Featured আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র

মহান বিজয় দিবস; জাতির সর্বোচ্চ গৌরবময় দিন

শেয়ার করুন

সেই বহুদিন পূর্বে মরহুম দাদার মুখে শুনেছিলাম ১৯৭১ সালে বিজয়ের নানা রকম গল্প। এরপর বাবার মুখে শুনেছি যুদ্ধের অজস্র কাহিনী। পাকিস্তানী বর্বরদের অত্যাচারে তখন পুরো দেশ শাসন, শোষণ, এবং নির্যাতনের নির্মম শিকার। জীবনের শেষ রক্ত বিন্দু দিয়ে ৩০ লক্ষ শহীদ প্রাণ দিয়েছিলেন এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে এবং দুই লক্ষ মা-বোন সম্ভ্রম হারিয়েছেন।

একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর বর্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীরা আত্মসমর্পন বা পরাজয় স্বীকার করার মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করে বাংলাদেশ। বাঙালি জাতির জীবনে এই দিনটি হচ্ছে সর্বোচ্চ গৌরবমাখা একটি অবিস্মরণীয় দিন। যতদিন পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশ থাকবে, ততদিন বাঙালি জাতি এই দিনটির গুরুত্ব ও সম্মান অক্ষুন্ন রাখবে কারণ এই ১৬ ডিসেম্বর বাঙালি জাতির গৌরবময় ইতিহাস, লড়াই-সংগ্রামের ইতিহাস, এবং আত্মত্যাগের ইতিহাস।

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ’র দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান নামক একটি অসম রাষ্ট্রকে বাঙালির ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। শুরু হয় পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণ, নির্যাতন। দিনের পর দিন বাঙালির ওপর অত্যাচার নির্যাতন ও শোষণ চালাতে থাকে পাকিস্তানি বর্বর শাসক গোষ্ঠী।

এই শাসন-শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে বাঙালি একে একে গড়ে তোলে আন্দোলন-সংগ্রাম। বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন, ৫৪ এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ৬২ এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬ দফা, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ৭০ এর নির্বাচনে বিজয় লাভের মধ্য দিয়ে বাঙালি চূড়ান্ত বিজয়ের লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হতে থাকে।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের কারণে বাঙালির যে তীব্র আন্দোলন শুরু হয় সেটি ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত রূপ নেয়। যার চূড়ান্ত ফলাফল আসে মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মধ্য দিয়ে।

পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্নকে ভেঙে চুরমার করে দিতে শুরু করে বর্বর গণহত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ, শহরের পর শহর, গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেয় পাকিস্তানী হানাদাররা।

বাংলাদেশ রূপ নেয় এক বিশাল ধ্বংস স্তুপে। তৎকালীন পাকিস্তানী সেনাবাহীনির বিরুদ্ধে এবং ওদের আধুনিক অস্ত্র-সস্ত্রে সজ্জিত দেখে ও বুকে অদম্য সাহস ও জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করে এদেশের কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, যুব, নারীসহ সব শ্রেণী-পেশার সর্বস্তরের বাঙালি।

বাঙালি জাতির আমরণ যুদ্ধ এবং দুর্বার অবরোধের মুখে পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা পরাজয়ের শেষ পর্যায় বুঝতে পেরে বিজয়ের দুই দিন আগে জাতির সূর্য সন্তান বুদ্ধিজীবীদের বেছে বেছে হত্যা করে যেখানে এদেরকে হত্যা করতে সরাসরি সহযোগিতায় অংশ নেয় এ দেশীয় রাজাকার, আল বদর, আল সামস বাহিনী ও শন্তি কমিটির সদস্যরা।

অবশেষে বাঙালির দুর্বার বাধা এবং আন্দোলনের মুখে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনীর কাছে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে। এর মধ্য দিয়েই বিশ্ব মানচিত্রে স্থান পায় নতুন স্বাধীন দেশ বাংলাদেশ।

আজ বাংলাদেশের প্রতি পাড়ায় পাড়ায়, মহল্লায় মহল্লায়, শহর গ্রামের আনাচে কানাচে এই বিজয় দিবস উপলক্ষে শিশু কিশোররা লাল সবুজের পতাকা নিয়ে আনন্দ উল্লাসে মেতে উঠেছে। মেতে উঠবেই না কেন? জাতির সর্বোচ্চ গৌরবময় দিনে বিজয়ের স্বাদ কে না উদযাপন করতে চায় বলুন?

তাই বাংলাদেশ আজ বিজয়ের উৎসবে মুখর। বিজয়ের হাত ধরেই বাংলাদেশে শান্তি এবং শৃঙ্খলা ফিরে আসুক। রণাঙ্গণে আর নয়, কাঁধে কাঁধ রেখে, বুকে বুক মিলিয়ে, এক টুকরো ভালোবাসা দিয়ে আসুন না, লাল সবুজ বাংলাদেশের এই বিজয় দিবসে সবাই এক হয়ে আবার নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করি। ঘৃণা নয়, ভালোবাসা দিয়ে জয় করি আমাদের বিজয়ের উল্লাস।

  • গোলাম মাহমুদ মামুন, ভার্জিনিয়া, যুক্তরাষ্ট্র
শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.