ইউরোপ ব্লগ রঙ্গের দুনিয়া

এমন করে কি দেশের বাইরের সবারই মন কাঁদে !

শেয়ার করুন

ছোটবেলায় পায়ের পাতার মাঝে ছোট্ট একখানা কালো তিল দেখে খালাতো বোন বলতো, ‘এই রে, তুই তো বিদেশ যাবি’। আমি বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করতাম, কিভাবে জানিস? সে বলতো, পায়ের পাতায় তিন থাকলে মানুষ বিদেশ যায়। আমি তীব্রভাবে ঘাড় নেড়ে বলতাম, দেশ ছেড়ে আমি যেতেই চাই না কোথাও। অসুর সবুজ পাতা উলটে পালটে সেই আমাকে ঠিকই আসতে হল দূরদেশে।

এখান থেকে আমার বাড়ি, চেনা মানুষগুলো অনেক দূরে। গুগল ম্যাপ দেখায় পান্থপথের কোথায় আছে আমার অনেক বছরের ছোট্ট ঘরটা, কোথায় আছে মালিবাগে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো বহুতল সাদা ভবনটা- যেখানে আমি বিয়ের পর বাসা বেঁধেছিলাম কিছু মাস।

আরে দোস্ত কেমন আছিস, এমন কিছু বলে চিৎকার দিয়ে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরার মত বন্ধু নেই এখানে। কিংবা অহেতুক ঘুরে বেড়ানোর মত তিন চাকার রিক্সা বা পাড়ার মোড়ের ফুচকার দোকান নেই। আজিজ সুপার মার্কেটের বইয়ের দোকানগুলোর কথা খুব মনে পড়ে। মনে পড়ে শাহবাগের ঝালমুড়ির কথা। বড় বড় বিষয় তো বাদই দিলাম। ছোট ছোট বিষয়গুলোর কারণেই দেশকে মনে পড়ে অনেক।

বিচিত্র এ দেশ, বিচিত্র এ দেশের ভাষা। আমার ডাকনাম তো উচ্চারন করতেই পারে না। সেঁজুতি শুনে অনেক উচ্চারন করল, সেউতে। একজনকে বললাম, সেঁজুতি বলতে না পারলে বলো সেজান। এই নামেও আমাকে বাসায় ডাকে। সে শুনে বলল, Scissors? তোমার নাম কাঁচি? আরেকজন তো নাম শুনে চোখ কপালে তুলে বলল, ওহ মাই গড, তোমার নাম Jesus? তারমানে Jesus Christ? বলেই হাত দিয়ে ক্রস এঁকে ফেলল। আমি হাসব না কি কাঁদবো বুঝতে পারলাম না!

এরই মাঝে এক ম্যাক্সিকান মেয়ে বাঙ্গালীদের বাংলা শুনে মুগ্ধ। সে বাংলা শিখতে উদগ্রীব। সে বাংলা শিখবে, এর আগে আমাকে স্প্যানিশ শেখাবে। এরই মাঝে সে আমাকে একগাদা হাবাজাবা স্প্যানিশ শিখিয়ে ফেলেছে। একদিন দেখা হবার পরে বলল, তোমরা কাউকে দেখলে কী বলো? আমাকে সেটা জিজ্ঞেস করো তো। আমি বললাম, হাই বলতে বলছো? সে বলল, না না আরেকটা কথা বল, সেটা বল। আমি বললাম, ‘আসসালামু আলাইকুম’। সে তৎক্ষণাৎ স্পষ্টভাবে উত্তর দিলো, ওয়া আলাইকুমুস সালাম। আমি রীতিমতো হতভম্ব হয়ে বললাম, তুমি এটা কীভাবে জানো? সে বিশাল এক একান-ওকান জোড়া হাসি দিয়ে বলল, একটা সিনেমা দেখে শিখেছি।

আজকে ওকে শেখাতে চেষ্টা করলাম, ‘আমি বাংলা বলতে ভালোবাসি’। বিশাল এই লাইন সে রীতিমত তোতাপাখির মত মুখস্ত করে চলেছে, তো চলেছেই… আমি দেখি এর হাসি।

আমার এখানে যখন পড়ন্ত বিকেল দেশে তখন খুব ভোর। আমি জানি এমন ভোরে ঘুমিয়ে থাকে আমার সব চেনা মানুষ, প্রিয় মানুষ, আপন মানুষ। আমি ভাবি, যদি আমি যাদু জানতাম, পরিবার, বন্ধু-বান্ধবী, কাজিন, পুরানো কলিগ, লেখালেখির প্রিয় বন্ধুসহ সবাইকে গিয়ে দেখে আসতাম.. মনে হয় একটু পান্থপথ যেতাম, একটু মালিবাগ, শাহবাগ, একটু মোহাম্মদপুর, একটু ধানমন্ডি, কলাবাগান, বনানী, উত্তরা, মিরপুর, বাংলা মোটর…

যদি সত্যি যেতে পারতাম… এমন করে কি দেশের বাইরের সবারই মন কাঁদে?

  • একুয়া রেজিয়া।
শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.