Featured অস্ট্রেলিয়া ওশেনিয়া রঙ্গের দুনিয়া

অস্ট্রেলিয়ার বুশফায়ার আগুন থেকে সাবধান!

শেয়ার করুন

দেখতে দেখতে একটি সপ্তাহ চলে গিয়ে আজ শনিবার থেকে শুরু হল আরেকটি চমৎকার বসন্তের উইকেন্ড। সকালে নাস্তা করে রওনা দেই, আমাদের সাপ্তাহিক রুটিন কাজ লেপিংটনের উদ্দেশ্যে। যাওয়ার পথে আমাদের বাসা থেকে মাত্র চার কিলোমিটার দূরত্বে, মিলপ্যারা রোডের পাশেই বিশাল হার্ডওয়ার চেইন বানিংস এর কার পার্কের পূর্ব দিকে দেখা গেল কমলা রঙের একটা ফায়ার ট্রাক ও বেশকিছু জটলা।

ঘটনা দেখার জন্য আমরা ডানদিকে মোর নিয়ে কার পার্কে‌ আসতেই দেখি এখানে প্রায় ১৫০০ বর্গমিটার জায়গা নিয়ে নিউ সাউথ ওয়েলস রুরাল ফায়ার সার্ভভিসে (এনএসডাব্লিউ আরএফএস) এর প্রদর্শনী চলছে।

 

গেল সপ্তাহে সিডনি ও তার আশেপাশের অঞ্চলে প্রচুর বৃষ্টিপাত হলেও আউটব্যাক‌ বা গ্রামাঞ্চলের দিকে সামান্যই বৃষ্টিপাত হয়েছে। ফলে, চলমান খরা ও গেল শীতে অপ্রতুল বৃষ্টিবাদলের কারণে অস্ট্রেলিয়ার আউট ব্যাকের অধিকাংশ অঞ্চলের গাছপালা এখন শুকনা জ্বালানি লাকড়িতে রূপান্তরিত হয়েছে।

হার্ডওয়ার চেইন বানিংস কার পার্কে প্রদর্শনী মেলা, ব্যাংক্সটাউন, সিডনি।

এরমধ্যে বসন্তের তীব্র মৌসুমী বাতাসের কারণে কুইন্সল্যান্ড সহ আমাদের নিউ সাউথ ওয়েলসের অনেক জায়গায় বুশফায়ার‌ বা দাবানলের খবর পাওয়া যাচ্ছে। আজ সকালেও গাড়িতে উঠেই রেডিওতে আবহাওয়ার পূর্বাভাস জানা গেল এন এস ডাবলুর কোথাও কোথাও আজ দাবানল হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা আছে।

 

প্রতিবছর এই শুকনা মৌসুমে দাবানলের হাত থেকে প্রাণী ও বসতবাড়ি রক্ষা করার জন্য প্রথমেই যারা জীবন বাজি রেখে ঝাঁপিয়ে পড়েন তারাই হচ্ছেন (এনএসডাব্লিউ আরএফএস) এর স্বেচ্ছাসেবক দল। প্রায় প্রতি বছরই ভয়াবহ দাবানল দমনের সময় জানমালের ক্ষয়ক্ষতির সাথে এই সংস্থার এক বা বা তার অধিক নিবেদিত প্রাণ কর্মীর অকালমৃত্যুর ঘটনা ঘটে।

১৯৯৪ সালের জানুয়ারিতে নিউ সাউথ ওয়েলসের উপকূল বরাবর গভীর জঙ্গলে ছোট বড় ৮০০ টির বেশি দাবানলের ঘটনা ঘটে। এর ফলে প্রায় ২০ লক্ষ একর বনাঞ্চল ও ২০৫ টি বসতবাড়ি পুড়ে ভষ্মিভূত হয়। স্মরণকালের ভয়াবহ এই দাবানলে ১২০ জন মারাত্মক আহত ও চারজন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে একজন ছিলেন বুশফায়ার ভলান্টিয়ার। এই অগ্নিকাণ্ডের মোট ক্ষতির পরিমাণ ছিল ১৬৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

প্রায় ১০০ বছর ধরে নিউ সাউথ ওয়েলসের বনাঞ্চলে দাবানল প্রতিরোধের জন্য বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী প্রায় ২০০ টি সংস্থা নিয়োজিত থাকলেও, একক কমান্ডের আওতায় কোনো সংস্থা না থাকায় ১৯৯৪ সালের ভয়াবহ দাবানলের প্রেক্ষিতে ১৯৯৬ সালে প্রথম গঠিত হয় এই (এনএসডাব্লিউ আরএফএস) সংস্থাটি।

এক শিশুকে ফায়ারম্যান দেখাচ্ছেন কিভাবে আগুন নেভাতে হয়।

২০১৬ সালের হিসাব মতে আরএফএস এর বর্তমান জনবল ২৫ হাজারের কিছু বেশি। এরমধ্যে সরকারি বেতনভুক্ত লোকজন প্রায় ৯০০ এর মতো হলেও বাকি ২৪ হাজারের উপর জনবল হচ্ছে নিবেদিতপ্রাণ স্বেচ্ছাসেবকের দল। তারাই বর্তমানে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ স্বেচ্ছাসেবী অগ্নিনির্বাপণ সংস্থা হিসেবে পরিচিত।

তাদের মূল কাজ হচ্ছে নিউ সাউথ ওয়েলসের বনাঞ্চলের দাবানল প্রতিরোধ করা। অন্যদিকে শহর এলাকায় বসতির অগ্নি নির্বাপনের জন্য গঠিত সরকারি দমকল বাহিনী। তবে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের দাবানল প্রতিরোধ ছাড়াও এই সংস্থাটি শহর এলাকার বড় বড় কলকারখানার অগ্নিনির্বাপন সহ মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনা ও অন্যান্য জরুরী পরিস্থিতিতেও অগ্নি নির্বাপনের সহায়তা করে। প্রতি বছর গড়ে ছোট বড় প্রায় ২৩ হাজার দুর্ঘটনার কাজে সহায়তা করে থাকে প্রতিষ্ঠানটি।

প্রদর্শনীতে রয়েছে শিশুদের বিনোদনের ব্যবস্থা।

তবে, প্রতিবছরই শুষ্ক মৌসুমের সময় তারা সাধারণ জনগণের মধ্যে দাবানলের সময়ে করণীয় সম্পর্কে বিশেষ যে সতর্কবাণী ও সচেতনতা কার্যক্রম গ্রহণ করে থাকে আজকের প্রদর্শনীটি হচ্ছে তারই একটি অংশ।

পাশেই পার্কিংয়ে গাড়ি রেখে আমি প্রদর্শনীর সংরক্ষিত এলাকায় ঢুকতেই দেখলাম, হাতের বাম পাশে একটা ফায়ার ট্রাক রাখা আছে স্ট্যাটিক ডিসপ্লের জন্য। সেখানে একটি ছোট্ট বছর তিনেকের এক শিশুকে একজন স্বেচ্ছাসেবক ফায়ারম্যান হাতে কলমে দেখাচ্ছিলেন কিভাবে দমকল বাহিনীর লোকজন আগুন নেভানোর জন্য হোস পাইপ ব্যবহার করেন।

ঘোড়ার পিঠে ছড়েছে দুই শিশু।

কিছুক্ষণ ডিসপ্লে এলাকাটা ঘুরে ঘুরে দেখতে পেলাম আরো মজার কিছু অ্যাক্টিভিটির আয়োজন, যার মাধ্যমে এই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাটি কিছু চ্যারিটির আয়োজন করেছেন। যেমন দর্শনীর বিনিময়ে প্রদর্শনীর খোলা জায়গায় টমটম ঘোড়ায় চড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে ৫ থেকে ৬ বছরের দুটি শিশু। এর পাশেই চারদিকে তারের বেড়া দেওয়া একটা খাঁচার মধ্যে রাখা আছে বেশ কিছু হাঁস-মুরগির ছানা আর কিছু ভেড়া-বকরি।

এদেরকে দুই ডলারের বিনিময় পশুর খাবার খাওয়ানোর মাধ্যমে যেকোন দর্শক এই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার দান-দক্ষিণার কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে পারেন। পশুর খাঁচার পাশেই আছে মাটিতে সবুজ ম্যাট বিছানো কিছু ‘বাগাডুলির’ মতই বল খেলার আয়োজন। এখানেও ২ থেকে ৪ ডলার দিয়ে যে কেউ এই খেলায় অংশগ্রহণ করে আনন্দের মাধ্যমে চ্যারিটি করতে পারেন।

প্রদর্শনীতে লেখক মহিউদ্দিন কিবরিয়া।

এছাড়াও একদিকে আছে কিছু গাছের চারা ও সার মাটির বস্তা। আগত দর্শকরা এখান থেকেও কেনাকাটা করে, অথবা এর পাশেই তাবুতে ব্যবস্থা করা গরম গরম এই সসেজ রোল কিনেও অনেকে এই চ্যারিটিতে সামিল হতে পারেন। কিন্তু, সবেমাত্র নাস্তা সেরে রওনা দেওয়ার কারনে ইচ্ছে থাকলেও সসেজ বানের দিকে আর গেলাম না। তাই মিনিট পনেরো পর গাড়ি ঘুরিয়ে রওনা দিলাম দক্ষিণ-পশ্চিম সিডনির লেপিংটনের দিকে আমাদের আজকের দিনের প্রথম উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য।

  • মহিউদ্দিন কিবরিয়া, নিউ সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া 

আরও পড়ুন- দক্ষিণ কোরিয়ার শ্রমবাজার; ইমেজ সংকটে প্রবাসীরা!

প্রবাস কথা আপনাকে নিয়ে যাবে পৃথিবীর সকল প্রান্তে; প্রবাসীদের সব খবর জানতে, প্রবাস কথার ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.