Uncategorized

“করোনা আমাদের আত্নকেন্দ্রিক ও স্বার্থপর বানিয়ে দিয়েছে”

শেয়ার করুন

গৃহ বন্ধী হওয়ার মতো একটা সিচুয়েশান তৈরী হবে আগে থেকেই টের পেয়েছিলাম। সে হিসাবে প্রস্তুতও ছিলাম। অন্তত তিন চার সপ্তাহের রসদ সংগ্রহ করে ঘরে ঢুকে গেলাম। কাঁচা বাজার যথেষ্ট পরিমাণ না হলেও অন্যান্য খাবার ও ঔষধ পত্রের মজুদ যথেষ্ট করে রেখে ছিলাম। ইচ্ছা ছিলো অন্তত এক মাস ঘর থেকে বের হবো না। কিন্তু হোম কোয়ারেন্টিনের নবম দিনে আমাকে বের হতেই হলো।

আমার মেয়েটার কিছু বদ স্বভাব আছে। ঠিক মতো খাবেনা, কিন্তু রাতে ঘুমানোর সময় হলে তার ক্ষিদা লাগে। এ সময় স্ন্যাক জাতীয় খাবার খাওয়ার বাহানায় সে তার ফোনটা নিয়ে আমার পাশে এসে বসে। আমি বুঝি, সে স্ন্যাক খাওয়ার বাহানায় আরো কিছু সময় ফোন ব্যবহারের সুযোগ তৈরী করে। তার মায়ের উত্তপ্ত অভিযোগ হজম করেও আমি মেয়েকে সুযোগ দিই। কারণ এ সময়টাতেই আমি মেয়েকে আমার পাশে পাই।

তিন দিন হলো তার স্ন্যাক শেষ হয়ে গেছে। এর আগের দিনগুলোতে সে সাধারণ খাবার না খেয়ে তার স্ন্যাকের মজুদ নিঃশেষ করেছে। গত তিন রাতে দেখলাম সে কিচেনে এসে, ফ্রীজ খোলে, কেবিনেট খোলে, কিছু না পেয়ে বসে বসে সোডা খায়। খারাপ লাগে। আগেই তাকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছি যে আমরা হয়তো ফুড ক্রাইসিসে পড়তে যাচ্ছি। এমনও হতে পারে আমাদের ঘরে কোন খাবার থাকবে না। তাছাড়া আমাদের বাইরে যাওয়াও নিরাপদ নয়।

সে বুঝেছে, একবারও তার চাহিদা প্রকাশ করেনি। কিন্তু আমার খারাপ লাগে। তার মায়ের ঘ্যানঘ্যানানি উপেক্ষা করে আমি তাকে কিছু একটা বানিয়ে দেয়ার চেষ্টা করি। পছন্দ না হলেও সে আপত্তি না করে তা খায়। আমি তাকে আমার সাথে বসে থাকার প্রশ্রয় দেই। থাক না মেয়েটা আমার সাথে আরেকটু, স্কুল-তো বন্ধ।

তিন দিন ধরেই ভাবছি ভালো প্রটেকশন নিয়ে একবার বের হই, তার জন্য কিছু নিয়ে আসি। তা ছাড়া দুধ, ব্রেড এগুলোও প্রায় শেষ। এগুলো বেশী করে এনে রাখা যায়না, এর সল্প মেয়াদ থাকে। কিন্তু বের হওয়ার সাহস হয়না।

যেভাবে তীব্র গতিতে মানুষ ভাইরাস আক্রান্ত হচ্ছে তাতে সাহস না হবারই কথা। নিজের জন্য চিন্তা, পরিবারে জন্য চিন্তা মিলিয়ে একটা অস্থির দুশ্চিন্তা তৈরী হয়। এ বয়সে আক্রান্ত হলে আমার বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। আমি মৃত্যুকে সইতে পারবো, কিন্তু শ্বাস কষ্টের যন্ত্রণা সইতে পারবোনা।

এই সময়টা আমাদের প্রবাসীদের জন্য খুব খারাপ। এ সময় আমরা প্রত্যেক পরিবার খুব একা। কেউ কাউকে সাহায্য করার কোন সুযোগ নেই, মানসিকতায়ও নেই। করোনা আমাদের আত্নকেন্দ্রিক ও স্বার্থপর বানিয়ে দিয়েছে।

আমার পরিবারের কারো সমস্যা হলে আমি দায়িত্ব নিতে পারবো। কিন্তু আমার সমস্যা হলে নিয়তির উপর নিজেদের ছেড়ে দেয়া ছাড়া আর কোন উপায় থাকবে না। কাজেই আমার সাবধান এবং সুস্থ থাকা সবচে’ জরুরী। তাই তিনদিন ভেবে ভেবেও বের হইনি। কেবলই মনে হয়ে বের হলেই কোন না কোন ভাবে সংক্রমিত হয়ে পড়বো। প্রতিদিন সকাল থেকে বের হবো হবো করে দিন শেষ হয়ে যায়, বের হওয়া হয়না।

আজ ঘুম থেকে উঠে শুনলাম ঘরে ব্রেড নেই, জেলি নেই, দুধ নেই। তাই মেয়ে পানি দিয়ে রুটি খেয়েছে। আর সহ্য হলো না, বেরিয়ে পড়লাম। আধা বেলা কয়েক মার্কেট ঘুরে তার পছন্দের স্ন্যাক,ক্যান্ডি, চিপস জোগাড় করলাম। ঘরে এসে শুনলাম বাবা তার পছন্দের খাবার আনবে বলে সে সারাদিন কিছু খায়নি।

রাতে ঘুমানোর আগে সেই একই কাহিনী, স্ন্যাক নিয়ে সে আমার পাশে এসে বসলো। আমি দ্রুত সরে গিয়ে বললাম, আগামী পাঁচদিন আমি তাকে আদর করবো না, দূরে থাকবো। সে আহত হলো, উদাস হলো, মনমরা হয়ে বসে রইলো।

প্রচন্ড ইচ্ছা করছিলো মেয়েকে কোলে নিয়ে একটু আদর করি। করোনা আবেগ, ভালোবাসার মাঝেও দেয়াল তুলে দিলো। জীবন রক্ষার জন্য স্বার্থপর হয়ে পড়েছিলাম, কিন্তু সন্তানের জন্য পারলামনা। কারণ, আমি ‘বাবা’ তো।।

  • শেখ ফরহাদ, বাফালো, যুক্তরাষ্ট্র। 
শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.