Featured অস্ট্রেলিয়া ওশেনিয়া

সিডনির ডার্লিং হারবারে লেজার শো ও আতশবাজি উৎসব

শেয়ার করুন

ইংল্যান্ডের রানীর জন্মদিন উপলক্ষ্যে ১০ জুন অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে ছিল সরকারি ছুটি। ফলে শুক্রবার থেকেই এখানে ছিল চারদিনের ‘লং উইকেন্ডস’।

এরই মধ্যে শুক্রবার রাতে সার্কুলার কী সংলগ্ন বিখ্যাত অপেরা হাউজ ও হারবার ব্রীজসহ সিডনি ফেরি ঘাট, রকস এ ইন্টারন্যাশনাল পেসেন্জার টার্মিনাল জুড়ে বিশাল এলাকায় এক ঐন্দ্রজালিক লেজার বীমের মোহাচ্ছন্ন দৃশ্য উপভোগের মাধ্যমে আমাদের ভিভিড সিডনি ২০১৯ এর প্রথম পর্বের সমাপ্তি ঘটে।

তবে, ফেরার পথে মেলা আয়োজকদের কাছেই জানা গেলো যে, সিডনির অন্যতম আকর্ষণীয় এলাকা ডার্লিং হারবারেও এই লেজার লাইট শো চলছে, এবং রোববার রাত নয়টায় অনুষ্ঠিত হবে আতশবাজি পোড়ানো।

প্রতিবছর ৩১ ডিসেম্বর মাঝরাতে সিডনি হারবারে ইংরেজি নতুন বছরকে স্বাগত জানিয়ে যে চোখ ধাঁধানো বাজিপোড়ানোর আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানটি হয় , সেটা আমরা অল্পবেশি সবাই জানি। তাই, ডার্লিং হারবারের আতশবাজি উৎসবের কথা জেনে আমরা তখনি রোববার ভিভিড সিডনির দ্বিতীয় পর্ব দেখার সিদ্ধান্ত নেই।

এ উপলক্ষ্যে গত রোববার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় ট্রেনে করে রওনা দিয়ে সাড়ে আটটার মধ্যেই চলে আসি আমাদের বহু পরিচিত সিডনি ডাউনটাউনের অন্যতম আকর্ষণ নান্দনিক ডার্লিং হারবারে। ডার্লিং হারবার মুলত একটা মেরিনা অর্থাৎ প্রমোদ তরী ইয়ট ও ছোট বড় ব্যাক্তিগত ইঞ্জিন চালিত বোটের বার্থিং বা রাখার স্থান।

২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত তিন বছরে মোট ৩.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রেনোভেশনের মাধ্যমে এই শতবর্ষ পুরোনো হারবারটাকে দৃষ্টি নন্দনভাবে পুনঃসজ্জিত করা হয়।

ফলে ডার্লিং হারবারের স্টেট অফ আর্টে বিশাল সিডনি ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন এন্ড এক্সিবিশন সেন্টার, অস্ট্রেলিয়ান মেরিটাইম মিউজিয়ামসহ পৃথিবী বিখ্যাত পাঁচ তারকা হোটেল ও দারুণ একটা শপিং সেন্টার ও ফুডকোর্ট এখন দেশি-বিদেশী পর্যটকদের অন্যতম দর্শনীয় স্থান।

ডার্লিং হারবারের ঠিক মাঝে আছে প্রায় ৪০০ মিটার লম্বা একটা কাঠের পাটাতনের ব্রীজ। এই ব্রীজ দিয়ে আগত দর্শনার্থীরা পায়ে হেটে হারবারের একপাশ থেকে অন্যপাশে যাতায়াত করে।

রাত সাড়ে আটটায় আমরা যখন ডার্লিং হারবার ব্রীজের পাটাতনে হাজির হই, তখন সেখানে আক্ষরিক অর্থেই পা ফেলার জায়গা নেই। পহেলা জুন থেকে লাগাতার হাড় কাঁপানো শীত-বৃষ্টির পর গত রোববার সকাল থেকেই সিডনীর আবহাওয়া হয়ে ওঠে চমৎকার রোদ ঝলমলে।

তাই সারাদিন ২২ থেকে ২৩ সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় সমগ্র সিডনীবাসী যেন আড়মোড়া ভেঙে ঘরের বাইরে বেরিয়ে সবাই এসে জমা হয়েছে এই ডার্লিং হারবারে!

কিন্তু দিনের আলোয় অনেক দিনের চেনা এই হারবারটাকে মনে হচ্ছিল যেন রূপকথার ‘এলিস ইন দ্যা ওয়ান্ডার ল্যান্ড!’ নয়টা বাজার আগ পর্যন্ত আমি তাই আলো ঝলমলে হারবারের চারদিকে তাকিয়ে এই রাতের ‘অচেনা সিডনী’ শহরটাকে দিনের চেনা শহরের সাথে অবাক বিস্ময়ে মেলাতে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হই।

আতশবাজির আকর্ষণ বাড়াতেই ব্রীজের উপরের বেশ কিছু লাইট বন্ধ করে একটা আলো আঁধারির পরিবেশ সৃষ্টি করা হলো ঠিক নয়টা বাজার কয়েক মিনিট আগেই। নয়টা বাজতেই হারবারের বোট বেসিনের মাঝখানে একটা প্রায় অদৃশ্য ভাসমান পনটুন থেকে শুরু হয় মাত্র পাঁচ সেকেন্ডের আতশবাজি পোড়ানো।

এরই সাথে সাথে ব্রীজের উপর ও গোটা হারবারের চারপাশ ঘিরে দাড়িয়ে থাকা হাজার হাজার মানুষের কোলাহল থেমে তখন নেমে আসে পিনপতন নিস্তব্ধতা।

আমার মতো প্রথম আগত অনেকেই ভাবলাম আতশবাজির এইটুকুই বুঝি সব। কিন্তু ঠিক পাঁচ মিনিট পরই আবার শুরু হলো আরেক দফা আতশবাজি ফোটানো, আর তা চললো পাক্কা ৩৫ সেকেন্ড, আতশবাজির সাথে মন মাতানো মিউজিকের আওয়াজে সমস্ত হারবার এলাকাটাকে মনে হচ্ছিল যেন হাজার হাজার দর্শকে পরিপূর্ণ বিশাল একটা ছাদখোলা অডিটোরিয়াম!

মাত্র আধ মিনিটের আতশবাজি মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখার পর সদ্য ‘হাট ভাঙা’ হাটুরে লোকজনের মতোই মানুষের ঢল নামে বাড়ি ফেরার জন্য, আর এই ফিরতি কাফেলায় আমরাও সামিল হই।

যদিও এই ৩৫ সেকেন্ডের আতশবাজির উৎসবে পুড়ে হাওয়া হয়ে যায় কয়েক লাখ ডলারের পাইরোটেকনিক ডার্লিং হারবারের খোলা আকাশে, কিন্তু মনে তবুও থেকে যায় ‘শেষ হইয়াও হইলো না’ ‘র রেশটুকু!

মহিউদ্দিন কিবরিয়া, সিডনি, অস্ট্রেলিয়া 

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.