Featured ইউরোপ জার্মানী

আত্মপরিশুদ্ধির মাস; জার্মানিতে প্রথম রোজা

শেয়ার করুন

বাংলাদেশ থেকে প্রথম যখন জার্মানির হামবুর্গ টেকনিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলে যুবরাজের কাছে এসেছিলাম, তার কিছু দিনপরেই রোজা শুরু হয়েছিল। দেশের বাইরে আমার প্রথম রোজা, যুবরাজ তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০ ঘণ্টার কাজ করতো।  

এখানে কোন ছাত্রই পড়াশুনা চলাকালীন ২০ ঘণ্টার বেশী কাজ করার (ওয়ার্ক পারমিট) পায় না। যেটা ছিল অতি সামান্য কিছু টাকা ,বাসা ভাড়াতেই সেটা শেষ হয়ে যাওয়ার মতন অবস্থা হত। বিয়ের পর জয়েন ফ্যামিলিতে থেকেই আমি অভ্যস্ত ছিলাম, বাড়িতে বোনের/বান্ধবী মত ননদ , দেবর এবং নিজের বড় ভাইয়া সবাই মিলে থাকার কারনে বিদেশে এসে প্রথম রোজায় ইফতার খাওয়ার সময় চোখ ভিজে উঠতো। যুবরাজ খুব অসহায় অনুভব করতো। কোনভাবেই আমি আমার চোখের পানি আটকাতে পারতাম না ।

সৌভাগ্যক্রমে ঐ বছর হামবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে Information & Communication System এ প্রায় ২২/২৩ জন ছাত্র-ছাত্রী ছিল মুসলিম এবং তারাই তখন যুবরাজকে জানিয়েছিল, সব মুসলিম ছাত্র-ছাত্রীরাই মসজিদে গিয়ে ইফতার করে।

আমরাও মসজিদে গিয়ে সবার সাথে বসে ইফতার করলে, আমি হয়তো দেশের কথা ভুলতে পারবো । তাদের কথা অনুযায়ী ঐ প্রথম আমার মসজিদে গিয়ে ইফতার করা শুরু হয়েছিল।

এইবার জার্মান সম্পর্কে কিছু কথা না বললে বুঝতে পারবেন না কেন আপনাদের এই গল্প আমি বলছি।

জার্মান হচ্ছে সেই দেশ যেখানে বিয়ার/মদ থেকে পানির দাম বেশী, শুধু তাই নয় যেখানে পতিতারাও সরকারকে ট্যাক্স পে করেন এবং কিছু পতিতা আছেন যারা বছরে ৬০ হাজার ইউরো সরকারকে ট্যাক্স পে করেন। ঠিক এই রকম একটা দেশে কত যে মসজিদ আছে যেটা আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না ।

এমন কি শুধু মাত্র হামবুর্গেই ৭৫টি মসজিদ আছে । শুধু মসজিদই নয়, আছে হিন্দুদের মন্দির এবংবৌদ্ধদের উপাসনালয় । অথচ সব থেকে মজার ব্যাপার জার্মানরা নিজেরাই ৯০% নাস্তিক (কোন ধর্মে বিশ্বাসী নন) আরও মজার ব্যাপার ছিল, মসজিদগুলি গড়ে উঠতো বিশাল জায়গা নিয়ে, মসজিদের সাথেই থাকতো রেস্টুরেন্ট, নাপিতের দোকান এবং সেই সাথে কিছু ছোট মুদিখানা এবং বেকারি ।

যেন যারা ওখানে যাবেন তারা বাজার করার সাথে সাথে নামাজের সময় নামাজটা পড়ে নিতে পারেন । এটা যে শুধু ছেলেদের জন্য তা নয়, ঐ সব মসজিদে মেয়েরাও নামাজ পড়তে পারতেন, বাচ্চারা মায়ের পাশে খেলা করছে আর মা নামাজ পড়ছেন ।

কোন জার্মান বা অমুসলিম কাউকে সেই মসজিদের দিকে বাঁকা চোখে তাকাতে দেখি নাই বরং মসজিদের রাস্তা হারিয়ে ফেললে অনেক সময় কোন জার্মান লোক/মহিলা আমাকে মসজিদে পৌঁছে দিয়ে তারপর সে তার নিজের গন্তব্যে চলে যেতেন। এরই নাম হয়তো মানবতা!

যে মানবতা সম্পর্কে বারবার ইসলামে বলা হয়েছে। তাইতো মসজিদ শুধুমাত্র ছেলেদের জায়গা নয়, এটা মহিলা /পুরুষ এবং বাচ্চা সবার ঘর। সবাই তার সৃষ্টিকর্তার কাছে একান্ত নিজের মনের কথা, শুকরিয়া করার জন্য আল্লার এই ঘরে যেতে পারেন। যার যতক্ষণ মন চাইবে সে ততক্ষণ নামাজ পড়বেন।

রোজার মাসে জার্মানির সব মসজিদেই সবাইকে ইফতার দেওয়া হত এমনকি কেউ জানতেও  চাইতো না যে ইফতার করার আগে সে কি নামাজ আদায় করেছে, সে কি মুসলিম নাকি অন্য ধর্মের লোক ? এই বিয়ষটা আমাকে বরাবর মুগ্ধ করতো ।

রোজার পরও আমি নিজে বাজার করতে গেলে, নামাজের সময় হলে মসজিদে মেয়েদের জায়গায় গিয়ে নামাজ আদায় করে তারপর হোষ্টেলে ফিরে আসতাম। আপনাদের অনেকেরই হয়তো মনে আছে, বিটিভি একসময় বিদেশে কে কিভাবে ইফতার করেন সেটার উপর প্রামাণ্য চিত্র দেখানো হতো।

আমি ছোটবেলায় এই অনুষ্টানটির অপেক্ষায় বসে থাকতাম । তখন মনে হত টিভিতে শুধু ভালটাই দেখাচ্ছে কিন্তু আজ নিজের চক্ষে সেটা দেখার এবং উপভোগ করার সৌভাগ্য হওয়ার কারনে আমার সব বন্ধুদের সাথে এখানকার রোজার খুব সামান্য চিত্র শেয়ার করলাম।

ইসলাম মানবতার ধর্ম , ইসলাম কাউকে শেখায় না, হিন্দু, খৃষ্টান, বৌদ্ধ হিসাবে মানুষকে আলাদা করে দেখতে এবং তার সব থেকে বড় প্রমাণ হল এখানকার মসজিদ ।

আমি এমন অনেক বাংলাদেশী ছাত্রদের দেখেছি হিন্দু/ মুসলিম যে কিনা প্রথম এই শহরে এসে মসজিদে আশ্রয় নিয়েছে তারপর হলে অথবা বাসা পেয়ে উঠে গিয়েছে । অনেক ছাত্রকে যুবরাজ নিজেই মসজিদ থেকে নিয়ে এসেছে বাসায়।

তারপর সে বাসা খুঁজে পেয়ে একসময় নিজের বাসায় উঠে গিয়েছে। বন্ধুরা এই রোজার মাস খুবই বরকতময় মাস, নিজেকে পরিশুদ্ধ এবং সব কিছু ভুলে সবার উপর মানুষ সত্য মানে ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবাই আগে মানুষ এই চিন্তা করে মানবতা দেখানোর এখনই শ্রেষ্ট সময়।

আসুন আমরা যদি আল্লাহকে ভালবাসি তাহলে তার সৃষ্টি সব মানুষকেও আমরা আমাদের ভালবাসা এবং সন্মান দেখাতে পারবো।

  • রুকসানা হাবিব লুবনা, বামিংহাম, যুক্তরাজ্য  

আরও পড়ুন- চলে গেলেন অস্ট্রিয়ার বাংলাদেশী কমিউনিটির সংগঠক শাহ মোহাম্মদ ফরহাদ

প্রবাসীদের সব খবর জানতে; প্রবাস কথার ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.