Featured অন্যান্য ইউরোপ ভ্রমণ

বাল্টিক অঞ্চলের দেশ লাটভিয়া ভ্রমণ

শেয়ার করুন

ইউরোপে বাংলাদেশী একটি সংগঠনের কার্যকরি পরিষদের সভায় যোগ দেওয়ার জন্য রিগাতে যাওয়ার আমন্ত্রণ পাই। রিগা বাল্টিক অঞ্চলের দেশ লাটভিয়ার রাজধানী শহর। শুরুতে তেমন একটা আগ্রহ হলো না সেখানে যাওয়ার, কারন দেশটি সম্পর্কে তেমন জানাশোনা ছিল না যদিও এটি একটি ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং সেনজেন ভুক্ত দেশ।

আমি ইউরোপের আরেক দেশ পর্তুগালের রাজধানী শহর লিসবনে থাকি গত চার বছর ধরে। এসময়ে ইউরোপের ১০-১২ টি দেশ ভ্রমণের সুযোগ হলেও বাল্টিক অঞ্চলের কোন দেশে যাওয়া সুযোগ হয়নি তাই একটু আগ্রহ তৈরি হল। এই অঞ্চলের দেশ সমূহে আবহাওয়া একটু বেশীই ঠান্ডা।

শীতের সময়ে বেশির ভাগ সময় সূর্য দেখা যায় না।  তাপমাত্রা প্রায় মাইনাস ডিগ্রিতে চলে যায়। সাথে বোনাস হিসাবে থাকে তুষারপাত যা মাঝে মধ্যে জন জীবন বিপদগ্রস্ত করে তুলে রাস্তা ঘাট বন্ধ করে।

এক সময়ের সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ দেশটিতে মাত্র ১.৮ মিলিয়ন মানুষের বসবাস। যার মধ্যে প্রায় ৫ লক্ষ মানুষই থাকে রাজধানী শহর রিগাতে। বাল্টিক সাগর বেষ্টিত দেশটিতে বাংলাদেশীর সংখ্যা হাতে গোনা কয়েকজন।

 

ইউরোপের অনন্য দেশের তুলনায় কম আয়, বিরূপ আবহাওয়া এবং বৈধ অভিবাসনের সুযোগ কঠিন হওয়ার ফলে বাংলাদেশী মানুষ তথা অভিবাসী না থাকার পেছনে অন্যতম কারন।

রিগাতে ৪০-৫০ জন বাংলাদেশি আছে বলে জানা যায়, যাদের বেশির ভাগ হলো শিক্ষার্থী। চমৎকার পরিপাটি, পরিচ্ছন্ন ও প্রসস্থ রাস্তা রয়েছে সমস্ত শহর জুড়ে। ওল্ড টাউনকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃীতি দিয়েছে ইউনেস্কো। কারন এখানে রয়েছে বেশকিছু প্রাচীন স্থাপনা, যার বেশীর ভাগ নির্মিত হয়েছিল ৭-৮ বছর আগে। রিগাকে মিউজিয়ামের শহর ও বলা হয়। তাছাড়া ইউরোপের সর্ববৃহৎ খোলা মার্কেটটি রয়েছে শহরটিতে। যা সোভিয়েত ইউনিয়নের সময়কারে বিমান মেরামতের কাজে ব্যবহার হতো।

তাছাড়া শহটি ইউরোপীয়ান সিটি অব কালচার হিসেবেও পরিচিত। আমরা লিসবন থেকে পাঁচজনের একটি দল রওনা হলাম এবং সাড়ে চার ঘন্টার বিমান যাত্রা শেষে রিগাতে পৌছালাম রাত ১১ টায়। আগে থেকে আমাদের হোটেল বুকিং করা ছিল। আমরা নাম করা পাঁচ তারকা হোটেলে মাত্র ৮০ ইউরো করে টুইন রুম ভাড়া করেছিলাম যা ইউরোপের অনন্য শহরে ৩-৪ গুন বেশী খরচ পড়ে।

প্রথম দিনের দীর্ঘ বিমান যাত্রার কারনে অনেক ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম, তাই তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ি আমরা। দ্বিতীয় দিন মধ্যাহ্নভোজ পর্যন্ত আমন্ত্রিত অনুষ্ঠানে ছিলাম। শীতকালীন সময়ে এখানে দিনের আলো মাত্র আট ঘন্টারও কম সময় ধরে থাকে, কিন্তু বিরূপ আবহাওয়া ফলে আমরা এক মিনিটের জন্যও সূর্য দেখিনি সারাদিনে।

সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি কুয়াশাচ্ছন্ন ছিল, সাথে প্রচন্ড বাতাস বইছিল ফলে ভিষণ ঠাণ্ডা অনুভব হচ্ছিল। আমরা অনেকটা ভাগ্যবান ছিলাম বটে, কারন বছরে এসময়ে সাধারণ তুষার পাত হয় এখানে কিন্তু এবারে আবহাওয়া অনেকটা অনুকূলে।

আমরা দুপুরের খাবার শেষ করে বেড়িয়ে পড়লাম। সিটি সেন্টারের একেবারে নিকটে রয়েছে ভিক্টোরিয়া মনুমেন্ট, যেটি আবার অন্যতম পর্যটন আকর্ষণীয় স্থান। এবছর লাটভিয়ার ১০১ তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের ব্যাপক প্রস্তুতি চলছিল তখন। তার পাশেই রয়েছে নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক লেক সহ দৃষ্টি নন্দন র্পাক। তাছাড়া রয়েছে রিগা বিশ্ববিদ্যালয় যেটি লাটভিয়ার শহরের একেবারে প্রান কেন্দ্র অবস্থিত।

লাটভিয়ার বেশির ভাগ অংশ জুড়ে রয়েছে বনাঞ্চল এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশ সমূহের মধ্যে সবচেয়ে বেশী বনাঞ্চল রয়েছে তাদের ফলে রিগা সহ সারা দেশে কাঠের তৈরি বহুতল প্রচুর কাঠামো এবং ঘর-বাড়ী দেখতে পাওয়া যায়। তাছাড়া রিগাতে মধ্য যুগীয় বেশকিছু স্থাপনাও চোখে পড়বে সমগ্র শহর জুড়ে। যা পর্যটকদের কাছে আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।

বাল্টিক সাগরের তীরে অবস্থিত শহরটিতে বর্তমানে সমগ্র বিশ্ব থেকে বিপুলসংখ্যক পর্যটক ভিড় জমায়। এখানের ইতিহাস ঐতিহ্য, বিশাল সাগরের কোলজোড়ে ছোট ছোট বালিময় সমুদ্র সৈকত এবং দশম শতাব্দীর বেশকিছু পুরনো গীর্জা সহ নানান ঐতিহ্যে ভরপুর শহরটি। তাছাড়া তুলনামূলক কম খরচে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা সহ এবং অত্যাধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা দেশটিকে পর্যটকদের কাছে আকষর্ণীয় করে তুলেছে।

লাটভিয়ার স্বাধীনতা লাভের পরে স্বীকৃীতি প্রদানকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম সারিতে ছিল তাই সাম্প্রতিক সময়ে লাটভিয়া এবং বাংলাদেশের মধ্যে যৌথ বানিজ্যিক সম্পর্ক উন্নয়নে বাল্টিক বাংলাদেশ চেম্বার অব কমাস গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

লাটভিয়ার সরকার বিনিয়োগ সহজিকরণ ও পর্যটন শিল্পের বিকাশে কাজ করে যাচ্ছে ফলে এখানে ব্যবসা বাণিজ্যের নতুন সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে এবং ধীরে ধীরে বাংলাদেশী সহ বিভিন্ন দেশের অভিবাসীরা বসবাস করতে শুরু করেছে।

  • রাসেল আহম্মেদ, লিসবন, পর্তুগাল

আরও পড়ুন- ‘প্রবাসে মনের অজানা শঙ্কায় আমাদের দিন পার করতে হয়’

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.