Featured আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র

ভ্রমণের গল্পে জীবনের গল্প; ‘স্ট্যাচু অফ লিবার্টি’ পর্ব- ০২

দেশে থাকতে ‘স্ট্যাচু অফ লিবার্টি’ শুধু টেলিভিশনের পর্দায় দেখতে পেতাম। আরো দেখতে পেতাম যখন প্রতি বছর ক্যালেন্ডার গুলোর পরিবর্তন হত তখন। পৃথিবীর সব মানুষের দৃষ্টি ছিল এই জায়গার প্রতি। মুসলমানদের যেরকম জীবনে একবার হলেও হজ্ব করা দরকার, ঠিক তেমনি প্রতিটি মানুষকে দেখতাম এই স্ট্যাচু অফ লিবার্টি দেখার জন্য তাদের ব্যাকুলতা।

সময় গড়িয়ে যখন আমি নিউ ইয়র্কে আসলাম, ঠিক তখন থেকেই অনেক ছটফট করতাম এই জায়গা দেখার জন্য, কিন্তু এই শহর যে কি পরিমান ব্যস্ত তা এখানে না থাকলে বুঝাই যাবে না। কাকে নিয়ে দেখতে যাবো সেটাই ঠিক করতে পারছি না। চাচাতো এবং জেঠাতো ভাইদেরও কাজের সময় আলাদা। একেকজনের ছুটির দিনও একেকদিন। কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিনা।

হঠাৎ একদিন কাকার দোকানের ঠিক অপর দিকে আরেকটি দোকানে ইকবাল আঙ্কেল নামের এক ভদ্রলোক কাজ করতো। এক কথায় অতি ভালো মানুষ এবং আমাকে ভাতিজা বলেই সম্ভোধন করতেন। উনি চাচীকে সহসাই দেশ থেকে নিয়ে এসেছেন। তাই উনি ও ঘুরে বেড়ানোর জন্য লোক খুঁজছেন। প্রবাদে আছে আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়া, ঠিক তেমনি আমার ক্ষেত্রেও ঘটলো সেইরকম। কাকা এসেই বললো, ‘ভাতিজা চল তোকে নিয়ে স্ট্যাচু অফ লিবার্টি দেখে আসি’, এই কথা শুনার সাথে সাথেই রাজি হয়ে গেলাম।

দিনক্ষণ ঠিক করে আমি, উনার এক আপন ভাতিজা এবং উনি সহ উনার পরিবার মিলে মোট পাঁচ থেকে ছয় জন সবাই রওনা দিলাম। যতটুকু মনে পড়ছে, সম্ভবত এফ ট্রেন থেকে শিফট হয়ে ১ বা ৩ নাম্বার ট্রেন নিয়ে স্ট্যাটেন আইল্যান্ড এর দিকে যাত্রা। ওখানে নেমেই ফেরিতে উঠার জন্য টিকেট কাটতে হল। এক্সাক্টলি টিকেটের দাম কত ছিল ভুলেও গেছি, যদিও ইকবাল আঙ্কেল আমার টিকেটের টাকা পরিশোধ করে দিলেন।

ব্যস, ফেরিতে একটা সুন্দর জায়গা দেখে সবাই গিয়ে বসলাম। কিছুক্ষন পর ফেরি স্ট্যাচু অফ লিবার্টির উদ্দেশ্যে ছাড়ে। ফেরি এগিয়ে যাচ্ছে আর সবাই চারপাশ অবলোকনে ব্যস্ত। একদিকে পানির থৈ থৈ আওয়াজ, অন্যদিকে ফেরি থেকে একজন দিক নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন। মানুষজন ছবি এবং ভিডিও করতে ব্যস্ত। মৃদু হাওয়ায় সবার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।

কেউ কেউ পানীয় জাতীয় কিছু পান করছে। কপোত কপোতীরা খোশগল্পে মগ্ন। কেউবা আবার পরিবেশের কারণে অনেক রোমান্টিক হয়ে গেছে। আর আমি চারপাশের এসব দৃশ্য দেখতে দেখতে ভাবি, এই একটা ফেরিতে কত দেশের ট্যুরিস্ট ভ্রমণে যাচ্ছে।

অনেকের স্বপ্ন ছিল স্ট্যাচু অফ লিবার্টি দেখা, সেটা আজ পূর্ণতা পাচ্ছে। মাঝে মাঝে খুব লোভও হচ্ছিলো, যদি ওদের মত আমার পাশে কেউ একজন থাকতো তাহলে আমিও গল্প করতে করতে বুঝি এভাবেই স্বপ্নগুলোর বাস্তবে রূপ দিতে পারতাম, তাহলে ভালোলাগা গুলো আরো একধাপ উপরে চলে যেত। ধূর কি ভাবছি? আঙ্কেলদের সাথে যাচ্ছি এটাই বা কম কিসের। উনি অনেক মজার মানুষ, অনেক হাসাতে পারতেন।

যাই হোক অল্প কিছুক্ষণের মাঝেই আমরা স্ট্যাচু অফ লিবার্টিতে নামবো, এদিকে ফেরি থেকে ঘোষণা আসলো সবাই নিজেদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র দেখে শুনে ধীরে ধীরে লাইন ধরে নামতে থাকুন। অবশেষে আমি তখন স্ট্যাচু অফ লিবার্টির পায়ের নিচে। চারিদিকে সবুজ ঘাসের অপরুপ সৌন্ধর্য্য, ওখানে দাঁড়িয়ে যেকোন দিকে দৃষ্টি দিলেই শুধু পানি এবং পানি। সবাই মিলে অনেক ঘুরাঘুরি করার পর বেলা ১ টার সময় দুপুরের খাবার খেতে বসলাম।

দূর্বা ঘাসের উপর বসে খাবার খাচ্ছি আর তখনি আমার স্কুলের সামনে ঘাসের উপর বন্ধুরা মিলে চা খাওয়ার কথা স্বরণ পড়লো। চাচী বাসা থেকে এত মজার বিরিয়ানি রান্না করে এনেছে যা ছিল অমৃত। বাসা থেকে খাবার নিয়ে আসার পিছনে কারণ ছিল, যদি ওখানে কোন খাবার না থাকে তখন যাবো কোথায়? যদিও অনেক খাবারের দোকান ছিল, কিন্তু তখনো বিদেশের খাবার কোনটা হালাল বা হারাম সেটাই জানা ছিল না। সেই জন্য বুদ্ধি করে খাবার নিয়ে আসা।

আপনাদের জানার সুবিধার্থে বলে রাখি, ফ্রান্স ২৮ অক্টোবর ১৮৮৬ সালে ‘স্ট্যাচু অফ লিবার্টি’কে বন্ধুত্বের স্বীকৃতি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে উপহার প্রদান করে। স্টাচু অফ লিবার্টিকে ফ্রিডম এবং ডেমোক্রেসির সিম্বল হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। ট্যুরিস্টরা চাইলে সিঁড়ি বেয়ে উঠে বেলকনি ব্যবহার করতে পারেন, এবং কেউ যদি ক্রাউন দেখতে চায় তাদেরকে অগ্রিম টিকেট কেটে আসতে হবে।

টিকেট খুবই সীমিত কারণ সিকিউরিটি এবং নিরাপত্তার খাতিরে। যদি স্ট্যাচু অফ লিবার্টি ভ্রমন করতে যান তাহলে স্ট্যাচু অফ লিবার্টি যাদুঘরও ভ্রমন করে আসতে পারেন। বাচ্চারা চাইলে নতুন জুনিয়র রেঞ্জার হতে পারে যখনি ভিসিট করতে যাবে ‘স্ট্যাচু অফ লিবার্টি’।

তো মোটামুটি দুপুর গড়িয়ে বিকেল, বিকেল হলেই আবার ঘরে ফেরা। অন্যরকম এক অনুভূতি। মনে হল আমি একটা সাগরের মাঝখানে দ্বীপে গিয়ে বসে আছি, যেখানে হাজারো দেশের নানান রকম মানুষের আনাগোনা। এক অন্যরকম ভালোলাগা। ইনশাআল্লাহ পরবর্তী পর্বে হয়তো অন্য কোন লোকেশন নিয়ে হাজির হব আপনাদের সামনে। ঠিক ততক্ষন পর্যন্ত সবাই সুস্থ থাকবেন সেই প্রত্যাশা।

  • গোলাম মাহমুদ মামুন, ভার্জিনিয়া, যুক্তরাষ্ট্র 

আরও পড়ুন- ভ্রমণের গল্পে জীবনের গল্প; কনি আইল্যান্ড পর্ব- ০১

প্রবাসীদের সব খবর জানতে; প্রবাস কথার ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.