Featured অভিবাসন আমেরিকা কানাডা বিনোদন

চাপা কষ্টে প্রবাসীদের স্বপ্নের ঈদ!

শেয়ার করুন

প্রিয় পাঠক ঈদ আসছে…। ঈদ আসলেই মনটা খুব খারাপ হয়ে যায়। মা-বাবাকে খুব বেশী মনে পড়ে। ওনাদের বয়স হয়েছে; আমরা তিন ভাই বোন সবাই ওনাদের কাছ থেকে অনেক দূরে থাকি। আমার বড় ভাই গত দুই বছর আগে হঠাৎ স্ট্রোক করে খুব অল্প বয়সে মারা গেছেন।

ওর ১১ বছরের ছেলে আর ভাবীকে নিয়ে ওনারা বাংলাদেশে থাকেন। ঈদ আসলে নিজেকে খুব অপরাধী মনে হয়। এতো কষ্ট করে বাবা-মা আমাদেরকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করেছেন, আর আমরা তাঁদেরকে ফেলে এই দূর দেশে চলে এসেছি-  আর কয় দিনইবা বাঁচবেন ওনারা?

রোজার দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকেই শপিং শুরু করেছিলাম। শুরু করেছিলাম আমাদের যারা দৈনন্দিন কাজে সাহায্য করেন তাদের জন্য কেনাকাটা দিয়ে। আমার আট মাসের ছেলে কাঙ্খিতকে আমি ইউনিভার্সিটিতে গেলে যারা দেখাশুনা করেন মাইমুনা খালা, রোকেয়া খালা, স্বপ্না ,আর আনিস এর জন্য কেনাকাটা দিয়ে শুরু করলাম এবার ঈদের কেনাকাটা। আমাদের মেয়ে শ্রেয়া আরবি টিচার জোহরা আপা, গানের টিচার মলয় দাদা আর নাচের টিচার রিংকু রোজারি ও দিদির জন্য। আমাদের নিজেদের জন্য, আমার মা-বাবা , ভাই-বোন, দেবর-ননদ, বন্ধু-বান্ধব আত্মীয় স্বজন, আমাদের কর্মস্থলেরসহ কর্মীদের সবার জন্যই কেনাকাটা করেছি, কেউই বাদ যায়নি।

জাকাত-ফেতরাদে ও য়ার জন্য শশুর বাড়িতে এবং আমার দাদা বাড়িতে যারা গরীব আত্মীয়-স্বজন আছেন তাদের সবার জন্যই আমি আর মুকুল রোজার শুরুতেই বসে বসে লিস্ট করেছি। ঈদের উপহার কাকে কত টাকা দেব তাও লিখে রেখেছি। কারণ বেতন এবং বোনাস দুটোই তো সীমিত।এর মধ্যে থেকেই তো বাজেট করে খরচ করতে হবে ।

রোজার প্রতিটা দিনই ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস নিয়েই চলে যেতে হতো কেনা কাটা করতে। কোনো গাড়ী ছিল না আমাদের, ইউনিভার্সিটির গাড়ীতে ক্লাস নিতে যেতাম আর আসতাম। তাই ঈদের কেনা কাটায় রিকশাই ভরসা ছিল। বাসায় এসে দেখতাম, স্বপ্না কাঙ্ক্ষিতকে নিয়ে বাইরে ঘুরছে, আনিস শ্রেয়াকে স্কুল থেকে নিয়ে এসেছে, মাইমুনা খালা ওদের দুইজনেরই খাওয়া-গোসল সব করিয়ে ও কত রকমের ইফতার বানিয়ে রেখেছে! রোকেয়া খালা পুরা বিল্ডিংয়ের সিঁড়ি, গ্যারেজ, সমস্তঘর-বাড়ি ঝাড়ু দিয়ে মুছে দিয়ে গেছে। সারা রোজার মাস এভাবেই গেছে।ভোর রাতে সেহেরী খাওয়ার জন্য মাইকে ডাকাডাকি, পাড়ার ছেলেরা থালাবাটি বাজিয়ে রোজাদারদের ঘুম ভাঙানোর চেষ্টা করতো।

চাঁদরাতে ‘ও মন রমজানেরই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ গানটি বাজতে থাকে টিভিতে ‘ মাইকে সবখানে, শ্রেয়া হাতে মেহেদী দেয়, বাজি ফোটায় পাড়ার ছেলেরা, টেলিফোনে শুধু দাওয়াত দেয়া-দিয়ি চলতে থাকে। চারিদিকে শুধু খুশি আর আনন্দ, সবাই খুশি ঈদ আসাতে।

হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলো–আরে আমি তো স্বপ্ন দেখছিলাম! বাংলাদেশে আমার ফেলে আসা ঈদের দিন নিয়ে আমি এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিলাম।

বিছানায় শুয়েই আমি কাঁদি–মুকুল ঘুমিয়ে আছে পাশে- টের পেয়ে যেতে পারে তাই অন্য রুমে চলে যাই। কান্না থামিয়ে বাস্তবতায় ফিরে আসি।

গত রোজার ঈদের কথা বলি। স্কুল, কলেজ, অফিস-আদালত সবই খোলা ছিল, ছেলেকে বলেছিলাম- আজ ঈদ, তোমার স্কুলে যাওয়ার দরকার নেই, আমরা ঈদের মাঠে নামাজ পড়তে যাবো। শ্রেয়া, আমাদের মেয়ে ইউনিভার্সিটিতে ওর ক্লাস থাকাতে ওকে ক্লাসে যেতে হয়েছিল।

খুব সকালে উঠেই সব রান্না-বান্না সেরে ফেলেছিলাম। ছেলেকে অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে গোসল করে পাঞ্জাবি-পায়জামা পরতে বললাম।পাঞ্জাবি পরতে চায় না- বলেই চি আর আনইউসুআল ড্রেস। আমরাও দুই জনে কাপড়-চোপড় পরে ঈদের মাঠে অর্থাৎ ডানফোর্থের বাংলা পাড়ায় মাঠে নামাজ পড়লাম। আমরা যেখানে থাকি সেখানেই মসজিদে ইন্ডিয়ান, পাকিস্তানী, আফগানী, আরবমুসলিমরা ঈদের নামাজ পড়ে।কিন্তু ওতে আমাদের মন ভরে না- ডানফোর্থের মাঠে নামাজ পড়ি বাংলাদেশের অনেকের সাথেই দেখা হয়, কথা হয় সেই আনন্দে।

নামাজের সময় আমার পাশে একজন মহিলা খুব কান্নাকাটি করছিলো। বললেন- ছয় মাস হলো বাংলাদেশ থেকে এসেছেন, আসার পরপরই বাবা মারা গেছেন, দেখতে যেতে পারেননি, আর এখন মা হসপিটালে, কিডনি ডায়ালিসিস চলছে- যেকোনো সময় মারা যেতেপারেন- কিডনি দুটোই সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে গেছে। প্রথমে সাস্কাচেওন গিয়েছিলেন, একসপ্তাহ হলো টরন্টো এসেছেন, ওখানেতে মন কোনো কাজ পাননি তাই।দুই হাত তুলে মোনাজাতের সময় উনি যেভাবে কান্না-কাটি করছিলেন তাতে চোখের পানি কিছুতেই ধরে রাখতে পারছিলাম না। আমার মনে হচ্ছিলো আমার অসুস্থ মা-বাবার কথা।

ঈদে যে সব বাচ্চারা আমাদের বাসায় এসেছিলো তাদেরকে বাংলাদেশের স্টাইলে টাকা দিলাম ঈদ সালামী কী! তা বোঝানোর জন্য।আমরাও কারো কারো বাসায় গেলাম। এভাবেই কেটে গেলো আমাদের প্রবাসীদের ঈদ।

যারা এখানে চাকরি করেন তাদের অধিকাংশই ঈদের নামাজ পড়তে যেতে পারেন না , কারণ ঈদের দিন কোনো ছুটি থাকে না।তাই ঈদ করেন কোনো এক শনিবার বা রবিবার দেখে। মা-বাবা, ভাই-বোন , শশুর বাড়ি বাবার বাড়ির আত্মীয় স্বজন আর বন্ধু-বান্ধব নিয়ে বাংলাদেশে আমরা যে রকম ঈদ করি তেমনটি তো আর আমরা এখানে করতে পারি না তাই আমরা দুধের স্বাদ ঘোলে মিটাই।

আমরা ঈদ উদযাপন করি আমাদের মতো করে। ঈদের দিন আমরা মা-বাবার সাথে দেখা করতাম, আম্মা তার বাচ্চাদের পছন্দের খাবারগুলোই রান্না করতেন, এখন নাকি তা আর করেন না। আমরা আমাদের শশুর-শাশুড়ি আর মৃত আত্মীয় স্বজনদের কবর জেয়ারত করতাম, এখন তো আর তা পারি না, তাই এখানে বসেই ওনাদের জন্য দোআ করি। সবাইকে সাধ্য মতো উপহার আর ভালো খাবার খাইয়ে, আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে বেড়িয়ে , জাকাত-ফেতরা দিয়ে যেভাবে আমরা দেশে ঈদ করতাম তা এখন শুধু স্বপ্নেই দেখি।এখন ঈদে বাংলাদেশে ডলার পাঠাই , আত্মীয় স্বজনরা কী কিনে না কিনে জানি না। আমরা তো আর নিজের হাতে ওদের পছন্দের কিছু কিনে দিতে পারি না।আমরা বাংলাদেশ ছেড়ে প্রবাসী হয়েছি বিভিন্ন কারণে। কিন্তু আমাদের মন তো পড়ে থাকে বাংলাদেশে। দেশের মানুষ আমাদের দোষ দেয় আমরা অকৃতজ্ঞ একথা বলে। তাঁরা তো আর জানেন না আমাদের এই চাপা কষ্টের কথা!

আবার এই খানেই অনেক বাংলাদেশের মানুষ আছেন যাদেরকে দেখেনি যাকে খুব বোকা আর আনস্মার্ট মনে হয়। কালকের একটা ঘটনা বলি- একভাই-ভাবির বাসায় গিয়েছিলাম। ভাবি কাজে গেছেন, ভাই একটেবিল খাবার নিয়ে খেতে বসেছেন- আমাদেরকেও খুব অনুরোধ করছিলেন খাওয়ার জন্য। ভাই-ভাবি আসেন খাই- আমি নিজেই কয়েক রকম মাছ-মাংস রান্না করেছি একদম দেশি কায়দায়, খুবই মজা হয়েছে।আসেন গরম গরম খাই। শেষে বাধ্য হয়ে বলতেই হলো যে আমরা রোজা আছি। উনি বললেন ওনাদের ফ্যামিলিতে কেউই রোজা রাখেন না- এমনকি ওনাদের বাসায় কোনো জায়নামাজও নেই। টেবিলের উপরের বেশ অনেকগুলো বিভিন্ন ধরণের মদের বোতল সরাতে সরাতে বললেন- আমার ছোট মেয়ে গতকাল আঠারোতে পা দিয়েছে- এখন সেলিগালি এলকোহল খেতে এলাউড, তাই সবাই মিলে একটু সেলিব্রেট করেছিলাম কাল।ওনার ছেলে আসতে পারেনি কারণ সে তার আইরিশ গার্লফ্রেন্ডকে নিয়ে গতকালই নতুন কেনা এপার্টমেন্টে মুভ করেছে। ভাইদের রোজার ঈদ করার সময় সুযোগ হয় না। কারণ ওনাদের সবারই কাজ থাকে। তবে ক্রিস্টমাসে যেহেতু ছুটি থাকে , ঐসময় ওনারা কোন না কোন ভাবে সেলিব্রেট করেন। ওনারা ঠিকই করেন- যস্মিন দেশে

যদাচার না করতে পারাটা ভীষণ আনস্মার্ট। তবে আমার মনে হয় না আমি আর এ জীবনেও রকম স্মার্ট হতে পারবো।আর আমার মনে হয় আমার আশেপাশের অধিকাংশ মানুষই আমার মতো সাধারণ, তাই এই প্রবাসে আমাদের সবারই ঈদ আসে একটা মিশ্র অনুভূতি নিয়ে- আনন্দ আর বেদনায় দুইয়েরই সংমিশ্রনে চাপা কষ্টে প্রবাসীদের স্বপ্নের ঈদ!। ঈদের দিন আসলে বারে বারে শাহ নাজ রহমতুল্লার ওই গানটি মনে পড়ে –

“এক বার যেতে দে না আমার ছোট্ট সোনার গাঁয় , যেথায় কোকিল ডাকে কুহুকুহু দোয়েল ডাকে মুহুমুহু, নদী যেথায় ছুটে চলে আপন ঠিকানায়।”

 

  • লিখেছেন- মাহমুদা নাসরিন ক্যানবাংলা ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস, ২০৫/৩০৯৮ ডানফোর্থ এভিনিউ, শিক্ষক ও সমাজকর্মী।
শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.