Featured বাংলাদেশ থেকে ভ্রমণ মালয়েশিয়া

মালয়েশিয়া ভিসা ও ইমিগ্রেশন পার পেতে কিছু অভিজ্ঞতা

ছিমচাম গুছানো পরিষ্কার ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এশিয়ার অন্যতম মুসলিম দেশ মালয়েশিয়া । বাংলাদেশী ভ্রমন পিয়াসীরা তাদের ঘুরতে যাওয়া দেশের তালিকায় বেঁছে নিচ্ছেন দুই ঋতুর দেশ মালয়েশিয়া । ঘুরতে মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্যে সবার প্রথমে আপনার যে জিনিস প্রয়োজন হয় তা হল, ভ্যালিড পাসপোর্ট এবং ভিসা । মালয়েশিয়া ভিসা পেতে আপনাকে খুব বেশি ঝামেলা পোহাতে হবে না।

মালয়েশিয়া সরাসরি এম্বাসি থেকে ভিসা প্রদান করে না । নির্ধারিত ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস ও এম্বাসির নির্দিষ্ট ফিসহ আবেদনপত্র জমা দিতে হয় । আবেদনপত্র জমা দেওয়ার ৭/৮ কার্যদিবসের মধ্যে আপনার পাসপোর্ট হাতে পাবেন। মালয়েশিয়া এম্বাসি মুলত ৩ মাস মেয়াদী সিঙ্গেল এন্ট্রি পাস ভিসা প্রধান করে থাকে। যা দিয়ে আপনি কেবল একবার প্রবেশ এবং বের হতে পারবেন। ভিসা পাওয়াটা আপনার জন্যে সহজ হবে যদি আপনার পাসপোর্টে পূর্বে কয়েকটি দেশের ভ্রমন ভিসা থাকে।

একদম খালি পাসপোর্টে ভিসা পাওয়ার সম্ভাবনা একদম কম । সেই ক্ষেত্রে আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা- মালয়েশিয়া ভ্রমনের আগে আমি শুধু মাত্র ইন্ডিয়া ভ্রমন করেছি । সুতরাং আমার পাসপোর্টেও ইন্ডিয়া ব্যাতিত অন্যকোন দেশের ভিসা ছিল না । আমাকেও এজেন্সি থেকে বলা হয় আমার ভিসা পাওয়ার সম্ভাবনা একদম কম । বলে রাখি মালয়েশিয়া ভ্রমনে আমার মূল উদ্দ্যেশ্য ছিল ২ টি ম্যারাথনে অংশগ্রহন করা এবং সেই সাথে ঘুরে বেড়ানো।

সুতরাং আমার কাছে ২ টি ম্যারাথনের আমন্ত্রন পত্র ছিল যা আমি ভিসা আবেদন পত্রের সাথে জমা দেই এবং আমি ভিসা পেয়েও যাই। আপনার প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র রেডি করে আবেনপত্র সহ জমা দেওয়ার কয়েকদিনের মধ্যে এম্বাসি থেকে ফোন দিয়ে আপনাকে জাছাই করবে ।

ভিসার আবেদনপত্রের সাথে আপনাকে যে সব ডকুমেন্টস জমা দিতে হবে-

  •   ভ্যালিড পাসপোর্ট
  •   পাসপোর্টের ফটোকপি
  •   মিনিমাম ৬ মাসের ব্যাংক স্টেটমেন্ট এবং ঐ একাউন্টে কারেন্ট মিনিমাম ষাট থেকে একলক্ষ টাকা থাকতে হবে ।       
  •   যদি  মালয়েশিয়া ভিসার জন্যে প্রথমবার আবেদন করেন তাহলে ব্যাংক সলভেন্সি সার্টিফিকেট প্রধান করতে হবে ।
  •   সম্প্রতি তোলা ২ কপি ছবি। সাইজ ৩৫মিমি*৫০মিমি)
  •   আপনি চাকরি বা ব্যাবসা করে থাকলে ঐ প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব প্যাডে এনওসি কপি
  •   আপনার ভিজিটিং কার্ড
  •   যাওয়া আসাসহ বুকিং এয়ার টিকেট ।
  •   ভিসা অফিসার বরারর আবেদনপত্র
  •   নির্ধারিত এম্বাসি ফি ৫,৬০০ টাকা
  •   সব ডকুমেন্ট ঠিকমত প্রধান করে থাকলে আপনি ভিসা পেয়ে যেতে পারেন ।

এক্ষেত্রে আবারো বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বলছি- প্রথমে ভিসার জন্যে আবেদন করার পর অভিজ্ঞতাসম্পূর্ন অনেকেই আমাকে বললেন শুধুমাত্র একটা দেশের ভিজিট ভিসা নিয়ে আমি মালয়েশিয়া ভিজিট ভিসা পাবো না। ভিসা যাতে সহযে পেয়ে যাই তাই প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টের সাথে আমি আরো বেশকিছু সাপোর্টিং ডকুমেন্টস জমা দেই এবং আমি ভিসা পেয়েও যাই ।

এবার জানলাম ইমিগ্রেশন নিয়ে অনেক ঝামেলায় পোহাতে হয় বাংলাদেশীদের জন্যে । এর সত্যতা খোজার জন্যে ইন্টারনেটে বেশ ঘাটাঘাটি করলাম । বেশ কিছু নিউজ পরে এর সত্যতা পেলাম । এমনও তথ্য পেলাম নানান সময়ে ব্যাবসায়ী থেকে শুরু করে ট্যুরিস্ট এমনকি বাংলাদেশের উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদেরও ঢুকতে দেয় নি মালয়েশিয়ান ইমিগ্রেশন। এইসব তথ্য জানার পর এবার চেনা জানার মধ্যে যারা পুর্বে মালয়েশিয়া ভ্রমন করেছেন এমন কয়েকজনের সাথে কথা বলে তাদের অভিজ্ঞতা শুনলাম ।

শুনে মনে হলে এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে চাই না , আমি মালয়েশিয়া যাব না বলেই একধরনের সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম । পরে আরো অনেকের সাথে কথা বললাম যারা পূর্বে মালয়েশিয়া ভ্রমন করেছেন। এক বড় ভাইয়ের সাথে আলোচনা করে বেশ কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য পেলাম। তিনি আমাকে পরামর্শ দিলেন কি কি প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস সাথে থাকলে, ইমিগ্রেশন পাশ না দিলে আমি ইমিগ্রেশন অফিসারদের সাথে বিট করতে পারব । আমি সেই লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংঙ্গে নিলাম ।

আবেদনের পর আপনি ভিসা পেয়ে গেলেন । ভাবছেন এখন আপনাকে আর কে আটকাতে পারে, এমন ভাবার কোন কারন নেই । জ্বি মালয়েশিয়া ইমিগ্রেশন বাংঙ্গালিদের জন্যে এক ভয়াবহ জায়গা । বাংলাদেশ থেকে প্রতিদিন শতশত লোক মালয়েশিয়া পাড়ি জমান যাদের বেশিরভাগই ভ্রমন ভিসা নিয়ে প্রবেশ করে অবৈধ অধিবাসী হিসেবে সেখানে থকে যান। যার ফলে মালোশিয়ার ইমিগ্রেশন পুলিশের তীক্ষ্ণ নজর থাকে বাংলাদেশী পাসপোর্টধারীদের দিকে।

শুধুমাত্র বৈধ পাসপোর্ট এবং ভ্যালিড ভিসা সাথে থাকলেই, আপনাকে ইমিগ্রেশন পাস দিয়ে দিবে এমন ভাবার কোন কারন নেই । ভিসা থাকার পরেও প্রতিদিন শতশত ট্যুরিস্ট বাংঙ্গালী পাসপোর্টধারীদের দেশে রিটার্ন পাঠাচ্ছে মালয়েশিয়া ইমিগ্রেশন । আর যাদের ফিরতি এয়ার টিকেট নেই তাদের কে পাঠানো হচ্ছে জেলে। আমি যখন ইমিগ্রেশন কাউন্টারের লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলাম, দূর থেকে আসপাশের কাউন্টারে তাকিয়ে দেখছিলাম অনেক বাঙ্গালী পাসপোর্টধারীদের, ইমিগ্রেশন কাউন্টার থেকে রিজেক্ট করে ইমিগ্রেশন প্রধান অফিসে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে জিজ্ঞাসাবাদের জন্যে ।

ইমিগ্রেশন প্রধান অফিসে নিয়ে যাওয়া মানেই আপনি আর প্রবেশ করতে পারছেন না মালয়েশিয়ায়। লাইনে আমি যখন সামনে আসলাম, দেখতে পেলাম আমার পাশের লাইনের কাউন্টারের সামনে এক বাঙ্গালী স্বামী-স্ত্রী দাঁড়িয়ে আছেন অনেকক্ষন। অনেক জিজ্ঞাসাবাদের পর তাদেরকেও এখান থেকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় প্রধান ইমিগ্রেশনে।

এবার আমার পালা । এক ইমিগ্রেশন মহিলা অফিসরকে পাসপোর্ট জমা দিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে রইলাম । পাসপোর্ট চেক করে তিনি কিছুক্ষন পর আমাকে ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করলেন, আমি কেন আসছি মালয়েশিয়ায়। আমিও জবাব দিলাম আমি এখানে ২ টা ম্যারাথনে অংশগ্রহন করার জন্যে এসেছি, ম্যারাথন শেষে আমি ঘুরে আবার দেশে ব্যাক করব । আমি আমার ম্যারাথন রেজিস্ট্রেশন পেপারস ইমিগ্রেশন অফিসারকে দেখালাম। আবার জিজ্ঞেস করলেন কোথায় থাকব কতদিন থাকব এবং হোটেল বুকিং আছে কিনা । আমি তাকে হোটেল বুকিং এর পেপারস দেখালাম ।

এবার আমার কাছে আবার জানতে চাইল আমি যে ইভেন্টে অংশগ্রহন করতে করতে যাচ্ছি সেখানের কারো ফোন নাম্বার আছে কি না ? আমি জনালাম আছে এবং আমার সাথে হোয়াটস এপে অর্গানাইজারদের সাথে চ্যাটিং হয়েছে সেই ডকুমেন্টস ও আমার সাথে মোবাইলে আছে । ইমিগ্রেশন অফিসার আর কিছু দেখতে না চেয়ে আমাকে সাথে সাথে এন্ট্রি পাশ দিয়ে দেয় । এবার হাফ ছেড়ে ইমিগ্রেশন ক্রস করে এয়ারপোর্টের বাহিরে এসে গ্রাব কল দিয়ে সোজা চলে আসলাম সেটিয়া ওয়াক আমার হোটেল রুমে ।

কিছুটা জটিল মনে হলেও ভয় পাওয়ার কিছু নেই, মালয়েশিয়া ইমিগ্রেশন যতই কঠিন হউক না কেন ইমিগ্রেশন অফিসারকে বিট করার জন্যে আপনার সাথে যদি পর্যাপ্ত লিগ্যাল ডকুমেন্টস থাকে তবে আপনি ইমিগ্রেশন এন্ট্রি পাস পেয়ে যাবেন । সেই সাথে নিজের মধ্যে আত্মবিশ্বাস এবং কথা বলার জন্য সাহস থাকতে হবে । মালয়েশিয়ানরা খুব বেশি যে ইংরেজিতে কথা বলতে দক্ষ, এমন নয় । আপনি মোটামুটি ইংরেজিতে কথা বলতে পারলেই হবে ।

মালয়েশিয়া ইমিগ্রেশন সহজে পাশ পেতে যে সকল ডকুমেন্টস সাথে রখাবেন-

-হোটেল বুকিং
-রিটার্ন এয়ার টিকেট
-ভিজিটিং/আইডি কার্ড
-এনআইডি মূল কপি
-চাকুরীজিবী হলে অফিসিয়াল লিভ লেটার
-অনলাইন ডলার এন্ড্রসমেন্ট এর কপি
– আমন্ত্রনপত্র থাকলে থাকলে তার কপি এবং ফোন নাম্বার
– যাওয়া থেকে আসা পর্যন্ত একটা লিখিত ট্যুর প্লেন

আশা করছি আমার ব্যাক্ত অভিজ্ঞতা আপনাদের মালয়েশিয়া ভ্রমনে যেতে কিছুটা হলেও সহজ করে তুলবে ।

আর এ ইহসান, সহকারী প্রযোজক, নাগরিক টিভি

প্রবাসীদের সব খবর জানতে; প্রবাস কথার ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.