Featured ভ্রমণ

সিলং চায়ের দেশ শ্রীলংকা ভ্রমণ

শেয়ার করুন

গত সপ্তাহে আমরা বেড়াতে গিয়েছিলাম ট্যূরিজমে দক্ষিন এশিয়ার বিখ্যাত দেশ শ্রীলংকাতে। রাবণের দেশ শ্রীলংকা নিয়ে ছোট বেলা থেকেই আমার একটা ফ্যান্টসী ছিল। আসলে ফ্যান্টাসীর থেকে বেশি ছিলো কৌতূহল।

এবছরের শুরুতেই তাই প্ল্যান করেছিলাম শ্রীলংকা ভ্রমণের। শ্রীলংকা দেশটি দারুণভাবে আমাকে মুগ্ধ করেছে। প্লেন থেকে নেমেই যে পরিমাণ সবুজ দেখেছি তাতে মনটা জুড়িয়ে গেছে। এত গাছগাছালি, এত সবুজ, চোখের শান্তি আর দেহের খোরাক অক্সিজেন এর ভাণ্ডার!

আমরা শ্রীলংকা ছিলাম সর্বমোট নয় দিন। আসা-যাওয়ার দিন বাদ দিয়ে বেড়ানো, ঘুরাঘুরির জন্যে হাতে পেলাম সাত দিন। ঘোরাঘুরির খুঁটিনাটি প্লানগুলি আমিই সচারাচর করি। ইন্টারনেট এ অনেক রিসার্চের পর মনে হলো, কলম্বো শহরে কেনাকাটা ছাড়া দেখার বিশেষ কিছু নেই।

তাই ঠিক করলাম চায়ের দেশ শ্রীলংকার ‘নুওয়ারা এলিয়া’ শহর এবং এর আশেপাশের অঞ্চলটা ঘুরবো। ইন্টারনেট ঘেটে শহরটাকে খুব ছোট্ট, সুন্দর আর ছিমাছাম মনে হল। চা-বাগানের জন্যে বিখ্যাত পাহাড়ী এই শহরে পৃথিবীর অনেক নামী দামী কোম্পানির চা উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাত হয়।

কলম্বো এয়ারপোর্ট থেকে গাড়ি নিয়ে রওনা দিলাম ণুওয়ারা এলিয়ার উদ্দেশ্যে।এয়ারপোর্টের রাস্তা ছেড়ে আমরা যখন মেইন রোডে উঠলাম হঠাৎ করে মনে হল আমরা বাংলাদেশে চলে এসেছি। রাস্তা-ঘাট, বাড়িঘর, মানুষজনের এর চেহারা, গাছগাছালি সব মিলিয়ে দেশের সাথে অনেক সাদৃশ্য পেলাম।

কিছুক্ষন পর ড্রাইভার জ্যাম এড়ানোর জন্য মেইন রোড ছেড়ে আমাদের গাড়ি একটা গ্রামের রাস্তায় তুললো। সাপের মত এঁকেবেকে চলা সেই রাস্তা কিছুদূর গিয়েই পাহাড়ী এলাকায় ঊঠলো। কখনো ভয়, কখনো উত্তেজনা, কখনো আবার শুধুমাত্র গভীর ভাললাগা নিয়ে গাড়ির জানালা দিয়ে আমি বাইরের অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্য দেখছিলাম।

যতদূর চোখ যায় শুধু সবুজ আর সবুজ। দেখে মনে হয় কেউ যেন সবুজের গালিচা বিছিয়ে রেখেছে। পাহাড়গুলোর মাথায় পেজা তুলার মত মেঘ আসা যাওয়া করছে। দূরে পাহাড়ের গা ঘেষে নেমে এসেছে পাহাড়ী ঝর্ণা। সব কিছু কেমন যেন স্বপ্ন স্বপ্ন মনে হচ্ছিল। প্রায় পাঁচ ঘন্টা এই আঁকাবাকা পাহাড়ী এই রাস্তায় চলার পর আমরা নুওয়ারা এলিয়া শহরে পৌছলাম।

আমরা পাঁচ দিনের জন্যে চা-বাগান এর মধ্যে একটা বাংলো ভাড়া নিয়েছিলাম।কাছাকাছি যাওয়ার পর আমাদের ড্রাইভার বলল যে, বাকি পথটুকু আমাদের গাড়ি যেতে পারবে না। কারণ, রাস্তা সরু এবং উঁচুনিচু। তবে অবাক হলাম এই দেখে যে, বাংলোর কেয়ারটেকার আমাদেরকে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটা টুকটুক নিয়ে অপেক্ষা করছে। আমাদের দেশের সিএনজি/ইজিবাইককে লোকাল ভাষায় ওরা টুকটুক বলে।

রাস্তা দিয়ে ঊঠার পথেই আমি পাহাড়ের একদম ঊঁচুতে আমাদের বাংলোটাকে এক ঝলক দেখলাম। ঠিক যেমটি ভেবেছিলাম- চা-বাগানের মাঝে ছোট্ট একটা মডার্ন বাংলো-টাইপ বাসা। আসে পাশে চা-গাছের ঝোপ ছাড়া আর কিছুই নেই। হঠাৎ করে ছোট বেলায় দেখা একটা হিন্দি সিনেমার কথা মনে পড়ে গেল।সিনেমার গল্পটা মনে নেই, কিন্তু বাড়ীটা অনেকটা এই বাংলোর মত ছিল। মনে মনে খুব খুশি হলাম।

টুকটুক থেকে নামার পর কেয়ারটেকার ভিজে (বাংলায় বোধহয় তাকে আমরা বলতাম বিজয়) আমাদেরকে বাড়ীটার একটা ছোট্ট ট্যুর দিল। বাড়ির প্রতিটা আনাচে কানাচে খুব যত্ন আর পরিশ্রমের ছাপ স্পষ্ট।পাহাড়ী এলাকার বৃষ্টি উপভোগ করার জন্যে বাড়িটার সামনের অংশে প্রচুর গ্লাস ব্যাবহার করা হয়েছে। চার বেডরুমের বিশাল বাড়ির প্রায় প্রতিটা রুম এর সাথে একটা করে বারান্দা যেটা দিয়ে চমৎকার চা বাগানের দৃশ্য দেখা যায়। বাড়ির চারপাশে নানারকম ফল আর ফুলের গাছ।

সবকিছু গুছিয়ে নিতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। খাওয়া দাওয়া করে একটা ঘুম দিলাম। ঘুম ভাঙ্গলো একবারে ভোরের পাখির ডাক শুনে। আমি হাটতে হাটতে বাড়ির লনে গেলাম। আম, কাঠাল, পেয়ারা, আভকাডো, বাতাবি লেবু, নারিকেল সব দেশি ফলের গাছ চোখে পড়ল। শুধু ফল না, বেলী, চামেলী, কৃষ্ণচূড়া, কাঠালী চাপা, রঙ্গন, জবা, হাইড্রেঞ্জা ফুলের গাছ আমাকে সত্যি অনেক মুগ্ধ করল।

প্রায় আধা ঘন্টা ধরে সবুজ ঘাসের উপর খালি পায়ে হাঁটলাম।সারারাত বৃষ্টি হওয়ার কারণে মাটি থেকে একটা সোঁদা গন্ধ আসছিল। মনটা উদাস হয়ে গেল। আহা, এই মাটি থেকেই আমরা এসেছি আর এই মাটিতেই একদিন মিশে যাবো! জীবন কত ক্ষণস্থায়ী, প্রকৃতির সোন্দর্যের সামনে আমরা কত তুচ্ছ!

আমাদের শ্রীলংকা ট্রীপের একটা বড় অংশ জুড়ে ছিলো বৃষ্টি। একটানা সকাল-দুপুর-বিকেল-রাত ধরে এক্কেবারে ঝুম বৃষ্টি। তবে জুন-জুলাই মাসে এই অঞ্চলে নাকি এটাই স্বাভাবিক চিত্র। কর্কটক্রান্তীয় এলাকায় অবস্থানের জন্য শ্রীলংকা এলাকায় বৃষ্টি-রোদ দুটোই প্রচুর। বেড়াতে গিয়ে বৃষ্টিতে হয়তো বেশির ভাগ মানুষই বিরক্ত হবে।

কিন্তু আমাদের কেন জানি একদমই খারাপ লাগেনি। বরং আমরা বৃষ্টিকে বেশ উপভোগই করেছি। এর একটা অন্যতম কারণ গত চার বছর ধরে মরূভূমির দেশ কাতারে থাকার ফলে আমাদের জীবনে বৃষ্টির অনুপস্থিতি। তাই পাঁচদিন বৃষ্টি মাথায় নিয়েই আমরা টো টো করে ঘুরেছি।

 

নুওয়ারা এলিয়া শহরটাতে দেখার মধ্যে অন্যতম আকর্ষন হল চা বাগান। যদিও আমি চা খুব একটা পছন্দ করি না, কিন্তু চা এর দেশে বেড়াতে এসে চা বাগান আর চা ফ্যাক্টরীর একটা ট্যূর ফরজ হয়ে যায়। আমরা পাঁচদিনে সর্বমোট তিনটা চা বাগান আর ফ্যাক্টরী ঘুরেছি। চা বাগানগুলো দেখতে প্রায় একই রকম হলেও বাগানগুলোর মধ্যে কিছু রকমভেদ আছে।

কিছু চা-বাগান ব্যক্তি মালিকানায় আর কিছু পরিচালিত হয় সরকারী তত্বাবধানে। ব্যক্তি মালিকানার বাগানগুলির চা বেশিরভাগ সময় শ্রীলংকার লোকাল মার্কেটে বিক্রী হয় আর সরকারীগুলির চা নিলাম হয় প্রথমে কলম্বোর নিলাম মার্কেটে, সেখান থেকে লিপ্টন, ডিলোমাসহ বড় বড় কম্পানীগুলির হাতে পৌঁছে যায়। এসব কোম্পানী চাউএর যাবতীয় মার্কেটিং করে থাকে।

আমরা যে তিনটি চা বাগান আর ফ্যাক্টরীতে ঘুরেছি সেগুলি হল পেড্রো টি এস্টেট, ব্লূফিল্ড টি এস্টেট আর গ্লীনলচ টি এস্টেট। দেখে যেটা মনে হল, ছোট-বড় প্রায় প্রতিটা চা বাগানই সুন্দরভাবে সাজানো গোছানো। তবে এদের মধ্যে পেড্রো চা বাগানের চা শ্রীলংকার রপ্নানী করা চা গুলোর মধ্যে সবথেকে নাম করা, আন্তর্জাতিক বাজারে যা সিলন টি নামে পরিচিত। ১৮৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই চা বাগানের ইতিহাস, নান্দনিকতা আর চা এর স্বাদ সত্যিই প্রশংসনীয়।

প্রতিটি চা বাগানের সাথে ফ্যক্টরী আর একটা চা এর রেস্তোরাঁ থাকে। ট্যুর গাইডের মাধ্যমে প্রথমে বাগানে গিয়ে চা তোলার প্রক্রিয়া দেখে, সেই চা ফ্যাক্টরীতে প্রক্রিয়াজাতকরন দেখে এবং সবশেষে রেস্তোরাঁ এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা খেয়ে শেষ হতো একেকটা ট্যুর। প্রতিটি ফ্যাক্টরীর সাথে আছে সুন্দর সুন্দর চা এর শোরুম।

সেখান থেকে স্যুভেনির হিসেবে প্রিয়জনের জন্যে নানা প্রকার চা এর প্যাকেট কেনার সুযোগ আছে। ভাবতেই অবাক লাগে বাগান থেকে ফ্যাক্টরি আর মার্কেট ঘুরে এককাপ চা আমাদের ডাইনীং টেবিলে আসার পিছনে কত মানুষের অক্লান্ত পরিশ্রম লুকিয়ে আছে।

আমাদের গাইড বলল যে, একেকজন চা বাগান কর্মী প্রতিদন গড়ে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ কেজি চা পাতা তোলে আর সেটাকে প্রক্রিয়া করে শেষ পর্যন্ত ১ থেকে ২ কেজি চা পাওয়া যায়। চা এর কোয়ালিটির মাপকাঠিতে সব থেকে বেশি দামী চা হল গোল্ডেন টি। একদম কচি কচি পাতাকে প্রক্রিয়া করে স্বর্নালী এই চা পাওয়া যায় দেখে এর নামকরন গোল্ডেন টি। এরপর আছে সিলভার টি , বিওপী, ব্লাক টি, পিকয়ী টি, গ্রীন টি, ইত্যাদি।

চা ভালোবাসি আর নাই বাসি চা এর দেশে বেড়াতে এসে এক কাপ আয়েশ করে না খেলে পুরা ট্রীপটাই অপূর্ণ রয়ে যায়। তাই ঠিক করলাম ণূওয়ারাএলিয়া শহরের সব থেকে সুন্দর চা এর রেস্তোরায় চা খাবো। যেমন ভাবা তেমন কাজ। রওনা হলাম গ্র্যান্ড হোটেল এর উদ্দেশ্যে। ব্রিটিশ শাসনামলে আজকের এই হোটেলটি ছিলো গভর্নরের সামার বাসভবন। কলোনিয়াল শাসনকাল ইতি ঘটার পর এই সুন্দর সাজানো গোছানো আভিজাত্যপূর্ণ বাসাটাকে একটা ফোরস্টার রেস্টুরেন্ট বানিয়ে ফেলা হয়।

এই রেস্টুরেন্টের ‘হাই টি’ নুওয়ারাএলিয়া শহরের অন্যতম আকর্ষন। বিকেল বেলায় গ্রান্ড হোটেল এর লনে বসে এক কাপ চা আর কিছু নাশতা যেন মুহুর্তের মধ্যে আমাদের নিয়ে ফিরিয়ে নিয়ে গেল দুইশত বছরের পুরাতন সেই কলনিয়াল সময়ে। পুরনো সব ছবি আর ইতিহাস দেয়ালে লিখে বিল্ডিংটাকে এত সুন্দর করে ওরা সাজিয়ে রেখেছে যে, দেখতে অনেকটা মিউজিয়াম এর মত লাগে। হোটেলের লনটা আসলেই অনেক সাজানো গোছানো।

হোটেলের গার্ডেনে বসে চা এর কাপে চুমুক দিতে দিতে দেখলাম পেজা তুলার মত মেঘ হোটেলের ছাদে এসে হাতছানি দিয়ে ক্ষণিকের জন্যে আমাদেরকে মনে করিয়ে দিলো, যে আমরা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২০০০ মিটার উঁচুতে আছি। কিছুক্ষন আগেই ঝুম বৃষ্টি হয়ে আকাশটা পরিস্কার হয়েছে। বাতাসে সবুজ ঘাসের গন্ধ এখনো ভেসে বেড়াচ্ছে। চা এর কাপে চুমুক দিতে দিতে মনে মনে ভাবলাম এমন সুন্দর এই বিকেলটা যদি শেষ না হত!

চা বাগান আর চা খাওয়া ছাড়াও ণূওয়ারাএলিয়া শহরে আমরা পাঁচদিনে জলপ্রপাত, বোটানিক্যাল গার্ডেন, পশুপাখির ন্যাচারাল হ্যাবিটাট ফার্ম এর মত অনেক মজার মজার জায়গায় ঘুরেছি। ঝুম বৃষ্টি, বজ্রপাত, ঈষৎ বন্যা কোন কিছুই আমাদেরকে ঘরে আটকে রাখতে পারেনি। দেখতে দেখতে আমাদের পাঁচ দিন নুওয়ারাএলিয়া ট্রিপ শেষ হয়ে এল। নুওয়ারাএলিয়া শহরের স্বর্নালী চা এর মত এই শহরের স্বর্নালী স্মৃতি মনে থাকবে আজীবন।

অতপর পাহাড়ী জীবন ছেড়ে এরপর আমরা রওনা দিলাম শহুরে জীবনের উদ্দেশ্যে। ক্যান্ডি শহর আমাদের পরবর্তী গন্তব্য। ক্যান্ডিকে বলা হয় শ্রীলংকার সাংস্কৃতিক রাজধানী।এই শহরের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে আছে ইতিহাস, ঐতিহ্য আর ইন্টারেস্টিং সব গল্প। তবে এই শহরের জন্যে আমাদের সময় মাত্র দুই দিন।আমরা ঠিক করলাম দুই দিনে সব থেকে জনপ্রিয় দুইটা ট্যূরিস্ট স্পটে যাবো।

প্রথম দিন সকাল সকাল রওনা দিলাম পিনাওয়ালা এলিফ্যান্ট অরফ্যানেজ দেখতে। এই গ্রাম হাতির জন্যে খুব বিখ্যাত। অনেক দূরদূরান্ত থেকে পর্যটক আসে এইখানে হাতি দেখতে, হাতির সাথে একটু সময় কাটাতে। আমাদের ছোট্ট আফরিন বুড়ী সারাদিন তার ছড়ার বইয়ে হাতি দেখে এলিফ্যান্ট এলিফ্যান্ট করে। তাই ঠিক করলাম আজকে ওকে হাতির পিঠে উঠাবো।

কিন্তু আফরিনের বাস্তব হাতি দেখার অভিজ্ঞতা একদম অপ্রত্যাশিত ছিল। যেই না আফরিন হাতির পিঠে উঠেছে সে কি চিৎকার আমার মেয়ের! ওর চিৎকারে হাতি বেচারাও ভয় পাওয়ার উপক্রম হল।অতপর গাইড ওকে নামিয়ে নিলো। কি আর করা। উপায় না দেখে তাই আমরা টূনাটুনি মিলেই হাতি ভ্রমণ করলাম।

 

পিনাওয়ালা গ্রামে প্রায় দুই’শ হাতিকে ওরা লালন পালন করছে। দুপুর দুইটার সময় এক সাথে প্রায় সব গুলো হাতিকে নদীর পানিতে গোসল করায়। এতগুলো হাতিকে একসাথে দেখার অভিজ্ঞতা এই প্রথম আমার। একে একে হাতিগুলো লাইন দিয়ে গোসল করার জন্যে নদীতে নামে। সত্যি দেখার মত দৃশ্য! সব কিছু মিলিয়ে দিনটা খুব চমৎকার কাটল আমাদের।

ক্যান্ডির দ্বিতীয় দিনটি আমরা ঠিক করলাম ‘ট্যুথ ট্যম্পেল’ দেখতে যাবো। ট্যুথ ট্যম্পেলক বলা হয় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের জন্যে একটা অন্যতম পবিত্র স্থান। বলা হয়ে থাকে এই মন্দিরের কোন এক জায়গায় স্বর্ণের সিন্দুকের মধ্যে গৌতম বুদ্ধের ‘দাত’ রাখা আছে। তাই এর নামকরন ‘ট্যূথ টেম্পল’। রবিবার হওয়ার জন্য ওইদিন কিছু প্রার্থনা দেখার ও সুযোগ হলো।

মন্দিরের প্রাঙ্গনে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা দেখছিলাম আর ভাবছিলাম ধর্ম মানুষের জীবনটাকে কত সুন্দর করে বেঁধে রেখেছে। কত মানুষের কত চাওয়া, কত মনবাসনা গৌতম বুদ্ধ এখানে বসে শুনছেন, যুগের পর যুগ ধরে।

ক্যান্ডি শহরের একদম মধ্যেখানে অনেকটা জায়গা নিয়ে এই মন্দির আর পাশ দিয়ে বয়ে গেছে স্বচ্ছ পানির লেক। পায়ে হেঁটে অনেকদূর ঘুরলাম। ক্যান্ডি শহরটা আমার কাছে আমাদের দেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের মত লাগলো অনেকটা। এই শহরেও গাছ পালা আর পশুপাখির অনেক সমারহ দেখলাম। এভাবে মন্দিরে ঘুরে আর আর আশে পাশে একটু টুকটাক শপিং করে শ্রীলংকা ট্যূর এর শেষ দিনটি আমরা পার করলাম।

শ্রীলংকা দেশটা নিয়ে আমার কিছু উপলব্ধি না শেয়ার করলেই নয়। মাত্র এক সপ্তাহে দেশটা আমাদেরকে অনেক আপণ করে নিয়েছিল। আসার দিন তাই মনটা কেমন জানি ভারী ভারী লাগছিল। শুধু মনে হচ্ছিলো আরো কয়টা দিন থাকলে বোধ হয় ভালো হত।

ক্যান্ডিতে আমরা যেই বাসায় উঠেছিলাম সেই বাসার গৃহিনীর হাতে বানানো ব্রেকফাস্ট করলাম সকালে। ভদ্রমহিলার চমৎকার প্রেজেন্টেশন আর শ্রীলংকান আতিথেয়তায় আমরা অনেক মুগ্ধ হলাম। এয়ারপোর্টে যাওয়ার পথে রাস্তায় গাড়ি দাড় করিয়ে আমরা ডাবের পানি আর ডাবের শাস খেলাম।ইস এত মিষ্টি! প্রানটা জূড়িয়ে গেল।

শ্রীলংকার মানুষ, ওদের আতিথেয়তা, প্রাকৃতিক সৈন্দর্য, ইতিহাস, সংস্কৃতি সব কিছুই আমাকে ভীষণভাবে আপ্লুত করেছে। খুব অবাক হয়েছি দেখে যে, অল্প কিছুদিন আগেই সন্ত্রসীদের বোমা হামলায়  কতগুলো নিরীহ মানুষ হত্যার মত এত বড় একটা দুর্ঘটনার পরেও মুসলিম পর্যটক হিসেবে দেশটিতে আমাদেরকে নূন্যতম কোন রেসিস্ট অভিজ্ঞতার মধ্যে পড়তে হয় নি।

এর অনেকটা কৃতিত্ব অবশ্যই শ্রীলংকার সাধারন মানুষের প্রাপ্য। জানি না আবার কবে ফিরে আসবো, কিন্তু সিলন চা এর দেশ শ্রীলংকার সুন্দর স্মৃতি আমাদের মনে গেঁথে থাকবে আজীবন।

  • সুমাইয়া মাহমুদ, ক্যালিফোর্নিয়া, যুক্তরাষ্ট্র 

আরও পড়ুন- স্পেনের বৈচিত্রময় জীবনের গল্প

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.