Featured আমেরিকা

শিশু নির্যাতন বন্ধে সহমর্মিতা হতে পারে একটু আশার আলো

যুগের সাথে সাথে আমাদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যেখানে একের পর এক ধাপ এগিয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেখানে আমরা আজ ও দেখি সহমর্মিতার অভাব, চলছে শিশু নির্যাতন। আমাদের দেশে প্রতি ঘরে ঘরে কাজের ছেলে বা মেয়ে রাখাটা যেন এক রকম ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাজের লোক না থাকলে মনে হয় সমাজে তাদের স্ট্যাটাসের নিম্মচাপ সৃষ্টি হয়ে যায়।

মানে সমাজ যেন তাকে ওই কাজের লোক ছাড়া উঠা-বসা করতে নিষেধ করে দিয়েছে এমন একটা ভাব। অনেকক্ষেত্রে দেখা যায় যে, কাজের ছেলে বা মেয়ের বয়স ১২ বছর ও হয় নাই ৷ যার বাবা এবং মা আর্থিক অনটনের কারণে তাদেরকে বাধ্য হয়ে মানুষের বাসা বাড়িতে কাজ করার জন্য পাঠিয়ে দেন শুধু দুই বেলা দুমুঠো ভাত খাবার আশায়। ঠিক ওই মুহূর্তে যে ব্যক্তি ওদেরকে বাসা বাড়িতে কাজ করানোর জন্য নিচ্ছেন, একটিবারের জন্য ও ভাবেন কিনা ওর বয়সে যে ছেলে মেয়েরা স্কুলে যাওয়ার কথা ঠিক আপনার বা আমাদের ঘরের ছেলে মেয়েদের মত।

মা বাবার আদর স্নেহে বেড়ে উঠার বয়স যাদের, তারাই কিনা মা বাবার বোঝা হয়ে নিজেদের স্বপ্নগুলো এর বাড়ি এবং ওর বাড়িতে কামলা দিয়ে নিজেদের জীবন ধূলিসাৎ করে অন্ধকার রাস্তার দিকে হাঁটছে। যদি ওরা আজ ওই অভাব অনটন মাখা পরিবারে জন্মগ্রহণ না করে আপনার আমার মত সাবলীল পরিবেশে জন্ম গ্রহণ করতো তাহলে কে করতো ঐসব ঘরের কাজগুলো, যাদের নাকি কাজের ছেলে বা মেয়ে ছাড়া এক গ্লাস পানি ঢেলে খাওয়া ও ছিল অসম্ভব।

বলছিলাম সহমর্মিতার কথা, যে ছেলে বা মেয়েকে আপনি গাধার মত খাটুনি খাটাচ্ছেন, আপনার শক্তি থাকা সত্ত্বে ও সব আপনি বসে বসে উজাড় করে দিচ্ছেন আর সব কাজ ১২ বছরের ছেলে বা মেয়েকে দিয়ে করাচ্ছেন ৷ আবার তার পাশাপাশি একটু আধটু ভুল হলে বকুনির পাশাপাশি চড় থাপ্পড় দিতে ও আপনি দ্বিধাবোধ করেন না। ঠিক তখনি আমি ভেবে ভেবে বলি, ওর বয়সী আপনার যে ছেলে বা মেয়েটি আছে তাকে দিয়ে আপনি কতটুকু ঘরের কাজ করান?

আপনার সন্তান একটা না দশটা ভুল করলে ও আপনি কয়বার ওই কাজের ছেলে বা মেয়েটির মত আপনার ছেলেকে বকুনি দেন? যদি ও আপনার ছেলে বা মেয়ে বলে আপনি কোন অ্যাকশন নিতে যেমন নারাজ, ঠিক তেমনি আপনার কি কখনো ওই খেটে খাওয়া ছেলে বা মেয়েগুলোর প্রতি একটু সহানুভূতি বা সহমর্মিতার হাত বাড়ানো প্রয়োজন মনে করেন নি ? যদি তাই হয় তাহলে আমাদের দেশের হাজার হাজার কাজের ছেলে বা মেয়েরা আপনার আমার ছেলেমেয়ের মত মানুষ হবার স্বপ্ন দেখতে দোষ কোথায়? ওদের জন্মস্থান আপনার লেভেলের চাইতে একটু নিচু লেভেলে তাই, তাহলে আমি বলবো আপনি অনেক ভুল ধারণার মধ্যে আছেন।

আপনি বা আমি ও কিন্তু ওদের মত জন্মাতে পারতাম, কিন্তু বিধাতা বোধ হয় আমাদেরকে কিছু পরীক্ষায় পাশ করার জন্য একটু ওদের চাইতে উপরের অবস্থানে পাঠিয়েছেন। ওই যে মহান আল্লাহ যদি সব কাজ নিজেই করতেন তাহলে আমাদেরকে কেন এই পৃথিবীতে জন্ম দিয়েছেন? কিছু কিছু কাজ আমাদেরকে ও করার নির্দেশ দিয়েছেন, অন্যায় এবং অবিচার দেখলে সেখানে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে বলেছেন। মানুষ যখন একে অপরের প্রতি সহমর্মিতা না দেখায় সেখানে মানুষকে ভালোবাসতে বলেছেন, জাতি, ধর্ম এবং বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে এক হয়ে চলার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন।

ভালোকে ভাল এবং মন্দকে মন্দ মেনে একে অপরের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে বলেছেন। যেহেতু কিছু কিছু জিনিস যখন আমরা অমানবিক দেখি সেগুলো শুধরানোর দায়িত্ব ও কিন্তু আমাদের বর্তায়। আমাদের দেশে যে হারে শিশু নির্যাতনের শিকার হচ্ছে সেটি পৃথিবীর অন্য কোথা ও আছে কিনা বলতে পারবোনা, কিন্তু আমাদের দেশেই মনে হয় এই সব নির্যাতনের চিত্র অহরহ।

যেদিন থেকে প্রবাস জীবন কাটাচ্ছি, ঠিক সেইদিন থেকে আমি কখনো ওই কাজের ছেলে বা মেয়ের সাথে আমার কোন অমিল খুঁজে পাইনি। ওরা গরীব ঘরের সন্তান বলে যেভাবে ইচ্ছা আপনারা সেভাবেই খাটিয়েছেন। যখন আপনার সন্তান খেলা-ধুলা করে, ওদের ও মন চায় কিন্তু নিয়তি ওদেরকে আটকে দিয়েছে এবং শিখিয়ে দিয়েছে এগুলো তাদের জন্য নয়। তাই ওরা সব কিছু মাথা পেতে নেয়। আপনার সন্তান যখন টিভি দেখে, ওদের ও দেখতে মন চায়।

কিন্তু আপনার বকুনি খেয়ে ওদের ভিতরের কান্না গুলো জমাট বেঁধে বরফ হয়ে যায়। ঠিক তেমনি আমি যখন প্রবাসী, তখন আমার ও হাজারো ইচ্ছা থাকা সত্ত্বে অনেক কিছু আমার মত করে পাওয়া সম্ভব হয় নি। ঈদের দিন ছুটি তাও মেলেনি, শুক্রবার জুম্মাহ পড়ার জন্য ছুটি তাও মিলেনি, কখনো অনেক বন্ধু মিলে ক্রিকেট খেলতে বাহির হল কিন্তু আমার কাজ থাকায় আর ওদের সাথে আনন্দগুলো ভাগাভাগি করে নিতে পারি নি। তাই আমি ও আজ আমাদের দেশের কাজের ছেলে বা মেয়েদের সাথে আমার কোন অমিল খুঁজে পাই না।

যেহেতু আমার সবকিছুই আজ ওদের সাথে মিলে গেছে তাই আমি ও বলতে পারি পৃথিবীতে অনেক মানুষই আছে যারা মানুষ চিনতে ভুল করে। মানুষকে ভালোবাসতে ঘৃণা করে, মানুষকে নির্যাতন করে কোন কারণ ছাড়াই। তাই তাদেরকে বলছি, মানুষের সাহায্যে হাত বাড়িয়ে দিন। একে অপরের প্রতি ভালোবাসা ছড়িয়ে দিন। স্বার্থপর জীবন পরিত্যাগ করুন।

যে কয়দিন বাঁচবেন মানুষের জন্য বাঁচুন আর কাজের ছেলে বা মেয়েদের ভালোবাসুন। সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দিন, দেখবেন ওরা ও অনেক আনন্দে আপনার সাথে মিলে মিশে থাকবে, একটি কথায় আছে “ফুল ফুটে ঝরে যায় দুনিয়ার নীতি মানুষ মরে যায় রেখে যায় স্মৃতি” মানুষ যেন আপনার বা আমার কর্মের মাধ্যমে বেঁচে থাকতে পারে সেই প্রত্যাশাই করছি।

গোলাম মাহমুদ, ভার্জিনিয়া, যুক্তরাষ্ট্র

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.