Featured বাংলাদেশ থেকে

বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত

শেয়ার করুন

রবিবার দিবাগত রাত টায় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এর শেরে বাংলা হল থেকে আবরার ফাহাদ (২১) নামের এক শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার করা হয় এর আগে গতকাল রাত টায় আবরারকে নিজ কক্ষ থেকে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থী।

কি বলেছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা?

এই ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি,রবিবার আনুমানিক রাত আটটার দিকে ফাহাদকে শেরে বাংলা হলের ১০১১ নং রুম থেকে ২০১১ নং রুমে ডেকে নিয়ে যায় কয়েকজন শিক্ষার্থী। পরবর্তী সময়ে ছাত্রশিবিরের সাথে আবরারের সংশ্লিষ্টতার ‘প্রমাণ’ পাওয়া গেলে তাকে ক্রিকেট স্ট্যাম্প দিয়ে আঘাত করা হয় বলেও অভিযোগ করেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।

আবরার হত্যার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. মো. মাশুক এলাহী জানিয়েছেন, রবিবার দিবাগত রাত তিনটার দিকে খবর দেওয়া হলে তিনি হলে যান। এসময় আবরারকে সিঁড়িতে মৃত অবস্থায় দেখতে পান তিনি।

গণিতের খাতা ফেলেই ডাকে সাড়া দেন আবরার

কেন ছাত্রলীগের উপর অভিযোগ?

আবরারকে হলের ১০১১ নম্বর কক্ষ থেকে ডেকে ২০১১ নম্বর কক্ষ নিয়ে যায় কিছু শিক্ষার্থী। এই শিক্ষার্থীদের প্রত্যেকেই ছাত্র সংগঠন ‘ছাত্রলীগ’এর কর্মী ছিলেন।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে বুয়েট ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক আশিকুল ইসলাম বিটু সংবাদকর্মীদের বলেন,

“আবরারকে শিবির সন্দেহে রাত আটটার দিকে হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে আনা হয়। সেখানে আমরা তার মোবাইলে ফেসবুক ও মেসেঞ্জার চেক করি। ফেসবুকে বিতর্কিত কিছু পেইজে তার লাইক দেওয়ার প্রমাণ পাই। সে কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগও করেছে। শিবির সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাই।”

বিটু আরও বলেন,

“আবরারকে জিজ্ঞাসাবাদ করে বুয়েট ছাত্রলীগের উপ দপ্তর সম্পাদক ও কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মুজতবা রাফিদ, উপ-সমাজসেবা সম্পাদক ইফতি মোশাররফ সকাল, উপ-আইন সম্পাদক অমিত সাহা। পরবর্তীতে প্রমাণ পাওয়ার পরে চতুর্থ বর্ষের ভাইদের খবর দেওয়া হয়।”

তিনি আরো জানান,

“খবর পেয়ে বুয়েট ছাত্রলীগের ক্রীড়া সম্পাদক মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অনিক সরকার সেখানে আসেন। একপর্যায়ে আমি রুম থেকে বের হয়ে আসি। এরপর হয়তো ওরা মারধর করে থাকতে পারে। পরে আজ (৭ অক্টোবর) ভোররাত তিনটার দিকে শুনি আবরার মারা গেছে।”

১৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা

আবরার ফাহাদকে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ১৯ জনকে আসামি করে চকবাজার থানায় মামলা করা হয়েছে।

সোমবার (৭ অক্টোবর) মামলাটি করেন আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ। চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. সোহরাব হোসেন মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

মামলার পর পরই আবরার হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার সন্দেহে নয়জনকে আটক করেছে পুলিশ।

আটককৃতরা হলেন- বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদি হাসান রাসেল, সহসভাপতি মুস্তাকিম ফুয়াদ, সহসম্পাদক আশিকুল ইসলাম বিটু, উপদফতর সম্পাদক মুজতবা রাফিদ, উপসমাজ কল্যাণ সম্পাদক ইফতি মোশাররফ সকাল, উপআইন সম্পাদক অমিত সাহা, ক্রীড়া সম্পাদক সেফায়েতুল ইসলাম জিওন, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অনিক সরকার, গ্রন্থ ও গবেষণা সম্পাদক ইশতিয়াক মুন্সি।

আটকদের একজন

ছাত্রলীগ কি বলছে?

আবরার ফাহাদের হত্যার ঘটনায় আজ (৭ অক্টোবর) দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জয়। সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই এই হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানান তিনি।

জয় বলেন,

“ছাত্রলীগ কখনই অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়নি। বুয়েটের এ ঘটনায় যদি ছাত্রলীগের কোনো নেতা-কর্মী বিন্দুমাত্র জড়িত থাকে, অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অনুরোধ জানাবো, আপনারা সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করুন।”

ছাত্রলীগের সংবাদ সম্মেলন

তিনি আরও বলেন,

“কোনো অন্যায়কারীকে ছাত্রলীগ প্রশ্রয় দেয় না। ছাত্রলীগের প্রত্যেকটি নেতা-কর্মী অবশ্যই বঙ্গবন্ধুর আদর্শ মেনে চলবে। এ ঘটনায় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি ইয়াজ আল রিয়াদ ও সাধারণ সম্পাদক আসিফ তালুকদারকে নিয়ে ইতিমধ্যেই একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে তাদেরকে প্রতিবেদন জমা দিতে বলেছি।”

চিকিৎসকের মতে আবরারের মৃত্যুর কারণ

বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক। ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সোহেল মাহমুদ ময়নাতদন্তের পর আজ সোমবার দুপুর দুইটার দিকে এ কথা জানান।

সোহেল মাহমুদ বলেন,

ময়নাতদন্তে আবরারের দেহে জখমের অনেক চিহ্ন পাওয়া গেছে।

আবরার হত্যা ও প্রতিবাদ

আবরার হত্যার ঘটনা প্রকাশের পর পরই প্রতিবাদে ফেটে পড়ে ফেসবুকসহ সকল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা। শুধু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই নয়, এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে রাজপথে নেমে আসে শিক্ষার্থীরা।

আবরার হত্যার প্রতিবাদে বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রুয়েট, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রায় সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে আসে। বিক্ষোভ মিছিল, মশাল প্রজ্বলনসহ বিভিন্ন কর্মসূচী পালনের মাধ্যমে প্রতিবাদ করে তারা।

প্রতিবাদ মিছিল

বুয়েটের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী নিহত আবরার ফাহাদের গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে। নটরডেম কলেজের প্রাক্তন এই ছাত্র একই সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল এবং বুয়েটে চান্স পেলেও শেষ পর্যন্ত বেছে নেন বুয়েটকেই। বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের এই শিক্ষার্থীর হত্যার ঘটনায় থমকে গেছে পুরো দেশ।

  • সুমাইয়া হোসেন লিয়া, প্রবাস কথা, ঢাকা।

আরও পড়ুন- বহিষ্কার বুয়েটের ১১ ছাত্রলীগ নেতা

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.