Featured ইউরোপ যুক্তরাজ্য

মেয়ে তোমার বাড়ি কোথায়, এই প্রশ্ন আর কত কাল?

চারটা দেয়াল এবং ছাদ দিয়ে তৈরি হয় ঘর। সেই ঘরকে বাড়ি বানায় একজন মেয়ে কিংবা নারী। তারপরও যখন কেউ বাড়ীর কথা বলে তখন অন্যরা জানতে চায় কার বাড়ি ? বাবার বাড়ি, ভাইয়ের বাড়ি, স্বামীর বাড়ি নাকি শ্বশুরের বাড়ি?

গত কয়েক মাস আগে ফেসবুকে কলকাতার এক মহিলা কবির একটি কবিতা শেয়ার হয়েছিল ( বেশীর ভাগ মেয়ে বন্ধু ) শেয়ার করেছিল। “ মেয়ে তোমার বাড়ি কই ? “ আমি প্রতিবার অবাক হয়ে যেতাম কেন সবাই এই কবিতাটা শেয়ার করছে?

তাহলে কি তার নিজের মনের কোথাও নিজেকে নিয়ে সন্দেহ আছে? যে তার কোন মর্যাদা নেই, সে কি পরিবারের মধ্যে নিজের অস্ত্বিতকে খুঁজে পাচ্ছে না? এই জন্য কি তার নিজের বাড়ী কোথাও খুঁজে পাচ্ছে না? সবার মাঝে থেকেও কি নিজেকে কারো কাছে মূল্যবান অথবা সমমূল্যের মনে করতে পারছে না?

কিছু দিন আগে আমার এক বড় বোন কথায় কথায় বললেন, “ভাইরা চায় তাদের বাড়িতে আমি থাকি কারন তোমার দুলাভাই মারা গিয়েছেন, এখন ওরা আমাকে একা থাকতে দিতে চায় না, কিন্ত আমি কিভাবে ভাইদের বাড়িতে থাকি? আমার স্বামী না থাকলেও স্বামীর বাড়িতো আছে ! তাই আমি স্বামীর বাড়ি চলে যেতে চায় ।“

আমি অবাক হয়ে বলেছিলাম, এটা ভাইয়ের বাড়ি, ওটা আপনার স্বামীর বাড়ি তাহলে আপনার বাড়ি কই? স্বামী মারা যাবার পরও ঐ বাড়ি কেন আপনার বাড়ি বলতে পারছেন না? এখনতো আর আপনার অভিভাবক মানে স্বামী নেই।

হয়তো বা মারা যাবার আগে উনি আপনার নামেই বাড়িটা লিখে দিয়ে গিয়েছেন তারপরও কেন আপনি ঐ বাড়িটা নিজের বাড়ি বলতে পারছেন না ?

আমি কিছুই বলতে পারলাম না। মনে হল, এই ২০১৯ সালে প্রযুক্তি হয়তো অনেক এগিয়েছে। সেই প্রযুক্তির ব্যবহারও আমরা করছি অনায়াসে, কিন্ত আমাদের মন রয়ে গেছে সেই ১৪ শ শতকে।

তারপর নিজের মনেই প্রশ্ন জাগলো কেন আমরা মেয়েরা পরিবর্তন হতে পারছি না? কোথায় আমাদের এতো বাঁধা? তখন দেখলাম আমাদের জন্মের পর থেকেই শিশু অবস্থায় প্রথমেই আমরা আমাদের মায়েদের দেখি, বাবা হলেন তার অভিবাবক।

বাসায় তিনি থাকেন না কিন্ত বাসার সব কিছু তার মতামতে হয়। তার পছন্দের বাজার আসে প্রতিদিন, মা তার পছন্দের খাবার রান্না করে টেবিলে দেন।

আমরা কখনো দেখি নাই , মায়ের পছন্দের খাবার কি? আমরা শুধু নানীর মুখে হয়তো সৌভাগ্যক্রমে গল্প শুনতে পেয়েছি মা ছোট বেলায় এটা খেতে পছন্দ করতেন, ওটা পছন্দ করতেন। বিয়ের পর তার সেই পছন্দগুলো হারিয়ে যায়। কারন বাবার পর স্বামী, নতুন অভিবাবক হয়ে তার জীবনে আসে।

নতুন অভিবাবকের পছন্দ-অপছন্দের ভিড়ে তার নিজস্ব পছন্দগুলোতে ধুলো পড়ে যায়, স্বপ্ন, ইচ্ছা এই শব্দগুলোর মানে ভুলে যায়। অথচ কোন মেয়েই সে শিক্ষিত অথবা অশিক্ষিত হোক না কেন, বাবার পর আর কি কোন অভিবাবক সে চায় ? মেয়েদের কাছে প্রশ্ন করলে মনে হয় ৯৯% মেয়ে বলবে সে কোন অভিবাবক না, সে চায় জীবন সাথী।

সাথী শব্দটা সে জোর গলায় বলবে কারন সাথী শব্দের কোন বিপরীত শব্দ নেই। সাথী মানে বরাবর , স্বামী যেমন একজন মানুষ ঠিক সেই রকম সেও একজন মানুষ। তাই সে যেমন স্বামীকে মানুষ মনে করে ঠিক একই ভাবে সে চায় স্বামীও তাকে মানুষ মনে করবে।

কোন অবলা নারী নয়, একজন সন্মানজনক মানুষ, যার নিজের বাড়ী থাকবে। থাকবে সেই বাড়ী সাজানোর থেকে শুরু করে সব কিছুতে তার মতামত দেবার সমান অধিকার।

দেশে মেয়ে প্রধানমন্ত্রী থাকলেই মেয়েদের সম্মান আছে দেশটিতে,ব্যাপারটা এতো সহজ নয়। সম্মান আসে পরিবার থেকে ,সমাজ থেকে। এটা কোন নারীবাদী কথা নয় , এটা মানুষবাদী কথা। ছেলে-মেয়ে উভয় মানুষ, তাই তাদের সম্মানও সমান হওয়া উচিত। কোন ছেলে প্রবাসে থাকলে তখন সে পরবাসী হয় কিন্ত মেয়েরা, নিজের বাড়ীতে থেকেই পরবাসী হয়ে রয়।

সমাজ কোন ছেলে নয়, সমাজ হলাম আমরা মানে মানুষ, অনেক মানুষ মিলেই একটা সমাজ গড়ে উঠে। তাই একজন নারীকে সমাজ নারী বলে অবহেলা করে না। অবহেলা করে মানুষ নামধারী কিছু নারী-পুরুষ, যারা আগে মানুষ নয় , জন্ম থেকেই যারা নারী, পুরুষ হয়েই জন্মায় এবং কোন দিন মানুষ হতে পারে না ।

একটা সময় এই ইউরোপে মেয়েদের কোন সন্মান ছিল না , ছিল না কোন অধিকার । কিন্ত আজ সেটাকে তারা ইতিহাসের বইয়ের মধ্যে পাঠিয়ে দিয়েছে এবং রচনা করেছে নতুন ইতিহাস। নতুন করে ইতিহাস লেখার সময় আমাদেরও  এসে গেছে।

তা না হলে অন্যান্য দেশের মানুষ যখন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে পরিবারকে, সমাজকে, দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। তখন আমরা নিজের ঘরে পরবাসী হয়ে শুধু নিজেকেই বঞ্চিত করবো না, একটা মেরুদণ্ডহীন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তুলবো।

  • রুকসানা হাবিব লুবনা, বামিংহাম, যুক্তরাজ্য 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.