Featured ইউরোপ রঙ্গের দুনিয়া স্পেন

স্পেনের বৈচিত্রময় জীবনের গল্প

শেয়ার করুন

জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সময়টুকু বেঁচে থাকার নামই জীবন। জীবজন্তু, বৃক্ষ, নদ-নদী, সাগর, মহাসাগর সব মিলিয়ে প্রকৃতির যত বিচিত্র রূপ আমরা দেখি তার চেয়ে কয়েক হাজার গুণ বেশী বৈচিত্রময় হল মানুষের জীবন।

পৃথিবীর সর্বোচ্চ গড় আয়ুর দেশ জাপানের মানুষ আর সর্বনিম্ন গড় আয়ুর দেশ সিয়েরালিওনের মানুষের জীবনের মাঝে কতই না ব্যবধান! কারও জীবন সুরক্ষিত কারও আবার নিরাপত্তাহীন। কারও জীবন কাটে সুউচ্চ অট্টালিকায় আর কারও আবার মাথার উপর শুধুই খোলা আকাশ। তবুও জীবন থেমে নেই। জীবন তার জীবনের গতিতেই সেকেন্ড, মিনিট, ঘণ্টার সাথে ষ্টপওয়াচের ন্যায় অবিরাম ছুটে চলেছে। বলছিলাম জীবনের বৈচিত্রের কথা।

একেকটি মানুষের জীবন একেক রকম বৈচিত্রময়। ছবিতে মহাত্বা গান্ধীর মতো দেখতে যে লোকটি তিনি স্প্যানিশ নাগরিক। থাকেন একটি ব্যাংকের বারান্দায়। আপাতত এটাই তার ঠিকানা। বারান্দাটাকে বাসস্থান বানিয়েছেন অনেক দিন হল। ব্যাংকের বারান্দায় এটিএম বুথের পাশেই পুরাতন বইগুলোকে যত্ন করে বিছিয়ে রেখেছেন। পাশেই একটি প্লে কার্ডে লিখা রয়েছে ‘আপনার পড়া হয়ে গেছে এমন কোন বই থাকলে আমাকে দিয়ে দিন’, এটাই হবে আমার জন্য আপনার কাছ থেকে পাওয়া সব চেয়ে বড় উপহার’।

যারা সাধারনত এদিকে চলাচল করেন তারা পড়া হয়ে গেছে এমন বইগুলো এই লোকটিকে দিয়ে যান। তিনি মানুষের দেয়া সেই বইগুলোকে পরম যত্নে বিছিয়ে রাখেন মাটিতে। অনেকেই আবার সেই বইগুলো এখান থেকে কিনে নেন নামমাত্র মুল্যে। আসল কথা হল, তিনি ঐ বইগুলোর কোন মুল্য চান না কখনও। যার যত ইচ্ছে তত দিয়ে বই নিয়ে যায়। পেশা বা উপার্জন বলতে তার এটাই একমাত্র সম্বল।

সারাদিন এখানেই বসে থাকেন। বই পড়েন। রাস্তা ঘাট চিনেন না এমন মানুষকে রাস্তার সঠিক তথ্য দেওয়া, এটিএম বুথের কোন সমস্যা হলে মানুষকে জানানো, ছোট ছোট শিশুদের হাতে কোন উপহার ধরিয়ে দেওয়া, এটাই তার দৈনন্দিন কাজ ।

সেদিন আমি আমার ভাইকে নিয়ে এটিএম বুথের কাছে যেতেই তিনি এগিয়ে এসে সালাম (স্প্যানিশ ভাষায়) দিয়ে বললেন, বুথটি কাজ করছেনা। আরেকটি বুথ দেখিয়ে দিলেন। আমি বেশ অবাক হয়ে তাকে দেখলাম ! ভারতের মহাত্বা গান্ধীকে আমি দেখিনি। গান্ধীর ছবি দেখেছি, ইতিহাস পড়েছি।

লোকটিকে দেখেই মহাত্বা গান্ধীর কথা আমার মনে পড়লো। আমার ভাইটিও অবাক তাকিয়ে লোকটিকে দেখছে ! আমি বললাম, আপনি জানেন, আপনি দেখতে মহাত্বা গান্ধীর মতো? তিনি হাসলেন। বললেন- সত্যিই! তাই নাকি? আমি গান্ধীকে নিয়ে অনেক বই পড়েছি। আমি মহাত্বা গান্ধী নই তবে তাঁর আদর্শ অনুকরন করার চেষ্টা করি। কথাগুলো বলে আবারও হাসলেন।

আমি ইচ্ছে করেই কথা চালিয়ে যেতে লাগলাম। যতই লোকটির কথা শোনছি ততই অবাক হচ্ছি ! অবাক হচ্ছি এ কারণে যে, যখন শুনলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি থাকা লোকটি এক সময় জীবনের মানে খুঁজতে গিয়ে মানুষ হবার মানে খুঁজতে খুঁজতেই আজ এখানে। বললেন- জীবন তো একটাই। যেকোন ভাবেই কাটানো যায়। তবে, মানুষ হওয়াটাই বেশী জরুরী। আমার ছাদ বিহীন খোলা আকাশ, মানুষের সংস্পর্শ, চাওয়া পাওয়া হীন সাদাসিধে জীবন ই আমাকে মানুষ হতে সাহায্য করছে।

আমি একাই কথা বলছি দেখে আমার ভাইকে ইশারা করে বললেন, সে কথা বলছেনা কেন? আমি বললাম, সে এদেশে নতুন। এসেছে কেবল মাস খানিক হলো । তিনি আমার ভাইয়ের দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন। হ্যান্ডশেক করলেন। ভাষা শিখার জন্য অনুপ্রাণিত করলেন। নিজের অনেকগুলো বইয়ের ষ্টক থেকে একটি বই আমার ভাইকে দিয়ে বললেন, ‘এটা আপনার জন্য আমার পক্ষ থেকে ছোট্ট উপহার’। আমি লোকটির দিকে অবাক তাকিয়ে রইলাম। মনুষ্যত্বহীন চাকচিক্যময় জীবনকে প্রত্যাখ্যান করে মানুষ হওয়ার ব্রত নিয়ে খোলা আকাশের নীচে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া মানুষটিকে বিদায় জানিয়ে চলে আসলাম।

এ ছবির লোকটি ম্যাকডোনাল্ডস এর প্রবেশ পথে বসে থাকে প্রতিদিন। হাত পেতে সে মানুষের কাছে কখনও কোন কিছু চাইবেনা। যা চাওয়ার সে তার সামনেই লিখে রেখেছে। পাঁচটি কাপ রাখা আছে তার সামনে। একেকটি কাপে একেক ধরণের লিখা রয়েছে। আপনি তাকে কেন সাহায্য করতে চান অথবা সে আপনার কাছে কি ধরণের সাহায্য চায়, সবই লিখা রয়েছে কাপগুলোর গায়ে। প্রথম কাপটিতে লিখা, তাকে বিয়ার খাওয়ার জন্য সাহায্যের কথা। দ্বিতীয়টি উইকেন্ডে মাস্তি করার জন্য, তৃতীয়টি  নেশা দ্রব্য কেনার জন্য । চতুর্থটি সাধারন খাবারের জন্য এবং পঞ্চমটি ডিজনি ল্যান্ডে যাওয়ার জন্য।

এখন আপনি তাকে কোন সাহায্যটি করবেন সেটা একান্তই আপনার ইচ্ছে। আমি লোকটির কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। দেখলাম, প্রতিটি কাপেই কিছু না কিছু কয়েন আছে। সবচেয়ে বেশী কয়েন বিয়ারের কাপে। তার মানে সবাই কম বেশী তাকে তার স্বপ্ন ও ইচ্ছে পূরণের জন্য সাহায্য করছে। আমি তার খাবারের যে কাপ সেখানে ১ ইউরোর একটা কয়েন ফেলে বললাম, কেমন আছো? সে জানালো বেশ ভাল আছে।

বেশ ভালটা আসলে কেমন ভাল জানতে চাইলাম। সে জানালো, যেমনটি সে চায় ঠিক তেমনই আছে। বললাম, তুমিতো ইয়াং, গায়ে এনার্জি রয়েছে, কাজ কর্ম করে জীবনটাকে অন্যভাবেও তো সাজাতে পারো? সে জানালো, মানুষের অধিকার, স্বপ্ন, আকাঙ্খা, ইচ্ছে ও ভালো লাগাকে পদদলিত করে নিজের জীবন সাজানোর মাঝে কোন সার্থকতা নেই দেখেই এ জীবন বেঁচে নেয়া। তার কথাগুলো শোনে আমি বিস্মিত হলাম। সে আমার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। স্পষ্টত এটা কোন সুখের হাসি নয়, বড়ই রহস্য ভরা সে হাসি।

  • এখলাছ মিয়া, বার্সেলোনা, স্পেন 

আরও পড়ুন- কানাডার ফুলের ঘড়ি

প্রবাসীদের সব খবর জানতে; প্রবাস কথার ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.