Featured এশিয়া মালয়েশিয়া

সিঙ্গাপুরের ট্যাক্সি ড্রাইভার এবং আমাদের চিন্তাধারা

শেয়ার করুন

সময়টা ২০০৭ সালের প্রথম দিকে। একদিন সিংটেল ডাটা সেন্টারে সারা রাত মাইগ্রেশন কাজ শেষ করে ভোর ৫টায় বাসায় যাচ্ছিলাম। প্রতিবারের মতো ট্যাক্সি বুক করলাম। একটুপর একটা মারসিডিজ ট্যাক্সি হাজির হলো। আমি বেশির ভাগ সময় হুন্দাই বা টয়োটা ট্যাক্সি পাই, কিন্তু ওই রাতে মারসিডিজ ট্যাক্সি এসে হাজির।

ট্যাক্সি দেখে মনে হল নতুন, ট্যাক্সিতে বসে সেটা নিশ্চিত হলাম। ট্যাক্সি ড্রাইভার চীনের নাগরিক। বয়স আনুমানিক ৬৫-৭০ বছর হবে। তাকে দেখে ভদ্র মনে হলো।  ভালো বা খারাপ যাই বলুন, আমার একটা অভ্যাস আছে। সেটা হচ্ছে ট্যাক্সিতে বসেই ড্রাইভারের সাথে গল্প জুড়ে দেওয়া। আমি মনে করি আমাদের সবার কাছ থেকেই কিছু শিক্ষার আছে।

আর তাই প্রতিবারের মতো এবারও ট্যাক্সি ড্রাইভারের সাথে গল্প জুড়ে দিলাম। ট্যাক্সি ড্রাইভার ট্যাক্সি হাইওয়েতে নিয়ে যেতে যেতেই আমাকে ‘গুড মর্নিং স্যার বললো’। আমি থ্যাংক ইউ বলতেই, আমাদের কথাপোকথন শুরু হলো- উনি জিজ্ঞাস করলেন, আপনি কোথা থেকে এসেছেন? বললাম বাংলাদেশ থেকে।

সে আমাকে জিজ্ঞাসা করলো, আপনি কি আই টি তে কাজ করেন? আমি বললাম জি, ইউনিক্স নিয়ে কাজ করি, কিন্তু আপনি বুজলেন কিভাবে? উনি বললেন, ডাটা সেন্টারে সাধারণত আই টি এর লোকজন কাজ করতে আসে আর (Singtel) এর এই ডাটা সেন্টার সবার কাছেই পরিচিত।

সে আবার জিজ্ঞাস করলো, কোন এরিয়া থেকে এসেছেন? আমি বললাম, ঢাকা থেকে। সে আবার জিজ্ঞাসা করলো, ঢাকার কোথায়? আমি বললাম, এয়ারপোর্ট এর পাশের এলাকা। এবার সে জিজ্ঞাস করলো উত্তরা? আমি এবার সোজা হয়ে বসে বললাম, জি।

বেশ অবাক হলাম, সিঙ্গাপুরে এখনো অনেক মানুষ আছে যারা জানেনা বাংলাদেশ আলাদা একটা দেশ। অনেকে বাংলাদেশকে ইন্ডিয়ার একটা অংশ মনে করে। যদিও ক্রিকেট খেলা বাংলাদেশকে অনেকের কাছে আলাদা একটা দেশ হিসাবে মনে করিয়ে দিয়েছে। তারপরও সিঙ্গাপুরের বেশির ভাগ মানুষ ক্রিকেট খেলা বুঝেনা বা আগ্রহও কম। তার পর ঢাকা বা উত্তরা চিনে এমন সিঙ্গাপুরিয়ান খুবই কম। আর তাই তাদের কাছ থেকে উত্তরা নামটা জানা মোটেই স্বাভাবিক না !

আমি জিজ্ঞাস ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি উত্তরা কিভাবে চিনেন? সে জবাব দিলো সে বাংলাদেশে ১২ বছর চাকুরী করেছে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের বাংলাদেশের শাখায়। ১০ বছর আগে অবসর নিয়েছে। ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, টঙ্গী সহ অনেকগুলো বড় বড় শহরে প্রজেক্ট কমপ্লিট করেছে। উনি বাংলাদেশ, কোরিয়া, জাপান, চায়না, সুইডেন সহ বিশ্বের ১৭টি দেশে বিভিন্ন প্রজেক্টে নিয়ে কাজ করেছেন।

লোকটার গল্প শুনে মন ভরে গেলো। খুব সংকোচ করে জিজ্ঞাস করলাম, কেন এই (ট্যাক্সি) পেশায় আসলেন?  সে জানায়, পার্ট টাইম ট্যাক্সি চালান সময় কাটানোর জন্য। বাসায় কাজ না করতে করতে তাঁর অবসন্ন লাগে। জিজ্ঞাসা করলাম, আপনার বাসায় কে কে আছে? বললো উনার ৩টা বাড়ি, ২টা ভাড়া দেওয়া আর একটা ৩ তলা বাংলো বাড়ি, সেটায় উনারা থাকেন। এক ছেলে ৩ তলায়, এক মেয়ে ২ তলায় আর সে ১ তলায় থাকেন। ছেলে সিঙ্গাপুর সুপ্রিম কোর্ট এর একজন জজ আর মেয়ে সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির হাসপাতালের ডিরেক্টর।

এটা শুনে তার প্রতি সম্মানটা আরো বেড়ে গেলো। আসলেই সিঙ্গাপুরিয়ানদের কাছ থেকে আমাদের অনেক শেখার আছে। গত ১৫ বছর ধরে শিখছি আরো শিখবো বলে আশা করছি।

আমি আরো খেয়াল করলাম, আমাদের দেশের যখন যে সরকার আসে, সেই সরকার সিঙ্গাপুরকে অনুসরণ করে। যদিও আমাদের মন্ত্রী, এমপিরা একটু বাড়িয়ে বলে তারপরও তারা চেষ্টা করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে। আর উন্নয়ন কোনো কারণে বাধাগ্রস্থ হলে, সরকারকে আমরা দোষ দেই।

আমার মনে হয় দেশের উন্নয়নের সাথে সাথে আমাদের মন মানসিকতার উন্নয়নও জরুরী। আমরা নামি-দামী ইউনিভার্সিটিতে পড়াশুনার জন্য কত টাকা খরচ করি। কিন্তু মন মানসিকতা উন্নয়নের জন্য একটু সময় ইতিবাচক চিন্তা, সৎ ও সহানুভূতিটা খরচ করি না।

  • নাজমুল খান, সিঙ্গাপুর। 
শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.