Featured ভ্রমণ

ভ্রমণের গল্পে জীবনের গল্প; ১৬৯ স্ট্রিট নিউইয়র্ক, পর্ব-০৪

জ্যামাইকা, ১৬৯ স্ট্রিট হচ্ছে নিউ ইয়র্ক শহরের কয়েকটি এলাকার মধ্যে একটি অন্যতম ব্যস্ত এলাকা, যাকে আমরা দ্বিতীয় বাংলাদেশ নামে সম্ভোধন করি। রাস্তায় হাঁটলে আপনি টেরই পাবেন না, কারণ আপনি বাংলাদেশের গুলিস্তানে হাঁটছেন নাকি নিউ ইয়র্ক স্টেটের জ্যামাইকা সিটিতে হাঁটছেন। চারিদিকে বাংলাদেশীদের রাজত্ব।

আমেরিকান গল্পের ১৫ বছরের বিদেশ জীবনে মোটামুটি ৭ থেকে ৮ বছর আমার এই এলাকাতেই কেটেছে। কি নেই এখানে? খাবারের জন্য বিভিন্ন স্টেটে দেশি রেস্টুরেন্ট খুঁজে খুঁজে আপনি হয়তো হাঁপিয়ে উঠবেন, কিন্তু এই ১৬৯ স্ট্রিটে রেস্টুরেন্ট হাঁপিয়ে উঠবে আপনাকে খাবার দিতে দিতে, তারপরও খাবার শেষ হবে না। কয়েকটা রেস্টুরেন্টের নাম বলে রাখি, এখানে আছে সাগর, সাগর চাইনিজ, ঘরোয়া, পানশি, কাবাব কিং, কবির বেকারি, প্রিমিয়াম সুইটস, ঢাকা সুইটস এন্ড রেস্টুরেন্ট, আমেনা থাইসহ নানান রকমের রেস্তোরা।

দেশী গ্রোসারি করার জন্য আছে, মান্নান সুপার মার্কেট, প্রিমিয়াম, কাওরান বাজার, ফাতেমা গ্রোসারি, খামার বাড়িসহ আরো অনেক কিছু। মান্নানের পাশেই আছে বাংলাদেশী সেলুন দোকান ‘মেরি হেয়ার সেলুন’, আশে পাশে আছে অনেক বাংলাদেশী ডাক্তারের চেম্বার। ডাক্তার কাজী রশিদ, ডাঃ নাজমুল খান, ডাঃ বিল্লাহসহ অনেক বাংলাদেশী ডাক্তার, বাংলাদেশীরা বাদেও বিদেশীদেরকে প্রতিনিয়ত সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।

বিভিন্ন ধরণের ফার্মেসী, খান টিউটোরিয়ালস এবং ইন্ডিয়ান দোকান-পাটসহ আরো অনেক কিছু, দেশী জামা কাপড়ের জন্য আছে কয়েকটি দোকান, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, সাজনা, চাহাত, আল হামরা, এবং পরিণীতাসহ আরো অনেক দোকান, যেগুলোর নাম মনে আসছে না এই মুহূর্তে। এই স্ট্রিটে এমন কোন জিনিস নেই যা আপনি খুঁজলে পাবেন না।

মুসলিমদের ধর্মীয় চর্চার জন্য আছে জ্যামাইকার বিখ্যাত জামে মসজিদ যেটি ‘জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টার’ নামে পরিচিত। যদিও এখন প্রায় অনেকগুলো মসজিদ হিলসাইড এভিনিউতে গড়ে উঠেছে, তার মধ্যে একটি হচ্ছে দারুস সালাম মসজিদ যেটি প্রায় ১৪৪ নাম্বার স্ট্রিটে অবস্থিত।

এই ১৬৯ স্ট্রিটে কত শত স্মৃতি জড়িত যা লিখে শেষ করা যাবে না। এমনও দিন আছে যেদিন ঘরে কোন খাবার ছিল না, এই ১৬৯ এর রেস্তোরা থাকাতে প্রচন্ড ক্ষুধায় চিন্তিত হতে হয়নি। ক্রিকেট খেলা শেষ করে এসে সবাই একসাথে আড্ডা দিতাম।

ভাত, ভর্তা, ডিম বাজি, মাছ, গোশত যেন মুহূর্তেই গায়েব। সোনালী বিকেলে এক কাপ চা ছিল আড্ডা জমানোর একমাত্র হাতিয়ার। চা হলেই হল, কখনো ওই এক কাপ চা তিন চার জন মিলে খেতাম। ভাবছেন কিপ্টে তাই না, আসলে তা না, এটাতে এক ধরণের মজা আছে। ভাগাভাগি করে খেলে যে তৃপ্তি পাওয়া যায় সেটা অন্য কোথাও পাওয়া যাবে না।

এই রাস্তার অলিতে গলিতে অনেক স্মৃতি জমা। বাইরে খেলেই নাকি টাকা নষ্ট, তখন আমি স্টুডেন্ট ছিলাম। সারারাত কাজ করে যে পয়সা আয় করি তাতে বাসা ভাড়া, এই বিল সেই বিল, এবং খাওয়া দাওয়া করে মোটামুটি আমাদের দিন চলে যেত।

কিন্তু আমি জোর করেই আম্মা এবং আব্বাকে নিয়ে গেছিলাম রেস্টুরেন্টে। প্রায়ই ভাবি আমরা বন্ধু বান্ধবদের সাথে আড্ডা দিতে দিতে কত শত টাকা নষ্ট করি, আর মা-বাবাকে নিয়ে রেস্টরেন্টে বুঝি এক বেলা ভালো করে খেতে পারবো না। যেই কথা সেই কাজ, আম্মা এবং আব্বাকে জোর করে রেস্টুরেন্টে নিয়ে যাওয়া।

একমাত্র এই এলাকায় আমি আম্মাকে নিয়ে রেস্টুরেন্টে খেতে পেরেছিলাম। যদিও উনি বাইরে খেতেই নারাজ, তারপরও আমি উনাকে এই রেস্টুরেন্টগুলোর খাবার খাওয়াতে পেরেছি বলে আজো নিজেকে ধন্য মনে করি। আম্মা খাবার খেয়ে দেশীয় খাবারের স্বাদ অনুভব করলেন।

কোন খাবার যাতে অপচয় না হয় সেই জন্য পেট ভোরে গেছে শর্তেও খাবার খেয়েই যাচ্ছেন। বললাম- না পারলে থাক আর খেতে হবে না, আম্মা আমাকে বলে ‘এত টাকার জিনিস কি ফেলে দেয়ার জন্য কিনছিস’, আমি হাসতে হাসতে শেষ। এই রাস্তা ধরে আম্মা আমার সাথে দু হাত ধরে ধরে কত যে ডাক্তারের কাছে গিয়েছে।

আম্মা এবং আব্বাকে নিয়ে গ্রোসারি শপিং করতে গিয়েছি। মজার বিষয় হল এই রাস্তা থেকে আমার বাবা বাজার করে প্রতিদিন ঘরে আমার জন্য এটা সেটা রান্না করে রাখতেন যখন মা দেশে ছিলেন। কিন্তু যেদিন আম্মাকে নিয়ে গ্রোসারিতে যেতাম সেদিন আমাদের আর কোন কিছুই ভাবতে হত না কি লাগবে, কি লাগবে না। আম্মা খুশি মনেই সব কিছু কার্টে নিচ্ছে।

অনেক সময় বাজার বেশি নিয়ে আফসোস করে, অনেক বেশি জিনিস নিয়ে ফেলেছি দাঁড়া কিছু জিনিস রেখে আসি। আমি বললাম, না মা থাকুক না, আপনি পছন্দ করে বাজার করেছেন এতে আমিও অনেক খুশি। আর দুই একদিন বেশি বাজার করলে সমস্যা নেই।

আপনার খুশির চাইতে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি কি আছে? আজকে যত টাকারই বাজার হোক তা আজ ক্রেডিট কার্ডে ঘষতে এক বিন্ধুও খারাপ লাগবে না, বরং ওগুলোই আমি বুকের মাঝে স্মৃতি করে যত্ন করে গেঁথে রাখলাম। অন্তত মাঝে মাঝে নিজেকে বুঝ দিতে পারি, মায়ের মুখে একটি দিন হলেও হাসি ফুটাতে পেরেছি। ওটাই আমার জীবনের এক বিশাল প্রাপ্তি।

এই রাস্তায় ঠিক মত হাঁটা যায় না, একটু হাঁটলেই পরিচিত কারোর সাথে দেখা হয়ে যায়। তো আমার বিয়ের পর ফারিয়া এবং আমি মিলে কি জানি একটি জিনিস কিনতে বের হলাম। একটু পথ হাঁটতে না হাঁটতেই একেকজন ডাক দেয় ভাই কেমন আছেন? কুশল বিনিময় করার জন্য হলেও অন্তত দুই মিনিট ভদ্রতার সহিত কথা বলতে হয়।

ফারিয়া এই অবস্থা দেখে আমাকে বলে, ‘তুমি একটা কাজ করতে পারো, চাইলে এই রাস্তার জন্য এমপি ইলেকশন করতে পারো। তোমার যে জনপ্রিয়তা দেখছি, তাতে তো আজকে যে কাজ করার জন্য বের হয়েছি সেটা হবে কিনা সন্দেহ’, আমি হাসতে হাসতে ওকে বলি, দেখ এখানে ক্রিকেট খেলি যার কারণে অনেক ছেলে পেলের সাথে পরিচয়। যাও এখন থেকে সোজা আর কোথাও দাঁড়াবো না। এই বলেই সোজা গন্ত্যব্যে পৌছালাম।বিয়ের পর ফারিয়াসহ এই রাস্তায় মোটামুটি মাস চারেক এর মত সময় পেয়েছি ওকে নিয়ে ঘুরতে। এরপর চলে এলাম ভার্জিনিয়ায়।

তাই এখনো নিউ ইয়র্কে গেলে এই এলাকায় যদি না যাই তাহলে নিউ ইয়র্ক যাওয়াটাই পুরো বৃথা হয়ে যায়। এই এলাকায় যে পরিমান স্মৃতি আছে তা অন্য কোথাও আজো আছে কিনা সন্দেহ। ১৬৯ স্ট্রিট নিয়ে একটি কবিতা লিখেছিলাম অনেক আগে। সেটা ও আপনাদের জন্য তুলে ধরলাম।

১৬৯ স্ট্রিট

দেয়ালে বিকেলের রোদ উত্তপ্ত হিলসাইড প্রায় প্রতিদিনই মেলা
এমনও দিন যায় আড্ডা ছাড়া গল্পগুলো হারায় অবেলায়

ব্যস্ত নগর ব্যস্ততার ভিড়ে সময়ের টানাপোড়ন
কেউ রাতে কেউ দিনে কেউবা দিন রাত ভুলে আকাশের চাঁদ ধরতে আসেন

বঙ্গদেশের অলংকৃত পুরুষ এখানেই একই ছাদে
জোর করে গলা ছুড়ে ভাত গিলে ফেলেন এক সাথে

প্যান্টের ময়লা এখানে ফ্যাশন তাই বলে একটু শান্তি
কে বড়?কে ছোট? তুলনা নেই কারো চায় বাঁচার জন্য একটু স্বস্তি

ব্যঙ্গবিদ্রুপ এর কেউ পরোয়া করে না জীবনের পাল্লা এখানে সমান
কাদামাটি তাই ভুলে গেছে সবাই বাজায় এক হয়ে থাকার স্লোগান

কারো কারো কর্মব্যস্ততা শেষে যদি একটু অবসর মিলে যায়
লুটোপুটি করে আড্ডা জমায় ১৬৯ এর কোনো এক রেস্তোঁরায়

প্ল্যান হয় দুরে কোথাও সবাই মিলে উল্লাসে মেতে উঠার
একটি দিন যেন মুছে দিয়ে যায় যেদিনগুলো কাটালাম বিষন্নতায়

আইন আর কানুন এর কাছে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি
নতুন ভোরে খেটে খাওয়া মানুষের মত আবার কাজে দলাদলি

বন্ধু পেয়েছি যোগ্য অসীম এই ১৬৯ স্ট্রীটে
জীবনের তরে দূরে সরে গেলেও লালন করি এই বুকের মাঝে

ব্যস্ত সবাই তবুও দু’মিনিট করি অবলোকন
মানুষ আমরা যন্ত্র নই যে থাকবেনা কোনো বাঁধন

কাটালাম প্রায় নয় বছর ওই ১৬৯ এর অলি গলিতে
ভাবতেও পারিনি এত জনসমাগম যখন হেঁটেছি জনপথে

মিস করি এখন ওই জনস্রোত আর ওই ব্যস্ত নগরী
ধীরে ধীরে জীবন যাচ্ছে কেটে হয়ে এদিক ওদিক ফেরারী

পরিবারের সবার একই মোহনায় এই একটি কেন্দ্রস্থল
ডাক্তার, বাজার এবং আড্ডা এখানেই, মনে পড়লেই চোখে আসে জল

আবারও হয়তো কোন একদিন ঠাঁই হব
প্রতিনিয়ত আমি ভালবাসি আর ফিরে যেতে চাই ১৬৯ এর দুয়ারে

  • গোলাম মাহমুদ মামুন, ভার্জিনিয়া, যুক্তরাষ্ট্র 

আরও পড়ুন- ভ্রমণের গল্পে জীবনের গল্প; ‘নিউইয়র্ক সেন্ট্রাল পার্ক’ পর্ব- ০৩

প্রবাসীদের সব খবর জানতে; প্রবাস কথার ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.