Featured আমেরিকা ভ্রমণ যুক্তরাষ্ট্র

ভ্রমণের গল্পে জীবনের গল্প; জ্যাকসন হাইটস নিউইয়র্ক, পর্ব- ০৫

গত পর্বে আপনাদেরকে বলেছিলাম ১৬৯স্ট্রিটকে দ্বিতীয় বাংলাদেশ হিসেবে ধরা হয় কিন্তু এই ১৬৯ স্ট্রিট এর পূর্বে যে এলাকাটি বাঙালিদের ঐতিহ্য, মিলনমেলা এবং বাংলাদেশী এলাকা হিসেবে পুরো নিউ ইয়র্ক জুড়ে ব্যাপক পরিচিত, সেটা হচ্ছে নিউ ইয়র্ক স্টেটের ৭৪ নাম্বার স্ট্রিট বা রুজভেল্ট এভিনিউতে অবস্থিতজ্যাকসন হাইটসএলাকাটি

কি আছে এখানে

আসলে প্রশ্নটা হওয়া উচিত ছিল কি নেই এখানে? খাবার থেকে শুরু করে ব্যবসা বাণিজ্য, মিষ্টির দোকান থেকে শুরু করে ফলের বাণিজ্য, স্বর্ণের দোকান থেকে শুরু করে কাপড়ের বাণিজ্য, বন্ধু বান্ধবের মিলনমেলা থেকে আড্ডাবাজি চলে গভীর রাত পর্যন্ত। সাধারণ জনগণ, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, রাজনীতিবিদ, অভিনেতা, অভিনেত্রী, ব্যবসায়ীদের এবং দেশীয় যত টুরিস্ট আসে তাদের মিলনমেলার সবচেয়ে পরিচিত জায়গা হচ্ছে জ্যাকসন হাইটস

জেনে নেয়া যাক রেস্টুরেন্ট এবং সুপারমার্কেট গুলোর নাম

এই এলাকায় আছে বাঙালিদের অতি পরিচিত হাটবাজার রেস্টুরেন্ট, ঢাকা গার্ডেন, ইত্যাদি গার্ডেন এন্ড গ্রিল, খাবার বাড়ি, প্রিমিয়াম সুইটস, মেরিট কাবাব, কাবাব কিং, আব্দুল্লাহ সুইটস, রুমাস কিচেন, তিতাস সুপারমার্কেট, মান্নান সুপারমার্কেট, খামার বাড়ি, সাগর চাইনিজ, বৈশাখী এবং আপনাবাজারসহ নানান ধরণের খাবারের রেস্টুরেন্ট এবং সুপারমার্কেট

স্বর্ণ এবং কাপড়ের দোকান 

৭৩ স্ট্রিটটা হচ্ছে স্বর্ণের জন্য বিখ্যাত রাস্তা। এখান আছে সোনা চান্দি, কুনাল জুয়েলার্স, জুয়েলার্স এম্পোরিয়াম, কুইন্স ডায়মন্ড এন্ড জুয়েলারি, ওমর জুয়েলার্স, দ্য নিউ ইয়র্ক গোল্ড, রাজ্ জুয়েলার্স অফ লন্ডন, মিতা জুয়েলার্স, এবং অলংকার জুয়েলার্সসহ আরো অনেক দোকান। কাপড়ের দোকানের মধ্যে আছে আড়ং, পিরান ফ্যাশন, সাদা কালো, কারিশমা, জারিফ ফ্যাশন, ইন্ডিয়া শাড়ি প্যালেস সহ নানান ধরণের কাপড়ের দোকান

কোন যানবাহনে এখানে আসলে ভালো হয়?

যদি কেউ এই এলাকায় ভ্রমণে আসেন তাহলে আমি সাজেস্ট করবো আপনারা সাবওয়ে ট্রেন কিংবা উবার নিয়ে এখানে আসতে পারেন। মানুষ গাড়ি নিয়েও আসে তবে সমস্যা হচ্ছে এই এলাকায় পার্কিং পাওয়া। এখানে পার্কিং পাওয়া মানে হচ্ছে আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়া, তা না হলে মোটামুটি আপনাকে অনেকক্ষণ পার্কিং এর জন্য ঘুরতে হবে

আর যদি গাড়ি নিয়ে এসে কয়েক ব্লক দূরে পার্কিং করে হাঁটার প্ল্যান থাকে তাহলে সেটাও করতে পারেন কিন্তু ৭৩ এবং ৭৪ স্ট্রিটে পার্কিং পাওয়া অনেক কষ্টের। আমি আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। কয়েকবারই আমি ঘন্টা খানেকের মত ঘুরে অনেক দূরে পার্কিং করে এসেছি। তার উপরে আছে প্রতি ঘন্টায় পেমেন্ট। যদিও এখন জোন নাম্বার দেয়াতে মানুষকে দৌঁড়াতে হয় না। ফোনের অ্যাপ ডাউনলোড করে জোন নাম্বর দিয়েই মিটার পার্কিং করতে পারেন

এখানে সর্বোত্তম যাতায়াত ব্যবস্থা ট্রেন। আপনি ট্রেনে করে এসে যতক্ষণ ইচ্ছে ঘুরতে পারবেন। মিটার পার্কিংয়ের কোন টেনশন নেই। এইখানে মোটামুটি অনেকগুলো ট্রেনের স্টপেজ। যার মধ্যে আছে, এফ ট্রেন, ট্রেন, এম ট্রেন, ট্রেন, এবং নাম্বার ট্রেন। বাসও আছে অনেকগুলো, বিভিন্ন লোকেশন থেকে বাস গুলো আসে এই জ্যাকসন হাইটে যার মধ্যে আছে কিউ ৪৯, এবং কিউ ৫৩এসবিএস

আমি এই এলাকার পাশে দেড় বছরের মত ছিলাম, জায়গাটি হচ্ছে নর্থার্ন বুলবার্ড। জ্যাকসন হাইটস থেকে হেঁটে গেলে ১৫ মিনিটের রাস্তা। এমন কোন দিন পাওয়া যাবে না এই এলাকা দিয়ে হেঁটে যাবার সময় আমি এক কাপ চা হাতে নিয়ে যাই নি। অনেক সময় ম্যানহাটানে কাজ করতে গেলে হাট বাজার কিংবা কাবাব কিং থেকে এক কাপ চা চুমুক দিতে দিতে একটি ফ্রি পত্রিকা হাতে নিয়ে ট্রেনে বসে দেশের খবরাখবর পড়তাম

সময়ের স্রোতে আজ সবকিছুই এখন স্মৃতি। নিউইয়র্ক যাওয়া হলেও এখন আর ওই জায়গায় তেমন যাওয়া হয় না। বিভিন্ন সময় ঈদ বা কোন প্রোগ্রাম থাকলে ওখানে যাওয়া হয়। অনেক বন্ধু বান্ধবরা থাকে জ্যাকসন হাইটে তবে বাংলাদেশের পুরো স্বাদ পেতে হলে আপনাকে একবার হলেও এই এলাকা ভ্রমণ করে যেতে হবে

হাটবাজার রেস্টুরেন্টের তৈরী করা নান রুটি দিয়ে হালিম এখনো মুখে লেগে আছে। প্রিমিয়াম সুইটসের মিষ্টির ঘ্রান এখনো বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে, কাবাব কিংয়ের চায়ের কথা মনে পড়লে এখনো মস্তিষ্ক এলোমেলো হয়ে যায়, কবীর বেকারির একটা পাউন্ড কেকের স্বাদ এখনো জিহ্বায় লেগে আছে এবং বন্ধুদের সাথে আড্ডাগুলো স্মৃতির মাঝে বারেবার দোলা দিয়ে যাচ্ছে। এই সমস্ত জায়গাগুলো আজীবন আমাকে জ্বালাবে কিন্তু বাস্তবতার কাছে আমরা হেরে যাই

সময় আমাদেরকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যায়, আর আমরা নতুন পরিবেশ পেয়ে পুরাতনকে স্মৃতির পাতায় ঝুলিয়ে সম্ভাবনার পথে দিগন্তের রেখা ধরে এগিয়ে যাই নতুন করে জীবনের কাব্য লিখতে।  আমি এখন সেই কাব্যের একজন লেখক হিসেবে আপনাদের সামনে তুলে ধরি ভ্রমণের গল্পগুলো। জানিনা না আপনাদের কেমন লাগছে? তবে আমি স্মৃতি গুলো মনে করেই কেমন যেন হুহু করে কেঁদে ফেলি। সময় তুমি আসলেই অনেক নিষ্ঠুর

  • গোলাম মাহমুদ মামুন, ভার্জিনিয়া, যুক্তরাষ্ট্র 

আরও পড়ুন- ভ্রমণের গল্পে জীবনের গল্প; ১৬৯ স্ট্রিট নিউইয়র্ক, পর্ব-০৪

প্রবাসীদের সব খবর জানতে; প্রবাস কথার ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.