Featured এশিয়া সিঙ্গাপুর

সিঙ্গাপুরে সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চায় অনন্য বাংলাদেশি কর্মীরা!

শেয়ার করুন

এই নিয়ে পরপর তিনবার আমি সিঙ্গাপুর মাইগ্রান্ট ওয়ার্কার পোয়েট্রি কম্পিটিশনের প্রাথমিক বাছাই পর্বে মনোনীত হলাম। প্রথমবার যখন আমি কবিতা আবৃত্তি করার জন্য মঞ্চে উঠি, তখন দেখতে পাই দর্শকসারিতে শুধুমাত্র চার-পাঁচজন আমার কবিবন্ধু বাংলাদেশি দর্শক, বাকি সবাই বিদেশি।

অথচ আমার সাথে আরো দুইজন বাংলাদেশি প্রতিযোগীও ছিল সেখানে। কিন্তু বাংলাদেশী দর্শকদের উপস্থিতি একদম নেই বললেই চলে। অন্যান্য দেশের কবি যারা কবিতা আবৃতি করতে এসেছিল, তাদের সবার দেশের সাপোর্টাররা এসেছিল তাদের উৎসাহ দিতে। যদিও সিঙ্গাপুরে বাঙালিদের সংখ্যা নেহায়েত কম নয় কিন্তু তারা সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার ব্যাপারে উদাসীন।

উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাঙালি এখানে পরিবার নিয়ে বসবাস করে। তারা এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা অথবা নাগরিকত্ব পেয়েছেন কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা বাঙালি শ্রমিকদের কোন প্রকার আয়োজনে সামিল হন না বা হতে দ্বিধা বোধ করেন। তবে কিছু ব্যাতিক্রমও আছে।

যারা আসেন না বা দ্বিধা করেন। আমি তাদেরকে ‘এলিট’ বলে সম্মোধন করি। এলিট সোসাইটির মেম্বাররা নিজেদের মধ্যে আবার মাঝেমধ্যে কিছু কিছু অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকেন বাংলাদেশের উৎসবকে কেন্দ্র করে। সেখানে গুটিকয়েক শ্রমিক অংশগ্রহণ করে তবে উল্লেখযোগ্য নয়।

সিঙ্গাপুরে বেড়াতে এসে আপনি যদি এখানকার কোন কবি সাহিত্যিক সাংবাদিক বা সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করে এমন কাউকে জিজ্ঞেস করেন যে, সংস্কৃতি সাহিত্য নিয়ে কাজ করে কোন বাঙালির নাম বলতে তাহলে তারা কোন না কোন শ্রমিকের নাম বলবে। আমি হলফ করে বলতে পারি এখানে কোন এলিট সোসাইটির কারো নাম আসবেনা! সিঙ্গাপুরিয়ানরা যেভাবে আমাদের সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চাকে মূল্যায়ন করেছে তার জন্য তাদের কাছে কৃতজ্ঞ না হয়ে উপায় নেই।

শত প্রতিকূলতার মাঝেও এখানে শ্রমিকশ্রেণী যে অবস্থান তৈরি করেছে তা সত্যিই অভাবনীয় আর সাহিত্য সংস্কৃতির দিক দিয়ে বিচার করলে এখানে শ্রমিকরাই মূলধারা!

আমার উপরের লেখাটি পড়ে হয়তো এখন অনেকেই হতাশ হয়েছেন কেন আমাদের মধ্যে এত বিভেদ বিভাজন?

আসুন আপনাদের সাথে এবার একটু আশার কথা বলি। গত বছর পোয়েট্রি কম্পিটিশনে আমি শরিফ ভাই এবং সজীব ভাই প্রাথমিক পর্বে নির্বাচিত হই। আমি মঞ্চে উঠে এবারও সেই একই চিত্র, আমার গুটিকয়েক বাংলাদেশি কবিবন্ধু অনেকটা হতাশ।

কিন্তু না এবার একটা বাংলাদেশি পরিবার দেখতে পেলাম। আমি খুশি হলাম অন্তত একটি পরিবারের উপস্থিতি দেখতে পেয়ে এর আগেও ওয়ার্কারদের আয়োজিত অনুষ্ঠানে এই পরিবারকে দেখা গেছে। সিঙ্গাপুরে একটিমাত্র বাংলাদেশি পরিবার আছে যারা নিয়মিত শ্রমিকদের আয়োজিত বা অংশগ্রহণকৃত অনুষ্ঠান নিয়মিত দেখতে আসেন।

এবার আসুন আপনাদের সাথে সেই পরিবারটির পরিচয় করিয়ে দেই। পরিবারের কর্তা হচ্ছেন আমাদের সবার প্রিয় নাজমুল ভাই, রুশি ভাবি এবং তাদের সন্তান সারিনা। ঈদে পার্বণ ছাড়াও মাঝেমধ্যেই আমরা যারা সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করি, তারা যেকোনো সময় নাজমুল ভাইয়ের বিনা দাওয়াতে বাসায় হানা দেই।

নাজমুল ভাই আমাদের বিভিন্ন ইভেন্টে পরামর্শ দিয়ে অনেক সহযোগিতা করেছেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে তাকে অনেক ইভেন্টের আয়োজনে সমস্যায় পড়লে পরামর্শের জন্য বিরক্ত করেছি। সারাদিন কাজে ব্যস্ত থাকলেও কখনো অপরাগতা প্রকাশ করেননি। নাজমুল ভাই অনেকবারই সোসাইটির মধ্যে আমাদের যে দূরত্ব সেটা দূর করার অনেক চেষ্টা করেছেন। এখনো করছেন।

গত রবিবারও আমি সিংগাপুর লেখক উৎসবে কবিতা আবৃত্তি করেছিলাম। প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিয়ে গড়ে ওঠা গানের দল মাইগ্যান্ট ব্যান্ডও পারফর্ম করে এবং বাংলাদেশী দর্শক সংখ্যা যথারীতি একজন এবং তিনি আমাদের নাজমুল ভাই। বিদেশি লেখক এবং সাহিত্য অনুরাগীরা বসে বসে বাংলা গান শুনছেন আর দর্শক সারিতে কোন বাংলাভাষী নেই ব্যাপারটা সত্যিই পীড়াদায়ক। এ অবস্থা চলতে থাকলে স্থানীয় আয়োজকরা বাংলাদেশীদের নিয়ে অনুষ্ঠান আয়োজনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে।

  • রিপন চৌধুরী, সিঙ্গাপুর
শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.