Featured অন্যান্য এশিয়া ভ্রমণ

ভ্রমণের গল্প; পংকজ রায় মনে গেঁথে রইলো

শেয়ার করুন

ভোর ৭টা, ভুটানের ফুয়েন্টসোলিং থেকে বের হয়ে জয়গা থেকে সাড়ে ৭ টায় শিলিগুড়ির সরকারী বাস ধরতে হবে, গন্তব্য দার্জিলিং। সবাই হোটেল এর বাইরে অপেক্ষায় আছি। সময় অনুযায়ী ২২ সিটের একখানা ছোট্ট বাস আসলো। আমরা ১৮ জনের টিম উঠে পরলাম হুড়মুড় করে।

সবাই সবচেয়ে ভালো সীট চায়। কিন্তু সুপারভাইজার সাহেব ভালো সীট ৪ টা রেখে দিলেন। বললেন- এগুলো সরকারি বাস, সরকারি লোক উঠবে সামনে থেকে। যাই হোক আমার সাথে আব্বু থাকাতে আমরা ২টা ভাল সীটই পেলাম। ওহ, আগে আপনাদের পরিচয় করিয়ে  দেই সেই সুপারভাইজার সাহেবের নাম হচ্ছে পংকজ রায়।

বাস চলতে শুরু করলো, ২-৩ মিনিট চলার পরে বাস থামলো, কি কাহিনী জানতে চাইলে পি.রায় বললেন- দিদিভাই, একটু চা খেতে হবে, আপনারাও খেতে পারেন, সবাই নেমে চা খেলাম। তারপর আবার একটু সামনে যেতেই বাস থামিয়ে পংকজ রায় লাপাত্তা, অনেকক্ষণ পরে দেখি তিনি রাস্তার ঐ পাড় থেকে এক ম্যাডামের ল্যাগেজ নিয়ে রাস্তা পাড় হয়ে সুন্দর মতো ওনাকে সেট করে দিলেন।

ভাবখানা দেখে মনে হলো, ওনার নিজের গাড়ীতে বাসার কাউকে তুলে নিলেন৷ বাস আবারো চলতে শুরু করলো৷ তারপর আরো দু’তিন জনকে এইভাবে তুললেন বাসে৷ জয়গা পাড় হবার পরে পি.রায় বকবক শুরু করলো। আমাদের ট্রাভেল এজেন্ট ঠিকভাবে তার সাথে যোগাযোগ করেনি।

তারপর আমি লক্ষ্য করা শুরু করলাম ওনাকে, কারন এতো জোরে শব্দ করে কথা বলছেন, মাইকও মনে হয় তার কাছে ফেইল। এটা করেন, সেটা করেন, আমি জানতে চাইলাম দাদা আমরা কয়টায় দার্জিলিং পৌছাবো? ওরে আল্লাহ, আর যাই কই, শুরু হলো ওনার প্যানপ্যানানি। “বুঝলে দিদিভাই, এটা হলো সরকারি বাস, জয়গা থেকে শিলিগুড়ি যায়, কিন্তু তোমাদের জন্য দার্জিলিং যেতে হবে, শিলিগুড়ি টাচ না করে ভিন্ন রাস্তা দিয়ে যাবো আমরা…”  অনেক প্যাকপ্যাক এরপর আমার উত্তর পেলাম, বললো- দুপুর দূ’টা বাজবে৷ মাথায় তখন বাঁশ কারন যে সীট সবারই বসতে অসুবিধা হচ্ছিল৷

অনেক বিরক্ত লাগছিল, পরে ভাবলাম বেটার সাথে কথা বইলা একটু স্বাভাবিক হই৷ নাম, বাড়ি কই জানতে চাইলে তার দুঃখ ভেসে উঠলো। মাসে নাকি ৪ দিন বাড়ি থাকে, বাকি ২৬ দিন একটানা ডিউটি করেন গত ২২ বছর যাবৎ।

আমি ওনার হাতে একটা ছোট্ট ব্যাগ দেখছিলাম, যেভাবে ধরেছিলো, ভাবলাম সোনা গয়না না জানি কি, পরে দেখলাম বাসের টিকিট আর কলম রাখা ওটাতে, কিন্তু উনি যক্ষের ধনের মতো হাতের নিচে আগলে রেখেছেন।

হুট করেই আবারো চিৎকার শুর করলো, আমি ভাবলাম কি হলো? পরে শুনি ওনার একখানা ৩ রুপির কলম খুঁজে পাচ্ছেন না, মাত্র ১৭ দিন আগেই কিনেছেন নাকি। মহা টেনশনে সে বাসের ভেতরে শুয়ে মেঝেতেও খুঁজল৷ নাহ, কোন ভাবেই সে না পেয়ে আমরা যেখানে নাস্তার জন্য দাড়িয়েছিলাম, সেই রেস্টুরেন্টে এ কল দিল কাকে যেন বললো, “তোমাদের ৩ নম্বর টেবিলে একখানা কলম ফেলে এসেছি কিনা দেখো, পেলে রেখে দিও, ফেরার সময় নিয়ে নেবো।” সারাক্ষন তার এসব কর্মকাণ্ড নিয়েই ব্যস্ত থাকলেন তিনি৷ কখনো মনোযোগ দিয়ে টিকিট এমনভাবে কাউন্ট করছিলেন যেন একেকটা ২ হাজার রুপির নোট।

মাঝে একবার তিনি আমায় বাংলাদেশ এর রোড এর ব্যাপারে জানতে চাইলে, আর যাই কই, আমিও চান্স পেয়ে শুরু করলাম। আমাদের দেশের রাস্তাঘাট আপনাদের থেকে অনেক উন্নত। কারন যখন কোথাও যাবেন বিশেষ করে হাইওয়েতে কাছাকাছি শহর কতো কি.মি. বাকি সেটা লেখা থাকে পাশে৷

তিনি অবাক হলেন, কিন্তু ওনার ইন্ডিয়া উত্তম এটা থেকে বেড় হলেন না৷ আমি আরো কিছু উদাহরন দিয়ে ওনার মেজাজটাই বিগরে দিলাম৷ তারপর দেখি সে চুপ। মনে হলো বাকি পথটুকু ভালোভাবে যাওয়া যাবে, যাক সেই যাত্রায় তার চিৎকার থেকে বেঁচে গেলাম।

কিন্তু তাকে মনে পরে, কারন আমাকে গান শুনতে দেয় নি, যেটা ভ্রমণে আমার প্রিয় শখ৷  আসলে একেকটি ভ্রমন থেকে একেকটি মজার অভিজ্ঞতা নিয়ে আসি৷ পংকজ রায় মনে গেঁথে রইলো আমার। চুরি করে ওনার আর ওনার সেই যক্ষের ধনের কয়েকটি ছবি তুলেছিলাম৷

  • মারিয়াম সুলতানা তানফা, ঢাকা।
শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.