Featured এশিয়া সিঙ্গাপুর

প্রবাসে ব্যতিক্রমী এক সাংস্কৃতিক পরিবারের গল্প

শেয়ার করুন

একটি অনুষ্ঠানে বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত কিশোরের মুখে বাংলা গান শুনে মুগ্ধ হয়েছিলাম। কিন্তু সেদিন অনুষ্ঠানে ছেলেটির সাথে পরিচিত হবার সুযোগ পাইনি৷ সিঙ্গাপুরে বসবাস করেও কিশোর রাকেশ হারমোনিয়াম বাজিয়ে এত সুন্দর করে বাংলা ভাষায় গান করে কি করে!

কিশোর রাকেশকে দেখে তার প্রতি ভালোলাগা ও বিস্ময়ের কারণ হল, প্রবাসে ভিন্ন সংস্কৃতি ভিন্ন ভাষাভাষীদের মাঝে বসবাস করেও এত সুন্দর করে বাংলা গান করা সহজ নয়৷

প্রবাসে যেসব শিশু জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পেয়ে বসবাস করে, তাদেরকে সেদেশের স্থানীয়দের সাথে প্রতিযোগিতা করতে হয়। এই প্রতিযোগিতা পড়ালেখা থেকে শুরু করে সর্বক্ষেত্রে। এজন্য তাদেরকে সর্বপ্রথম সে দেশের ভাষা আয়ত্ত করতে হয়৷ শিশু মননে একই সাথে একাধিক ভাষা আয়ত্ত করা সহজ নয়।

এক বন্ধুর সহায়তায় রাকেশের পরিবারের সন্ধান পাই। রাকেশের বাবা আমার আগ্রহের কথা শুনে ছেলের গান শোনার জন্য আমন্ত্রণ জানান। একদিন রাকেশের গানের শিক্ষককে সঙ্গে নিয়ে তাদের বাড়িতে গিয়ে হাজির হই।

রাকেশের বাবা অজয় কুমার সরকার ও মা অমিতা রানী সরকার আমাদের খুব আন্তরিকভাবে অভ্যর্থনা জানালেন। রাকেশ হয়ত আগে থেকে জানত আমরা তার গান শুনতে আসবো। সে হারমোনিয়াম, তবলা নিয়ে বসেছিল।আমরা কুশলাদি বিনিময় করে তার পাশে বসতেই,  সে জানতে চাইল কোন গান শুনতে চাই। আমি বললাম, তোমার পছন্দমতো গাও।

সে হারমোনিয়ামে মায়াবি সূর তুলে গেয়ে উঠল-

কাহারবা নয় দাদরা বাজাও
উলটো-পালটা মারছো চাটি।
শশীকান্ত তুমি দেখছি
আসরটাকে করবে মাটি।

আমি তার মায়াবী কন্ঠে গানটি শুনে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম। গানের ফাঁকে কথায় কথায় জানতে পারলাম, রাকেশের বাবা অজয় কুমার সরকার পরিবারের সাথে সাভারে বাস করতেন। তিনি আজ থেকে বিশ বছর আগে সিঙ্গাপুর আসেন। তার দুই ছেলে রাকেশ কুমার সরকার ও অনন্ত কুমার সরকার। তারা দুই ভাই বাংলা গান করতে পছন্দ করে।

রাকেশের সাথে লেখক (বা থেকে প্রথম)

অজয় কুমার সরকার এখন সিঙ্গাপুরে পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট পেয়েছেন, তার ছেলে রাকেশও পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট, ছোট ছেলে এখনও পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট পায়নি। রাকেশের জন্মের একমাস পরই তিনি স্ত্রী ও সন্তানকে সিঙ্গাপুরে নিয়ে আসেন। সে হিসেবে রাকেশ সম্পূর্ণ বাংলাদেশী সংস্কৃতির বাহিরে বড় হয়েছে৷

একটু বিরতির পর রাকেশ তার দরদী কন্ঠে গেয়ে উঠে, ‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই ভবে ’ আহা! কি কন্ঠ। আমি চোখ বন্ধ করে অন্য এক জগতে হারিয়ে গিয়েছিলাম।

এরপর সে দেশাত্নবোধক গান গেয়ে উঠল-

বাংলা আমার মা জননী বাংলা আমার প্রান,
এই ভাষাতে কথা বলি
আমি গাই বাংলারই গান।

তার কন্ঠে দেশাত্নবোধক গান শুনে আনন্দে মনটা ভরে উঠল। দেশের প্রতি কতটা ভালোবাসা থাকলে অন্তর থেকে এত সুন্দর করে গেয়ে উঠতে পারে। আমাদের অনুরোধে সে গেয়ে উঠল জনপ্রিয় গান, ‘রুপের ওই প্রদীপ জ্বেলে কি হবে! তোমার কাছে কেহ না এলে নেবার।’

যতক্ষন ওর গান শুনেছি ততক্ষন মনে হয়েছিল সুরের জগতে হারিয়ে ছিলাম। মিউজিক নাকি ভঙ্গ হৃদয়ের জন্য ঔষধ স্বরুপ রাকেশের গান শুনে তা উপলব্ধি করেছি। তার গান শুনে ঘোরের মধ্যে হারিয়ে যাই। মনে হয়েছিল সারাটা জীবন যদি এভাবেই কাটিয়ে দিতে পারতাম।

গান শেষে রাকেশের পিতার কাছে জানতে চাই, সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশ ও সংস্কৃতির মধ্যে বসবাস করেও তিনি ছেলেকে বাংলা গান শেখাচ্ছেন কেন? এখানে সবাই চায় তাদের সন্তান ইংরেজ গান শিখুক ইংরেজি সাহিত্য চর্চা করুক।

অজয় কুমার সরকার বললেন, খুব অল্প বয়সেই আমার গানের প্রতি ঝোঁক ছিল, হারমোনিয়াম বাজানোর স্বপ্ন ছিল কিন্তু পারিবারিক অবস্থা সেরকম ছিল না, তাই আমার স্বপ্ন পূরণ হয়নি। সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে তরুন বয়সে সিঙ্গাপুর চলে আসি।

তাই আমার অপূর্নতাগুলো ছেলেদের মাঝে ফুটিয়ে তুলতে চাই৷ সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশী সংস্কৃতির তেমন চর্চা করার তেমন সুযোগ হয় না।আমার ইচ্ছে আমার স্বপ্ন আমার ছেলে দুটি যাতে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি বুকে ধারণ করে। আমি তাদের ১৮ বছর পূর্ন না হওয়া পর্যন্ত আমার চেষ্টা চালিয়ে যাব৷ বাকিটা ওদের ইচ্ছে।

কথায় কথায় জানতে পারি, খুব কড়া সিডিউলে দিন কাটে রাকেশের৷ স্কুলে পাঠ্যপুস্তক নয়টি বই ইংরেজিতে শুধু একটা বই বাংলায়। তাও সপ্তাহে একদিন বাংলা স্কুলে যায়। ওর চারপাশে সবাই ইংরেজিতে কথা বলে, তাই রাকেশের বাবা-মা ভয়ে ছিলেন ছেলেকে বাংলা শিখাবেন কেমন করে।

রাকেশের মা অমিতা রানী সরকার ও বাবা অজয় কুমার সরকার অক্লান্ত পরিশ্রম করে ছেলেকে বাংলা শিখিয়েছেন। শুধু বাংলা ভাষাই নয়, তারা তাকে বাংলাদেশের সংস্কৃতিও শিক্ষা দিচ্ছেন। রাকেশের বাবা মায়ের ইচ্ছে ছেলে লেখা পড়ার পাশাপাশি গানের শিল্পী হয়ে উঠুক৷ আজীবন সে বাংলা গান গেয়ে যাক।

রাকেশের গানের শিক্ষক সংকর রায় বলেন, আমি আজ আড়াই বছর যাবত রাকেশকে তালিম দিচ্ছি৷ আমি তার ভেতর প্রতিভা খুঁজে পেয়েছি যা অন্য কারো ভেতর পাইনি। আমার বিশ্বাস একদিন সে বিখ্যাত সংগীত শিল্পী হয়ে উঠবে।

এ ব্যাপারে আমরা রাকেশের সঙ্গে আলাপ করে জানতে পারি। তার স্বপ্ন ডাক্তার হবার। পাশাপাশি বাংলা সংস্কৃতি ও বাংলা গান ধরে রাখতে চায় সে৷ তবে সে শুধু বাংলা গানই গেয়ে যেতে চায়৷ তার অন্য কোন ভাষার গান করার ইচ্ছে নেই। তার প্রিয় শিল্পী মান্না দে৷ তবে সে দেশাত্নবোধক ও নজরুল গীতি গাইতে বেশী স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।

তার কাছে জানতে চাওয়া হয় প্রতিদিন স্কুল, কোচিং, পিয়ানোর শেখার ক্লাশ, গানের ক্লাশ এত ব্যস্ততা তার কোন সমস্যা হয় কিনা! সে হাসিমুখে সাবলীলভাবে জবাব দেয় কোন সমস্যা হয় না। বরং ব্যস্ততা সে উপভোগ করে৷

যখন গান গায় তখন নাকি সে একধরনের সুখ অনুভব করে যা অন্য কোন কাজে পায় না। এরই মধ্যে সে হারমোনিয়াম, তবলা, গীটার বাজানো শিখেছে। এখন শিখছে পিয়ানো। এত ব্যস্ততার মাঝেও সে মাঝেমাঝে খেলার মাঠে সমসবয়ীদের সাথে ফুটবল খেলায় মেতে উঠে৷ তার প্রিয় খেলা ফুটবল।

এই বয়সেই তার সাফল্যে ধরা দিয়েছে কয়েকটা মুকুট। সিঙ্গাপুর বাংলাদেশ সোসাইটির উদ্যোগে আয়োজিত প্রতিভার খোঁজে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে আসছে ২০১৬ সাল থেকে৷ ২০১৬ সালে গানে অংশগ্রহণ করে তৃতীয় স্থান অধিকার করেছে এবং ২০১৭ ও ২০১৮ সালে প্রথম স্থান অধিকার করার গৌরব অর্জন করে৷

এছাড়াও বাংলাদেশ ল্যাঙ্গুয়েজ এন্ড কালচারাল ফাউন্ডেশন (বিএলসিএফ) এর উদ্যোগে আয়োজিত বাংলা ভাষা রিডিং প্রতিযোগিতায় ২০১৮ সালে অংশগ্রহন করে প্রথম স্থান অধিকার করার গৌরব অর্জন করে।

তার গান শুনে বাংলাদেশ হাইকমিশনার তার গানের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন এবং মাঝেমাঝে দূতাবাসের অনুষ্ঠানে রাকেশকে গান গাওয়ার আমন্ত্রন জানানো হয়।

  • প্রতিবেদন- ওমর ফারুকী শিপন, সিঙ্গাপুর

আরও পড়ুন- রোমে চলছে শারদীয় দুর্গোৎসব

প্রবাসীদের সব খবর জানতে; প্রবাস কথার ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.