Featured আমেরিকা ভ্রমণ যুক্তরাষ্ট্র

ভ্রমণের গল্পে জীবনের গল্প; কনি আইল্যান্ড পর্ব- ০১

সাত সমুদ্র তের নদী পেরিয়ে আমেরিকায় আসা। সারারাত কাজ করার পর ক্লান্ত দেহ লুটিয়ে পড়তো বিছানায়। এভাবে সপ্তাহে টানা ছয় দিন এবং দিনে বারো ঘন্টা করে প্রতিদিন কাজ করে হাঁফিয়ে উঠতাম। এরই মাঝে তখন আমেরিকার নতুন নতুন জায়গা গুলো ঘুরে দেখার ছিল প্রবল নেশা।

প্রচন্ড শীতে একদিন সারারাত কাজ শেষ করেই বেরিয়ে পড়লাম। চিন্তা করলাম আজ আর ঘরে ফিরে যাবো না, চোখে যতই ঘুম থাকুক। যেদিন ছুটি থাকতো সেদিন মনে হত ঈদের দিন। সারাদিন ঘুরে প্রচন্ড রকম ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরতাম। তো একা একা প্রথম ঘুরতে গেলাম।

কাজের জায়গা ছিল ম্যানহাটান, ইউনিয়ন স্কয়ার ১৪ নাম্বার স্ট্রিট। রাত ৮.০০ টা থেকে সকাল ৮.০০টা পর্যন্ত কাজ শেষ করে এল ট্রেন নিয়ে দুই স্টপেজ গিয়ে নেমে, ব্ৰুকলিন বাউন্ড এফ ট্রেন নিলাম। ট্রেনে বসা মাত্রই চোখে ঘুম নামলো। প্রায় ঘন্টাখানেক ঘুমে ঘুমে পৌঁছে গেলাম কনি আইল্যান্ড। যদিও ট্রেনের শেষ স্টপেজ থাকায় বেঁচে গেছি।

ট্রেন অপারেটর এসে গুঁতো মেরে জাগিয়ে বললো, ‘ব্রো, দিস ইজ ইউর লাস্ট স্টপ’ আচমকা ঘুম ভাঙার সাথে সাথে ঘুমন্ত অবস্থায় ট্রেনের বাইরে গিয়ে দ্রুত দাঁড়ালাম। দুই চোখে প্রচন্ড ঘুম, মিনিটের মত বিরতি নিয়ে সাইন গুলো দেখে হাটতে লাগলাম। কিছুদূর গিয়েই দেখি কফি শপ। এক কাপ কপি নিয়েই চুমুক দিতে দিতে এগিয়ে চললাম।

সময় সকাল ৯.৩০, ওহ হ্যাঁ বলে রাখি, কনি আইল্যান্ড হচ্ছে ব্ৰুকলিনের একটা জায়গা, যেখানে হাজার হাজার মানুষ সমুদ্র স্নানে আসে। আমি তখনো জানতামই না যে মানুষ জন সমুদ্র স্নানে আসে পড়ন্ত বিকেলে। আরো সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে তখন ছিল শীতকাল, সমুদ্রে মানুষ তো দূরের কথা একটা মাছিও খুঁজে পাওয়া যাবে না।

যাই হোক সমুদ্রের সুবিশাল ট্রেইল ধরে প্রচন্ড ঠান্ডায় একা একা হাঁটছি এবং নিজের একা একা ছবি তুলছি। ঠিক সামনে এগিয়ে যেতেই দেখি, একজন বয়স্ক মহিলা একটা কুকুর নিয়ে আমার দিকেই আসছে। প্রথমত বলে রাখি, কুকুর দেখলেই শরীরের ভিতর কেমন যেন অনুভব হতে শুরু করলো। তারপরও আমি সামনের দিকে হেঁটে যাচ্ছি। হঠাৎ ভদ্র মহিলা একটি মুচকি হাসি দিয়ে বলে উঠলো ‘গুড মর্নিং’, প্রতিউত্তরে আমি বললাম ‘গুড মর্নিং’।

ভদ্র মহিলা আমার কাছে এসেই বললো, তোমার কয়েকটা ছবি তুলে দিবো। এই কথা শুনেই আমার ঘুমন্ত চোখ ফের জেগে উঠে বললো, অবশ্যই। আমিতো ভেবেছিলাম এখানে কাউকে না কাউকে পাবো, কিন্তু ঠান্ডায় যে কেউ সমুদ্র স্নানে আসে না সেটা খেয়াল ছিল না এবং আমার আজকে যেহেতু ছুটির দিন তাই ভাবলাম জায়গাটা দেখে যাই। তাই ঘুরতে আসা।

ভদ্র মহিলা আমার অনেকগুলো ছবি তুলে দিলেন তার কুকুরটাকে এক পাশে বসিয়ে রেখে। শেষ পর্যন্ত ওর কুকুরের সাথেও একটা ছবি তুলতে বললো। মহিলার কথা আর ফেলতে পারিনি। কুকুরটা ভদ্র ছিল বিধায় বেঁচে গেছি, তা না হলে এক টুকরো ততক্ষনে নিয়েই নিত। প্রায় ঘন্টা খানেকের মত কনি আইল্যান্ড একা একা ঘুরলাম। প্রচন্ড ঠান্ডায় সমুদ্রের গর্জন উপভোগ করলাম, মন ভরে গায়ে ঠান্ডা বাতাসের স্পর্শ লাগিয়ে ঠিক সমুদ্রের সামনে গিয়ে কিছুক্ষন বসলাম।

আনমনে দু’চোখ থেকে হঠাৎ করে অশ্রু বেরিয়ে পড়লো। হঠাৎ পরিবারের মানুষগুলোর কথা মনে পড়ে গেল। স্মৃতিগুলোর সাথে সাথে ঠান্ডা বাতাসে চোখের কোণে পানি টলমল করতে লাগলো। দুটোই পানিতে মিশে একাকার। এই বিদেশ অনেক কষ্টের। এই বিদেশে মা নেই, এই বিদেশে ভাই-বোন নেই, এই বিদেশে সমুদ্রের সামনে বসে গল্প শেয়ার করার কোন মানুষ নেই। এখানে শুধু আমি একা। হ্যা আমরা সবাই যার যার জায়গায় বড্ড বেশি একা।

অতিরিক্ত ঠান্ডায় আর কোন কিছু না ভেবেই ক্লান্ত দেহ বাসার পথে ছুটে চলছে। আবারো এফ ট্রেনে বসে কিছুদূর যেতে না যেতেই দু’চোখ বেয়ে ঘুম নেমে আসলো। টানা দুই ঘন্টার ট্রেন ভ্রমণ শেষে বাসায় ফিরলাম প্রায় দুপুর ১ টায়। কোন রকমে হালকা নাস্তা খেয়ে আবার বিছানায় লুটিয়ে পড়া। আর সেই ঘুম ভাঙলো আমার রাত ১ টায়।

চারদিকে সবাই রাতের নির্জনতায় ঘুমে বিভোর, এবং আমার সময় হলো দুপুরের খাবার রাত ১ টায় খাওয়া। এইতো জীবন। এভাবেই ঘুমে ঘুমে ভ্রমণের অনেক গল্পের ইতি হয়েছে। তবু ও ঘুরে বেড়াতে চেয়েছি যতদূর পর্যন্ত ক্লান্ত শরীর আমাকে নিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।

কনি আইল্যান্ডে অনেক রাইড আছে, যেগুলোতে চড়ে সবাই বিনোদন নিতে পারে। দুঃখের বিষয় হল আমি যেই সময় ভ্রমণ করেছি, সেটি তখন বন্ধ ছিল। এইভাবেই ভ্রমন কাহিনী গুলো গল্প হয়ে যায়। মজার ব্যাপার হচ্ছে, তখনকার ছবিগুলো কাকার দোকানে প্রিন্ট করানোর জন্য দিয়েছিলাম।

কাকা আমার নাম দেখে কুকুরের সাথে ছবি দেখে দেশে ফোন দিয়ে হাসতে হাসতে বলে, ‘এগুনে তো আগান বাগান, গাছ গাছালি, কুত্তা বিলাই কিছু বাদ রাখে নাই, হেগুন বেগ্গুনেরে লই ছবি তুলছে’, আমরা দোকানের ভিতর হাসতে হাসতে শেষ। এখানেই কনি আইল্যান্ড ভ্রমণের সমাপ্তি টানছি, আগামী পর্বে আসবে অন্য কোন লোকেশনের গল্প। ততক্ষন পর্যন্ত সবাই ভালো থাকবেন।

  • গোলাম মাহমুদ মামুন, ভার্জিনিয়া, যুক্তরাষ্ট্র 

আরও পড়ুন- ইতালীতে একটি বিয়ে ও হৃদয় গভীরে প্রবাস কথা

প্রবাসীদের সব খবর জানতে; প্রবাস কথার ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.