে খুব কম ৷ মনে হয় ইউরোপের সবচেয়ে কম ট্যুরিস্ট আসা রাজধানী হলো স্টকহোম। এর পিছনে একটি বড় কারণ হলো দাম। ইউরোপের অনেক শহরের চেয়ে সুইডেনে জিনিসপত্রের দাম তুলনামূলক অনেক বেশি এবং অনেক কিছুই সহজে পাওয়া যায় না। ভাষা সমস্যা তো আছেই !

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরের সাথে কুমিল্লা বা রাজশাহীর যেমন এক বিশাল পার্থক্য আছে। ঠিক তেমনি সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমের সাথে অন্যান্য শহরের বিশাল পার্থক্য আছে। ট্রেন বা বাসে গেলে সরাসরি স্টোকহোম সেন্টারে নামিয়ে দিবে। আর প্লেনে গেলে মূলত ৪ টি এয়ারপোর্ট আছে।সবচেয়ে বড় হলো অরলান্ডা।এখান থেকে সরাসরি ট্রেন বা বাস আছে সেন্টারে যাবার,ট্রেন অরলান্ডা এক্সপ্রেস প্রতি ২০ মিনিট পর পর।

আর বাকি এয়ারপোর্ট হলো Bromma Airport,Västerås and Skavsta,এই ৩ টি এয়ারপোর্ট থেকে সরাসরি বাস আছে সেন্টারে যাবার,সময় লাগে ১ থেকে ২ ঘন্টার মত।

সুইডেনে ঘুরতে আসতে আগ্রহীদের জন্য পরামর্শ

১.যদি আপনি বাচ্চা সহ স্টোকহোম ঘুরতে যান তবে অবশ্যই শুক্র,শনি ও রবিবার এই তিনদিন ঘুরবেন। বাচ্চার টিকিট লাগবে না এছাড়া নানা সুবিধা পাবেন। বাচ্চা না থাকলে যে কোনো দিন যেতে পারেন।

২.যদি হোটেলে থাকেন তবে অবশ্যই যে সব হোটেলে সকালের নাস্তা দেয় সেসব হোটেলে উঠবেন ৷ মনে রাখবেন সুইডেনে ৯৯% রেস্টুরেন্টে সকালের নাস্তা বিক্রি করে না। একান্তই হোটেলে সকালের নাস্তা না দিলে,রাতেই সকালের নাস্তার সব কিছু কিনে রাখবেন। কম দামে ভালো জিনিস পাবেন willys / lidl নামক দোকানে।সব জায়গাতেই এই দোকান পাবেন

৩.আপনাকে অবশ্যই এস এল কার্ড কিনতে হবে,এটি বাস,ট্রাম এবং মেট্রো সব কিছুর জন্য প্রযোজ্য।২৪ ঘন্টা(১২ ইউরো),৭২ ঘন্টা(২৫ ইউরোট),সাত দিন(৩২ ইউরো) সহ বিভিন্ন মেয়াদের কার্ড আছে। একটি কার্ড দিয়েই সব কিছুতে উঠতে পারবেন। কার্ড না কিনে ধরা খাইলে মহা বিপদ। জরিমানা ছাড়াও পাসপোর্ট ও ভিসা সমস্যা করতে পারে। তাই আগে ভাগেই প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে ৷ সেন্টারে অনেক টিকিট মেশিন আছে, সেখানে কার্ড দিয়ে কিনতে পারেন ৷ এছাড়া এস এল নামে দোকান আছে,এর বাহিরে প্রেশ বুড়ো নাম হলুদ রঙের দোকান আছে সেখান থেকেও টিকিট কিনতে পারবেন।

৪.স্টকহোমের কোন জায়গাতে হোটেল নিবেন? উত্তর হলো যেখানে সব থেকে কম টাকায় পাবেন সেখানেই নিয়ে নিবেন। স্টকহোমে মেট্রো (মাটির নিচের ট্রেন) ব্যবস্থা খুব ভালো,ফলে যে এলাকাতে থাকেন না কেন যাতায়াতে কোনো সমস্যা হবে না এবং সময় ও বেশি লাগবে না। তাই বেশি টাকা দিয়ে সেন্টারের কাছে না নিয়ে কম টাকায় যে কোনো জায়গাতে হোটেল নিন।

কি কি দেখবেন?এটি অবশ্যই আগে থেকে ঠিক করে আসবেন। আপনার পছন্দের মত করে তালিকা করে নিন।

১.প্রথমে সেন্টারে যাবেন একে বলে”টি সেন্টরুম”সেখান থেকে হেঁটে ৫ মিনিটেই যাবেন “sergels torg”খুব বিখ্যাত জায়গা তবে পকেটমার ও বাটপার থেকে সাবধান। এখন থেকে হেঁটে যাবেন “Gamla stan” সরু হাঁটার রাস্তা। অনেক কিছু দেখতে পাবেন রাস্তার ২ পাশে। আর ১০ মিনিট হাঁটলেই পৌঁছে যাবেন সুইডেনের সংসদ ভবনে Riksdagshuset। সংসদ চালু থাকলে ভিতরে ঢুকে এম পি দের দেখতে ও বক্তব্য শুনতে পারবেন ফ্রি তে।

এরপর আরো একটু হেঁটে গেলেই সুইডেনের বর্তমান রাজার বাড়ি এবং আর একটু হাঁটলেই নোবেল মিউজিয়াম।

স্টকহোমে ছোটবড় অনেক মিউজিয়াম আছে,প্রায় প্রতিটি তে ঢুকতে ১০-১৫ ইউরো লাগে। যদি আপনি অনেক মিউজিয়াম দেখতে চান তবে আপনি “স্টোকহোম পাস্ ” কিনে নিবেন ২ দিনের জন্য ৭০ ইউরো এর মত নিবে,তাহলে ফ্রি প্রায় সকল মিউজিয়াম দেখতে পারবেন সাথে বাস ও মেট্রো টিকিট ফ্রি পাবেন।

২.ছেলে বুড়া সবাই মজা করতে চাইলে যেতে পারেন “gröna lund” এটি একটি এমুজমেন্ট পার্ক। অনেক ধরণের রাইড আছে। ঢুকতে বেশি টাকা না নিলেও প্রতিটি রাইডে উঠতে আলাদা করে টাকা দিতে হয়। বিষয়টি মনে রাখবেন।

এখন থেকে বের হলে একটু সামনে গেলেই হেঁটে ১০ মিনিট লাগবে। নাম “skansen” এটি একটি জাদুগর এবং চিড়িয়াখানা এর মত,বিশাল বড় জায়গা। বিভিন্ন প্রাণীর সাথে সুইডেনের ইতিহাস জানতে চাইলে এখানে যাবেন। ভাল ভাবে দেখতে হলে সারাদিন এখানেই লাগবে। ভিতরে খাবার নিয়ে যাওয়া যায় এছাড়া রেস্টুরেন্ট আছে। প্রচুর হাঁটার জন্য প্রস্তুত থাকবেন।

৩,যদি কেনাকাটার ইচ্ছা থাকে তবে যাবেন “kista galleria”। এটি একটি ইনডোর মার্কেট। অনেক কিছুর দোকান আছে। দাম মোটামুটি,বাংলাদেশি রেস্টুরেন্টও আছে।

আর আপনি যদি কালো টাকার মালিক হন অথবা অনেক অনেক ভাল টাকার মালিক হন তাহলে যাবেন mall of scandinavia . বিশাল ইনডোর মার্কেট,নামি দামি সব ব্র্যান্ডের জিনিস পাবেন।গলাকাটা দাম। সুন্দরী বৌ নিয়ে যাবার দরকার নেই,পকেটের অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে ৷

৪.সাইন্স মিউজিয়াম “tekniskamuseet” দেখার মোট জায়গা। টিকিটের দাম একটু বেশি হলেও সবার ভাল লাগবে,সময় লাগবে প্রায় ৩ থেকে ৫ ঘন্টা। বুধবার বিকেলে ফ্রি ঢুকা যায়।

৫.কাঁচের লিফ্ট এ উঠে স্টোকহোম দেখা। সময় লাগে ৩০ মিনিট এর মত। খরচ জনপ্রতি ১৫ ইউরোর কাছা কাছি । Ericsson Globe ইত্যাদি অনুষ্ঠানে এটি দেখানো হয়েছিল। এখানে পাশেই স্টেডিয়াম আছে,অনেক বিখ্যাত খেলা ও অনুষ্ঠান হয়, সেসবের টিকিট কাটতে হবে। এছাড়া এখানে একটি ভালো মার্কেট আছে।

৬.Vasa Museum এটি একটি পুরাতন মিউজিয়াম,অনেক নামকরা। পুরাতন অনেক নৌকা আছে তবে আমার কাছে ভাল লাগে নাই!

৭.স্টোকহোম থেকে ফেরি(প্রায় ১০ তলা) আছে,যাকে লাক্সারি ক্রুজ শিপ বলে। মূলত সবচেয়ে পরিচিত হলো ভাইকিং লাইন এবং তাল লিংক সেলিয়া। এই ২ কোম্পানির যে কোনো একটিতে করে যেতে পারেন Mariehamn,ফিনল্যান্ডের হেলসিংকি , লাটভিয়ার রিগা অথবা এস্তোনিয়ার তাল্লিন। সারারাত নৌকায় যাবেন , সারাদিন ঘুরবেন আবার সারারাত নৌকায় স্টকহোমে ফিরে আসবেন। পানির দামে টিকিট পাবেন। ভিসা জটিলতা থাকলে না যাওয়াই ভালো। শুক্র শনি ও রবিবার অনেক রাত পর্যন্ত নাচ গান হয়। এছাড়া নানা অনুষ্ঠান থাকে
৷ সপ্তাহের বাকি দিনগুলোয় তেমন কিছু থাকে না। মদ ও সিগারেট সস্তায় পাওয়া যায়,নাউযুবিল্লাহ

৮.যদি অনেক টাকা থাকে তবে হেলিকপ্টারে করে স্টোকহোম দেখতে পারেন,অথবা ফেরারি গাড়ি ভাড়া নিতে পারেন অথবা উঁচু বিল্ডিং এর ছাদে উঠে স্টোকহোম দেখতে পারেন। এরজন্য টিকিট কাটতে হবে,জনপ্রতি প্রায় ১০০ ইউরো এর মত লাগবে। টিকিট পাবেন liveit.se এবং upplevelse.com এই ওয়েবসাইট থেকে .

৯.অনেক ইন্ডিয়ান নাম দিয়ে বাংলাদেশী রেস্টুরেন্ট আছে।দাম অনুযায়ী বেশিরভাগের খাবারের মান খুব ভাল না। তবু টেস্ট করতে পারেন। এছাড়া আরব দের পিজ্জা বা কাবাব কম টাকাতেই পাওয়া যায়। এর বাহিরে ফলমূল কিনে খেতে পারেন।

১০.আপনার বন্ধু দয়াময়,বন্ধুর বাড়ি থাকলে অনেক সমস্যা একেবারেই মিটে যাবে এবং খরচ অনেক কমে যাবে।তবে স্টকহোমে সবাই চাকরি ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত থাকে,তাই হুট্ করে চলে না গিয়ে বরং আগে থেকেই জানিয়ে যাওয়া ভালো। সারপ্রাইজ দেবার কোনো দরকার নেই এতে হিতে বিপরীত হতে পারে।

যারা সুইডেনের অন্যান্য শহর থেকে স্টকহোমে ঘুরতে যাবেন তারা ধরে নিতে পারেন,স্টকহোমে একটু বেশি গরম থাকবে ৷ আর যারা সুইডেনের বাহির থেকে স্টকহোমে ঘুরতে যাবেন তারা ধরে নিতে পারেন,স্টকহোমে অনেক ঠান্ডা থাকবে। সুতরাং গরম কাপড় নিতে ভুলবেন না। সুইডেনে একটি কথা প্রচলিত আছে,”শীত বলে কিছু নেই,যদি তুমি ঠিক কাপড় পরো”৷

তাহলে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে কবে আসবেন?

লিখেছেন-ফরহাদ প্রধান,সুইডেন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.