Featured আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে একদিন

শেয়ার করুন

ভার্জিনিয়া থেকে প্রায় ২৭৪ মাইল দূরে নিউইয়র্ক স্টেট। যেখানে গাড়িয়ে চালিয়ে যেতে প্রায় ৫ ঘন্টার মতো সময় লাগে। আর নিউইয়র্ক থেকে বোস্টন, ম্যাসাচুসেটস স্টেট প্রায় ২২৮ মাইল দূরে। সেজন্য প্রথমে নিউইয়র্ক গিয়ে এক রাত্রি যাপন করে পরদিন বোস্টনের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। অবশ্য আমার উদ্দেশ্য ছিল দুটো। প্রথমত, ওখানে এক মামার বিয়ে সেটাতে অংশগ্রহণ করা এবং দ্বিতীয়ত, বোস্টন সিটি ঘুরে দেখা।

নিউইয়র্ক থেকে সকালে যাত্রা শুরু করলাম, কারণ ঐদিন ছিল শুক্রবার জুম্মার দিন। মাঝপথে কানেক্টিকাট স্টেটের মসজিদ আল মুস্তফাতে থেমে আমরা জুম্মার নামাজ আদায় করলাম। এই ভ্রমণে আমার সঙ্গীরা সবাই শ্বশুর বাড়ির মানুষজন। যাই হোক, আমরা নামাজ শেষ করেই ম্যাকডোনাল্ডস থেকে দুপুরের লাঞ্চ সেরে সরাসরি বোস্টনের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। বোস্টনে ৬টি বেডরুমের একটি বাড়ি একমাস আগেই আমরা ভাড়া করে রেখেছিলাম।

সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে আমার গাড়ি প্রথম পৌঁছালো। বাড়ির দুই পাশে গহীন অরণ্য। রাতের বেলায় ভয়ও করছিলো ভীষণ। বাড়ির চাবি মাস্টার লকের ভিতরে রাখা, আমি গাড়ি থেকে বের হয়ে খুঁজতে গেলাম। মনে মনে ভাবলাম, যদি আমাকে কেউ নিয়ে যায় তাহলে আমার বৌ আর ফাতিহার কি হবে? অন্ধকারে দুনিয়ার যত উদ্ভট চিন্তা এসে মাথায় ভর করছে। অবশেষে চাবি খুঁজে পেয়ে বাড়িতে ঢুকে সব গুলো লাইট জ্বালিয়ে দিলাম, এরই মধ্যে দ্বিতীয় গাড়ি এসে হাজির হয়েছে। মনটাকে একটু স্বান্ত্বনা দিলাম।

আমাদের পরদিন দুপুরে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি ভিসিট করার কথা। এই ভিসিটে দুইজন মানুষ ছিল যাদের একজন বয়সের তারতম্যে অনেক বড় (দাদী শ্বাশুড়ি) আরেকজন অনেক ছোট (আমার মেয়ে ফাতিহা), ফাতিহা সহ আমরা সবাই জন হার্ভার্ড (ফাউন্ডার) এর স্ট্যাচুর সাথে ছবি তুলেছি। কিছুদিন আগে ফেইসবুকে একটা বাস্তব ঘটনার উপলব্ধি দেখেছিলাম।

ফাতিহার বয়সী ছোট একটা মেয়ে যার বয়স ছিল ৩ বছর (ক্রিস্টাল ওয়েং), সে একজন পুলিশ অফিসারের কোলে বসে একটি ছবি তুলেছিল, আর সেই মেয়েটি ২০ বছর পর হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে ফ্রেশম্যান স্টুডেন্ট হিসেবে যখন এডমিশন নেয় তখন ওই অফিসারের সাথে আবার দেখা হবার পর আরেকটি ছবি তোলে যেটি পরবর্তীতে ভাইরাল হয়ে যায়।

আমরা সবাই হার্ভার্ড বুক স্টোরের কর্ণার হয়ে হার্ভার্ড আর্ট মিউজিয়াম দেখে তারপর ফিলোসফি ডিপার্টমেন্টের পাশ দিয়ে প্রবেশ করলাম। হাজার হাজার টুরিস্ট এসেছে এই হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ভ্রমণ করতে। চারিদিকে শিক্ষার এক দারুন পরিবেশ। যদিও আমরা শুধু ক্যাম্পাস ভ্রমণ করেছি, কিন্তু কোন ভবনের ভিতরে প্রবেশ করার অনুমতি ছিল না। ভবনগুলোতে ভ্রমণ করতে হলে হয়তো স্টুডেন্ট আইডেন্টিফিকেশন কিংবা ভিন্ন ধরণের আইডেন্টিফিকেশন লাগে যেটি ওই মুহূর্তে আমাদের ছিল না।

আমরা একে একে অনেকগুলো ক্যাম্পাস ভ্রমণ করে সর্বশেষে হার্ভার্ড আইন ডিপার্টমেন্ট ভ্রমণ করে আমাদের যাত্রা স্থগিত করি। অনেক স্টুডেন্টরা আসছে এখানে বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করতে, অনেককেই ট্যুর গাইড বর্ণনার মাধ্যমে এই ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে প্রতিনিয়ত জ্ঞান দিয়ে যাচ্ছেন।

হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৬৩৬ সালে বোস্টন শহরের ক্যামব্রিজ, ম্যাসাচুসেটস। ইউএস নিউজের সূত্র অনুযায়ী, এই ক্যাম্পাসের আয়তন ৫ হাজার ৭৬ একর জায়গা জুড়ে। এখানে আন্ডারগ্রাজুয়েট ভর্তির আসন সংখ্যা ৬৭৮৮ জনের মত। এই ইউনিভার্সিটির টিউশন ফি হচ্ছে প্রায় ৫১,৯২৫ ডলার।

এটি অনেক পুরাতন একটি প্রতিষ্ঠান যেটি উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে অনেক সুনাম অর্জন করে আসছে। ঐতিহাসিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়টি অন্যতম বিভাগগুলো হচ্ছে মেডিসিন (১৭৮২), আইন (১৮১৭), ব্যবসা(১৯০৮) এবং হার্ভার্ড গ্রাজুয়েট স্কুল অফ আর্টস এন্ড সাইন্সেস (১৮৯০), এই হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় সেরা ইউনিভার্সিটিগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থান রয়েছে।

ম্যাসাচুসেটস এর বোস্টনের বাইরে অবস্থিত, হার্ভার্ড শীর্ষস্থানীয় বিজনেস স্কুল এবং মেডিকেল স্কুল এবং উচ্চতর স্নাতক শিক্ষা স্কুল, এছাড়া স্কুল অফ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অ্যাপ্লাইড সায়েন্সেস, ল স্কুল এবং জন এফ কেনেডি সহ ১৩ টি স্কুল এবং ইনস্টিটিউট নিয়ে এটি গঠিত। হার্ভার্ডের বিস্তৃত গ্রন্থাগার ব্যবস্থা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাচীনতম সংগ্রহ এবং এটিকে বিশ্বের বৃহত্তম ব্যক্তিগত সংগ্রহ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মোট আটজন রাষ্ট্রপতি ফ্র্যাঙ্কলিন ডেলানো রুজভেল্ট এবং জন এফ কেনেডি সহ সকলেই এই হার্ভার্ড থেকেই স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন। উল্লেখযোগ্য প্রাক্তন ছাত্রদের মধ্যে হেনরি ডেভিড থোরিও এবং হেলেন কেলার এখানে পড়েছেন।

অবশেষে এই বিখ্যাত হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি ঘুরতে পেরে নিজেদেরকে ধন্য মনে করলাম। যে বয়সে আমরা কিছুই দেখতে পাই নি, সে বয়সে আমার মেয়ে ফাতিহা এই বিশ্ববিদ্যালয় ভ্রমণ করতে এসেছে। ভ্রমণের সঙ্গী অনেকেই বলছেন, যদি হয়তো ফাতিহাও একদিন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারে! এই কথা শুনে আমি কিছুক্ষন হাসলাম আর বললাম, আমি জানি না আমার মেয়ে কি পড়বে বা কোথায় পড়বে, তবে আমি এতটুকু জানি আজকাল ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লেই ভালো মানুষ হওয়া যায় না। আমি চাই ফাতিহা একজন ভালো মানুষ হয়ে বেঁচে থাকুক। আমাদের কোন কিছুই যাতে ওর উপর চাপিয়ে না দিই সেটাই থাকবে মূল লক্ষ্য।

  • গোলাম মাহমুদ মামুন, ভার্জিনিয়া, যুক্তরাষ্ট্র 

আরও পড়ুন- প্রবাসে আমার দিনরাত্রি, পর্ব- ০১

প্রবাসীদের সব খবর জানতে; প্রবাস কথার ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.