মহিউদ্দিন কিবরিয়া অস্ট্রেলিয়া
Uncategorized অস্ট্রেলিয়া ওশেনিয়া রঙ্গের দুনিয়া

অস্ট্রেলিয়ার ডায়েরী; “ওলে~ আলে” মুডে বৃক্ষের যত্নআত্তির ক্লাসে একদিন

শেয়ার করুন

রবিবার-সিডনিতে উইকেন্ডের শেষ দিন সকালে একটুওলে~ আলেমুডে নাস্তা করলাম। পৌনে এগারোটায় বাসা থেকে রওনা দিলাম উত্তরসিডনিরইডেন গার্ডেনএর দিকে আমাদের বাসা থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে। প্রায় আধাঘন্টা ড্রাইভের পর হাজির হলাম ইডেন গার্ডেনে উদ্দেশ্য, আমার গিন্নির অনলাইনে বুক করা গাছের পরিচর্যার উপর একটা বিশেষ প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করা।
বিগত ১২ বছরে, সিডনি ও সিডনির বাইরে ঠিক কতগুলি গার্ডেন-নার্সারি দেখার সুযোগ হয়েছে, তা এই মুহূর্তে গুনে বের করা বেশ কঠিন! এই “ইডেন গার্ডেন” নার্সারির পাশ দিয়ে আমরা অগুণিতবার আসা-যাওয়া করেছি প্যাসিফিক হাইওয়েতে চলাচলের সময়। প্রায় প্রতিবারই যাওয়ার পথে রাস্তার ধারে এই গার্ডেন-নার্সারিটা দেখে আমার গিন্নী বলে উঠে

“একদিন আসতে হবে এই নার্সারিতে”!

গতকালের আবহাওয়াটা ছিল খুবই চমৎকার। সকালের দিকে আকাশ সামান্য মেঘলা থাকলেও বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না। তাই বেলা বাড়ার সাথে সাথে আকাশ পরিষ্কার হয়ে উঠে। ইডেন গার্ডেনে পৌঁছানোর পর এদের বেসমেন্টে গাড়ি পার্ক করে, লিফট দিয়ে উপরে আসতেই নজরে পড়লো- মাঝারি আকারের ছিমছাম পরিপাটি ইডেন গার্ডেনের ইনডোর এবং আউটডোর নার্সারি এনক্লোজার দুটি। ভিতরে অল্পবয়সী একজন সদালাপী মহিলা স্টাফকে জিজ্ঞেস করেই জানা গেলো আজকের নির্ধারিত প্রোগ্রামটি মাত্রই শুরু হয়েছে এবং এই মুহূর্তে গোটা দলটি গোলাপ যত্ন-আত্তির বিষয়ে আউটডোর নার্সারিতে ব্যস্ত আছেন। আমরা আউটডোর নার্সারিতে এসেই চমৎকার ছোট্ট একটা প্যাভিলিয়নের মধ্যে বছর চল্লিশ বয়সের এক ভদ্রলোককে দেখলাম। ইতিমধ্যে জড়ো হওয়া উৎসাহী দর্শকদেরকে গোলাপ গাছের পরিচর্যার বিষয়ক মূল্যবান বক্তব্য রাখছেন তিনি। বলাই বাহুল্য, আমার স্ত্রী এতে গভীর আগ্রহ নিয়ে যোগ দিলেন।

মহিউদ্দিন কিবরিয়া অস্ট্রেলিয়া
ইডেন গার্ডেন নার্সারীতে লেখক

আমি এই ফাঁকে প্রায় ৩ একর জমির উপর তৈরি করা “ইডেন গার্ডেন” নার্সারিটা ঘুরে ঘুরে দেখলাম। সাদা রংয়ের গোটা নার্সারি বিল্ডিংটা প্রায় ৯০ মিটার লম্বা ও ৩০ মিটার চওড়া। বিল্ডিং এর উপরে ঢেউয়ের আকৃতিতে বসানো হয়েছে সাদা রংয়ের লতাগুল্মের ঝাকার মতোই আকর্ষণীয় উচু স্টিল স্ট্রাকচার।

গার্ডেন বিল্ডিংয়ের প্রবেশ পথেই রাখা আছে ১৯৫৫-৬০ মডেলের পরিত্যক্ত সম্ভবত হোল্ডেন কোম্পানির দুই দরজার একটা পিকআপ ভ্যানগাড়ি। এর পিছনের লোডিং ক্যারিয়ার এবং সামনের বনেট খুলে ইঞ্জিন কম্পার্টমেন্টে মাটি ভরে বানানো হয়েছে একটা কৃত্তিম “আগোছালো” জঙ্গলের ভিন্টেজ অ্যান্টিক!! এই অ্যান্টিক গাড়িটির দুই পাশের দরজায় লেখা আছে “Eden Garden” নামটি। এছাড়াও সামনের প্রবেশপথের বাগানের চত্বরে বসানো হয়েছে আধা-খাওয়া প্রায় এক মানুষ সমান উঁচু একটা কৃত্তিম রয়েল গালা আপেল।

মহিউদ্দিন কিবরিয়া অস্ট্রেলিয়া
এ্যান্টিক সেই গাড়ি


গোটা গার্ডেনের ভিতরে ও বাইরে সাজিয়ে রাখা হয়েছে, বসন্তের রঙ বেরঙের নয়নাভিরাম ফোটা ফুলের নানা রকম গাছ দিয়ে। ইনডোর গার্ডেন থেকে বাইরে পা দিতেই দেখলাম, এই নার্সারীর চমৎকার একটা ক্যাফে রেস্টুরেন্ট। এই রেষ্টুরেন্টটি আবার ইনডোর ও আউটডোর দুইভাগে ভাগ করা। ইনডোর রেস্টুরেন্টে চমৎকার সব ঝুলানো গাছের টব দিয়ে সাজানো। ভিতরে ঢুকলে মনে হবে যেন, একটা বাগানে বসে সবাই খাওয়া-দাওয়া করছে!

তখন প্রায় ফাঁকা, তাই আমি আউটডোর ক্যাফেতে বসে বসে মোবাইল টিপাটিপি শুরু করলাম। এখানে আসার তাড়াহুড়োর জন্য সকালে নাস্তার পর কফিটা খাওয়া হয়নি। তাই ভাবলাম গিন্নির এই যত্নআত্তির ক্লাস শেষ হওয়ার সাথে সাথেই এখানে বসে দু’কাপ কফি খাবো দুজনে। কিন্তু বেলা প্রায় সাড়ে বারোটার সময় গিন্নি ফোন করে জানালো- সে ইতিমধ্যে আজকের অনুষ্ঠানসুচি হাতে পেয়েছে এবং সেই অনুযায়ী বেলা একটার সময় শুরু হবে আরেকটি হাতে-কলমে বৃক্ষ যত্নের প্রশিক্ষণ ক্লাস। বুঝলাম, আজ আর কফি খাওয়া হবে না!!

মহিউদ্দিন কিবরিয়া অস্ট্রেলিয়া
নার্সারীর ভেতরে

আমি তাই সময় নষ্ট না করে, এর আউটডোর নার্সারি সেকশনে আরো একটা চক্কর দিলাম। আউটডোর নার্সারীর সাথেই আছে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচের দিকে বেশ বড় একটা বাচ্চাদের অ্যাক্টিভিটি ময়দান। আর সেখানে বেশ কিছু কচিকাঁচা তাদের বাবা-মায়ের সাথে হৈ-হুল্লোড়ে মেতে উঠেছে। এছাড়াও ভিতরে পরিচ্ছন্ন বাগানের মধ্যে তৈরি করা হয়েছে সেড দেয়া টেবিল চেয়ার। যেখানে বসে অনেকেই তখন রেস্টুরেন্টের দুপুরের খাবার উপভোগে ব্যস্ত।
গার্ডেনের এই সেকশনটাতে আছে স্টিলের তৈরি দুটি চমৎকার কমিক বুক ক্রিয়েচার। এর মধ্যে বিচ্ছু আর বাদুড়ের মিশ্রণে তৈরি একটা উদ্ভট আকৃতির জন্তুর পাশে দাঁড়িয়ে অনেকেই ছবি তুলছে বাচ্চাদের নিয়ে। এই কিংভুতকিমাকার জন্তুটাকে ইদানিং কিছু গাঁজাখুরি হলিউডি অ্যানিমেটেড ছবিতে হামেশাই দেখতে পাওয়া যায়।

মহিউদ্দিন কিবরিয়া অস্ট্রেলিয়া
হলিউড সিনেমার অদ্ভুত চরিত্র

যাই হোক, দুপুর দেড়টারও পরে ক্ষুধার তাড়ণায় আমি যখন অস্থির প্রায়, তখনই আমার গিন্নি ফোনে জানালো যে দুইটার সময় আজকের দিনের কর্মসূচি শেষ হবে। তারপর গার্ডেন নার্সারির রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ করা হবে। এই ফাঁকে আমি নিচে পার্কিংয়ে জায়নামাজ বিছিয়ে জোহরের নামাজ আদায় করে নিলাম।

সবশেষে বেলা দুইটার সময়, আমার গিন্নি বিশাল এক প্রশান্তির হাসি নিয়ে ফিরে আসার পরেই ঢুকলাম ইনডোর রেস্টুরেন্টে। দুপুর সাড়ে বারোটা থেকে দেড়টা পর্যন্ত এই রেস্টুরেন্টে ছিল উপচেপড়া ভিড়। দুইটার সময় ভিড় একটু কমলেও একটা ফাঁকা টেবিলের জন্য আমাদেরকে কাউন্টারে প্রায় মিনিট পনের অপেক্ষা করতে হয়।
চমৎকার সব গাছ-গাছালির সাথে কৃত্তিম ফোয়ারা ও ছোট ছোট জলাধার দিয়ে একটা আউটডোর গার্ডেনের আদলে তৈরি করা এই রেষ্টুরেন্টের ইন্টেরিয়র ডেকোরেশনের আইডিয়াটা খুবই চমৎকার! এরকম একটা ফোয়ারা ও জলাধারের পাশের টেবিলে বসে আমার গিন্নি লাঞ্চের অর্ডার দিলো কড মাছের একটা ফিস এন্ড চিপস ও মিক্সড সালাদ। আর একটা স্যামন মাছের মেক্সিকান টাকো। অর্ডার দেওয়ার প্রায় মিনিট পনের পর আমাদের টেবিলে এসে হাজির হয় গরম গরম লাঞ্চ। আমার কাছে এই দুটি আইটেমের মধ্যে ফিস এন্ড চিপসটা ছিল অনবদ্য স্বাদের।
চমৎকার আবহাওয়ায় সুন্দর একটা সময় কাটিয়ে লাঞ্চের পর শেষ বিকালে আমরা বাড়ির পথ ধরলাম। আলহামদুলিল্লাহ!! শুকরিয়া আল্লাহ পাকের দরবারে যিনি এমন একটি দেশে থাকার সুযোগ দিয়েছেন আমাদের।
সবাইকে ধন্যবাদ সাথে থাকার জন্য। ইনশাআল্লাহ সামনের উইকেন্ডে হয়তো দেখা হবে অন্য কোথাও অন্য কিছু নিয়ে।

 

  • মহিউদ্দিন কিবরিয়া, সিডনী, অস্ট্রেলিয়া।
শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.