Featured অস্ট্রেলিয়া ওশেনিয়া

সিডনির জ্যাকারান্ডা ফেস্টিভ্যাল

শেয়ার করুন

আমি সপরিবারে সিডনি বেড়াতে আসি ২০০০ সালের নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে, তখন সিডনিতে বসন্তের শেষ মাস। আমি বেড়াতে আসার মাত্র এক মাস আগেই সিডনিতে অনুষ্ঠিত হয় অলিম্পিক গেমস, তাই গোটা সিডনি শহর তখন ছবির মতন ঝকঝকে। এরই মধ্যে সবুজ গাছগাছালির ফাঁকে ফাঁকে একটি অপূর্ব গাছ দেখে আমাদের বিস্ময়ের অন্ত থাকে না!

গাছ ভর্তি বেগুনি রংয়ের ছোট ছোট কৃষ্ণচূড়া ফুলের মতোই ফুটে থাকা অজস্র ফুল, আর টিপটিপ করে ক্রমাগত এই বেগুনি ফুলগুলো ঝরে পড়ছে গাছের গোড়ায়। অবাক করা এই ফুলের নাম হচ্ছে জ্যাকারান্ডা।

অস্ট্রেলিয়াতে প্রচুর জ্যাকারান্ডা গাছের সমারোহ দেখা গেলেও মূলত এটি অস্ট্রেলিয়ার কোনো নেটিভ গাছ না। ট্রপিক্যাল ও সাব ট্রপিক্যাল অঞ্চলের এই গাছটি প্রচুর পরিমাণে দেখা যায় সাউথ আফ্রিকা, ক্যারিবিয়ান ও ল্যাটিন আমেরিকা অঞ্চলে। তবে জানা যায় এশিয়ার অনেক অঞ্চলেই জ্যাকারান্ডা গাছ রোপণ করা হলেও সবচেয়ে বেশি পরিমাণে পরিলক্ষিত হয় আমাদের দক্ষিণ এশিয়ার নেপালে।

জ্যাকারান্ডা ফেস্টিভ্যালে লেখক

ধারণা করা হয়, ১৮৫০ সালে জ্যাকারান্ডা গাছের চারা প্রথম অস্ট্রেলিয়াতে প্রবেশ করলেও ১৮৬০ সালে ব্রীজবেন বোটানিক গার্ডেনের সুপারেনটেনডেন্ট ওয়াল্টার হিল প্রথম সাফল্যজনকভাবে এই গাছটির উৎপাদন ঘটান। সঠিক পরিচর্যা সাপেক্ষে ঘন বেগুনি রংয়ের ঝাপরানো একটি জ্যাকারান্ডা গাছের আয়ু প্রায় ২০০ বছর।

পৌরাণিক গাঁথা অনুযায়ী জ্যাকারান্ডা হচ্ছে জ্ঞান, পুনর্জন্ম, সম্পদ ও সৌভাগ্যের প্রতীক। সে অনুযায়ী জ্যাকারান্ডা ফুল যদি আপনার গায়ে ঝরে পড়ে, তবে নিশ্চিতভাবেই আপনার সৌভাগ্যের দুয়ার খুলে যাবে!

আমি ২০০৭ সালে থেকে স্থায়ীভাবে সিডনিতে বসবাস শুরু করার পর থেকেই দেখে আসছি। এই জ্যাকারান্ডা গাছটিতে মন মাতানো গাড় বেগুনি রংয়ের আগুন ঝরানো ফুলগুলো ফোটা শুরু হয় প্রতিবছর নভেম্বরের শুরু থেকেই। হুবহু কৃষ্ণচূড়া গাছের মতো দেখতে এই জাকারান্ডা গাছ আসলেই কৃষ্ণচুরা গোত্রভুক্ত কিনা তা শুধু উদ্ভিদবিদরাই ভালো বলতে পারেন। তাই সারা বছর এই জ্যাকারান্ডা গাছগুলো রাস্তার পাশে অন্যান্য সবুজ গাছের সাথে মিশে থাকার কারণে মেঘে ঢাকা তারার মত বোঝাই যায়না এই গাছের অস্তিত্ব।

বসন্তের বেগুনি জ্যাকারান্ডা ফুল

শুধু নভেম্বর মাসে বসন্তের শেষ লগ্নে যখন অন্যান্য গাছের চাকচিক্য ম্লান হয়ে আসে, তখন হঠাৎ করেই মেঘ সরে যাওয়া উজ্জ্বল সূর্যের মত জ্যাকারান্ডার ফুলগুলো বেগুনি আগুনের এক অদ্ভুত আলোর ছটা ছড়িয়ে দেয় গোটা সিডনিতে। কারণ, সিডনির এমন কোনো রাস্তা নাই যেখানে গাছের মাঝে মাঝে অথবা কোনো বাড়ির আঙিনায় এই জ্যাকারান্ডা গাছের দেখা না মিলবে!

গতকাল শনিবার বিকেলে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দূরে দক্ষিণ-পশ্চিম সিডনির ক্যামডেন কাউন্সিলের ক্যামডেন সিবিডি (Central Business District) অর্থাৎ মূল বাণিজ্যিক এলাকায় সস্ত্রীক চলে আসি ‘ক্যামডেন জ্যাকারান্ডা ফেস্টিভ্যাল’ দেখতে। ক্যামডেন সিবিডি এর ঠিক মাঝখান দিয়ে সামান্য আড়াআড়ি পূর্ব-পশ্চিম বরাবর আর্কগাইল স্ট্রীটের প্রায় ৭০০ মিটার রাস্তা জুড়ে ক্যামডেন কাউন্সিল আয়োজন করেছে এক বিশাল মেলার।

গাছে গাছে ফুটেছে বসন্তের মন মাতানো জ্যাকারান্ডা ফুল

ফেস্টিভ্যালে শিশু-কিশোর যুবক-যুবতী নির্বিশেষে সব বয়সী নারী পুরুষে গোটা মেলা লোকে লোকারণ্য। বিশেষ করে বাচ্চাদের বিভিন্ন মন মাতানো ইভেন্ট আয়োজনে আমার মনে হচ্ছিল এটা যেন আমাদের ছোটবেলার দেখা ঢাকার নয়াটোলায় শাহ্ সাহেব বাড়ির ওরশের মেলার মতই।

বসন্তের শেষ বিকেলে জ্যাকারান্ডা একটা উপলক্ষ হলেও এই মেলার উদ্দেশ্য হচ্ছে স্থানীয় লোকজনের জন্য একটি আনন্দ উৎসবের আয়োজন করা। এই রাস্তার ঠিক মাঝ বরাবর উত্তর দিকের জন স্ট্রিটে বিশাল এক স্টেজ তৈরি করে সেখানে শুরু হয়েছে জনপ্রিয় শিল্পীদের মন মাতানো গানের আসর।

শেষ বিকেলের আলোতে জমজমাট মেলার ভিতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে লক্ষ্য করলাম, মেলার এই অংশের আর্কগাইল স্ট্রিটের মাঝ বরাবর শুধুমাত্র জ্যাকারান্ডা গাছের সারি। সম্ভবত এই কারণেই এই আনন্দ মেলার নামকরণ হয়েছে জ্যাকারান্ডা ফেস্টিভাল। সন্ধ্যার পরপরই এখানে অনুষ্ঠিত হবে ফায়ার ওয়ার্ক। কিন্তু সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা না করেই আমরা দুজন চলে আসি ঘরে রেখে আসা এই নভেম্বরে আমাদের ঘর আলো করে জন্ম নেয়া ‘জ্যাকারান্ডা বয়’ অর্থাৎ নানা ভাইয়ের টানে!

  • মহিউদ্দিন কিবরিয়া, সিডনি, অস্ট্রেলিয়া

আরও পড়ুন- উদ্যোমী এক বাংলাদেশি ইঞ্জিনিয়ারের প্রবাস জীবন, পর্ব- ০২

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.