Featured ইউরোপ ইতালী

হার না মানা এক ইতালী প্রবাসীর গল্প

শেয়ার করুন

ইতালীর সিসিলী দ্বীপের অন্যতম বাণিজ্যিক শহর পালেরমো। এই শহরে প্রচুর সংখ্যক বাংলাদেশী বাস। ভাগ্যের চাকা পরিবর্তনের আশায় আশির দশকের দিকে এই শহরে প্রথম বাংলাদেশীদের আগমন হয়। তারপর ধীরে ধীরে বাংলাদেশী কমিনিউটি বড় হবার পাশাপাশি নিজের কর্মদক্ষতা, শ্রম ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই শহরের প্রবাসী বাংলাদেশীরা নিজেদের একটি শক্ত অবস্থান তৈরী করেন।

শুরুতে এসব বাংলাদেশী প্রবাসীরা গৃহস্থালির কাজ কিংবা অস্থায়ী ব্যবসার উপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহন করতেন। কিন্তু বর্তমানে এখানকার অনেক বাংলাদেশীরা নিজস্ব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং ইতালীয়ান রেস্টুরেন্টে কাজ করে আর্থিক ভাবে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে।

পালেরমোর প্রায় প্রতিটি ইতালীয়ান মালিকানাধীন রেস্টুরেন্টে কোন না কোন বাংলাদেশীকে কাজ করতে দেখা যায়। কাজের প্রতি আগ্রহ পরিশ্রম আর সততা দিয়ে এখানকার প্রবাসী বাংলাদেশীরা এই খাতে সুনাম অর্জন করেছেন।

বর্তমানে ইতালীয়ান মালিকানাধীন রেস্টুরেন্টে বাংলাদেশিরা ওয়েটার, শেফ, পিজ্জা মেকার, বার ম্যান, ডিস্ ওয়াসার সহ অন্যান্য কাজে নিয়জিত। তবে পেস্টি শেফের কাজ শিখে ইতালীয়ান সুইট এন্ড কনফেকশনারিতে কাজ করার বিশাল সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন বাংলাদেশি আজিম হোসেন।

অন্যান্য প্রবাসীদের মত নিজের ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে ২০০৮ সালে এগ্রিকালচার ভিসায় ইতালিতে পাড়ি জমান আজিম হোসেন। বাবা-মা তিন ভাই ও এক বোনের পরিবারে তিনি বড় ছেলে। তাই ইউরোপের বর্ণিল শোভায় শোভিত হবার আগেই তাকে বাংলাদেশী মালিকানাধীন একটি ফাষ্ট ফুডের দোকানে কাজে লেগে যেতে হয়।

সেখানে তিন মাস কাজ করে বৈধ কাগজ না থাকায় বছর খানেক অন্যান্য টুকিটাকি কাজ ও ব্যবসা করতে হয়। তারপর ভাগ্যক্রমে ২০০৯ সালে ইতালীতে বৈধ হবার সুযোগ পান। কিন্তু ইতালীতে আসার খরচ সহ বৈধ কাগজপত্র করতে বিশাল আর্থিক খরচের বোঝা তখন তার ঘাড়ে।

ভাষা জটিলতার কারণে ভালো কোন কাজও জোগাতে পারছিলেন না তিনি। তখন এক পরিচিত মানুষের মাধ্যমে তার বাসা থেকে সাইকেলে ৪৫ মিনিটের দূরত্বে এক ইতালিয়ান বেকারী ও কনফেকশনারিতে কাজ করার সুযোগ পান। মোটামুটি বেতনে সেখানে দুপুর ১২ থেকে রাত ১০ পর্যন্ত পরিচ্ছন্নতা কর্মী হিসেবে কাজে যোগ দেন।

সেখানে ইতালীয়ান সহকর্মীদের সাথে কাজ করে তিনি ধীরে ধীরে ইতালিয়ান ভাষা আয়ত্ত করে ফেলেন। অল্প বেতন আর পরিচ্ছন্নতা কর্মী হিসেবে কাজ করে কাজের পরিবেশের সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারছিলেন না তিনি। কিন্তু কাজ শিখা ছাড়া বেতন কিংবা পদোন্নতি সম্ভব নয়। তিনি মনে মনে সিদ্ধান্ত নেন  তাকে কাজ শিখতেই হবে।

যেই বলা সেই কাজ তিনি কাজের মালিকের সাথে কথা বলে কাজ শিখার আগ্রহ প্রকাশ করলেন। কিন্তু মালিক পরিষ্কার জানিয়ে দেন তার এখানে আর কোন কারিগরের প্রয়োজন নেই। আর যারা পেস্টি শেফ তারা ভোর ৫টা থেকে দুপুর ১২ টা পর্যন্ত কাজ করেন যেখানে আজিম হোসেনের কাজই শুরু হয় দুপুর ১২ টা থেকে।

অনেকটা নিরাশ হয়ে মালিকের কাছ থেকে ফিরে আসতে হলো থাকে। সারাদিন হতাশা আর অস্তিরতা নিয়ে কাটাতে হল তাকে। কিন্ত আজিম হোসেন বদ্ধপরিকর বাংলা একটা প্রবাদ আছে  ‘পরিশ্রম সাফল্যের চাবিকাঠি’ তাকে যেকোন মূল্যে কাজ শিখতে হবে।

সারারাত অনেক হিসেব-নিকেশ কষে পরদিন সকালে আবার মালিকের সামনে হাজির হলেন। কাজ শেখার স্বার্থে মালিককে প্রস্তাব দিলেন তিনি বিনা পারিশ্রমিকে ভোর ৫টা থেকে ১২টা পর্যন্ত কাজে আসবেন এবং পরে তার পূর্বনির্ধারিত বেতন ও সময় অনুযায়ী কাজ করে যাবেন, মানে ভোর ৫টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত একটানা কাজ করে যাবেন।

এমন পাগলামো প্রস্তাবে মালিক অনেকটা অবাক হলেও আজিম হোসেনের আগ্রহ দেখে আর না করার সাহস পেলো না। কিন্তু শর্ত একটাই ক্লান্তির দোহাই দিয়ে কাজে কোন অবহেলা করা যাবে না। অনুমতি পেয়ে আজিম হোসেন মহা খুশী। কিন্তু তখনও তিনি জানতেন না যে তার এই অদম্য সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে তার জীবনকে পুরোপুরি পালটে দিবে।

শুরু হলো আজিম হোসেনের জীবনে নতুন অধ্যায় ভোর ভোর ৫টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত কাজ। শুরুতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অন্যদের কাজ করা দেখা ছাড়া আর কিছুই করার ছিলোনা আজিম হোসেনের। তবে ধীরে ধীরে কারিগরদের সহযোগী হিসেবে কাজ করে সেখানে নিজের একটা অবস্থান তৈরী করতে সক্ষম হন তিনি।

প্রায় দুই বছর রাত-দিন কাজ করে ইতালীয়ান মিষ্টান্ন এবং কনফেকশনারির কাজ শিখতে সক্ষম হন। যখন বিস্কুট, ইতালীয়ান মিষ্টি, কেক ইত্যাদি বানাতে তিনি পারদর্শী হয়ে উঠলেন। তখন কাজের মালিক এসে আজিম হোসেনকে প্রস্তাব দিলো পেস্টি শেফ হিসেবে তিনি কাজ করতে রাজি আছেন কি না, এই প্রস্তাবটি ছিলো তার জন্য সোনার হরিণ হাতে পাবার মত।

মালিকের সাথে কথা বলে নতুন বেতন এবং কাজের সময় নির্ধারণ করে পেস্টি শেফ হিসেবে কাজ শুরু করেন। এরপর আর পেছনে ফিরে থাকতে হয়নি তাকে। সেখানে তিনি মাস খানেক কাজ করে নিজের যোগ্যতা যাচাইয়ে জন্য আরেকটি বার এ কাজ শুরু করেন।

সেখানে আরো বছর খানেক কাজ করে পালেরমো শহরের প্রসিদ্ধ এক স্থানে ইতালীর মিলান ভিত্তিক ফ্রাঞ্চাইজিং (Bioesseri) নামে একটি রেস্টুরেন্ট প্রধান পেস্টি শেফ হিসেবে নিয়োগ পান। এখানে ভালো বেতন ও ভালো কাজের কন্ট্রাক নিয়ে বর্তমানে অতীতের সব কষ্ট ভুলে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন এই বাংলাদেশী।

আজিম হোসেনের মতে বাংলাদেশীরা পেস্টি শেফের কাজ অনেক কঠিক মনে করে এ কাজের দিকে অগ্রসর হয় না। কিন্তু এই কাজে বাংলাদেশীদের বিশাল একটি কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে বলে তিনি জানান। এছাড়াও রেস্টুরেন্টের অন্যান্য কাজের তুলনায় এই কাজে বেতন ও কর্মক্ষেত্রে সম্মানের দিকেও অনেক এগিয়ে রয়েছে।

  • তাফাজ্জুল তপু, পালেরমো প্রতিনিধি, ইতালি।
শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.