Featured এশিয়া বিশ্ব বি‌চিত্র সিঙ্গাপুর

প্রযুক্তির কাছে চাকরি হারাবে মানুষ?

শেয়ার করুন

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা রোবট ও প্রযুক্তির কাছে চাকরি হারাবে মানুষ! এইতো কয়েক মাস আগে সিঙ্গাপুরে ফেয়ার প্রাইস শপগুলোতে গেলে দেখতাম, কয়েকজন এসিস্ট্যান্ট এসে পণ্যের দাম বলে দিচ্ছে। চারজন দাঁড়িয়ে থাকত। তারা পণ্য ওজন করে পন্যের দাম নির্ধারণ করে পন্যটি প্যাকেটে ভরে দাম সম্মলিত ট্যাগ লাগিয়ে দিত৷ বিল পরিশোধ করতে গেলে দেখতাম, দশ থেকে বারোজন ক্যাশিয়ার কাস্টমারদের নিকট হতে বিল নিচ্ছে এবং ক্রেতারা লাইনে দাড়িয়ে বিল পরিশোধ করছে।

এখন সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র লক্ষ্য করা যায়। পণ্য কিনতে গেলে কেউ সাহায্য করতে এগিয়ে আসে না। প্রত্যেকটা পণ্যের গায়ে আগেই দাম নির্ধারণ করে ট্যাগ লাগানো থাকে।আর যেসব পন্যের গায়ে দাম নির্ধারণ করা থাকে না (যেমন, শাক, ফল) সেসব পণ্যসমূহ ওজন দিতে গেলে  বিভিন্ন ফল ও সবজির ছবি মনিটরে ভেসে উঠে৷ তাতে চাপ দিলেই দাম সম্মলিত ট্যাগ বের হয়ে আসে৷ নিজেই প্যাকেট করে পন্যের দাম সম্মলিত ট্যাগ লাগিয়ে নেয়।

বিল পরিশোধ করতে গেলে একই চিত্র৷ সেখানে কয়েকটি মেশিন বসানো আছে, নিজেই পণ্যের দাম স্ক্যানিং করে মেশিনের মাধ্যমে বিল পরিশোধ করে৷সেদিন একজন বাংলাদেশী আমাকে বলল, মেশিনগুলো বসিয়ে ভালই হয়েছে৷ এখন ভুল হবার সম্ভাবনা নাই। আগে যখন ক্যাশিয়ারদের নিকট বিল পরিশোধ করতাম, তখন প্রায়ই ক্যাশিয়ার ভুল করে অতিরিক্ত দাম আদায় করত৷

তিনি জানান, একবার বাসায় গিয়ে টের পাই আমার নিকট হতে দশ ডলার বেশী রেখেছে৷ এরপর সবসময় পণ্যের দাম যাচাই করে বিল পরিশোধ করতাম। ওদের ভুল ধরিয়ে দিলে বলত, সরি ভুলে একই পণ্য দুইবার স্ক্যানিং করেছি৷ এখন মেশিনে নিজের বিল নিজেই পরিশোধ করি ভুল হবার সম্ভাবনা নাই।

মূলত প্রযুক্তির এই বুদ্ধিমত্তার কাছেই চাকরি হারাবে মানুষ। অনুমান করা যায় আগামী বিশ থেকে পঞ্চাশ বছরের মধ্যে ষাট থেকে সত্তর ভাগ লোক চাকরি হারাবে।

এখন সিঙ্গাপুর বিমানবন্দরেও লোকজন বুকিং নেয় না৷ সেখানে অনেকগুলি মেশিন বসানো আছে৷ নিজে নিজেই মালামাল ওজন করে বোর্ডিং পাশ নিতে হয়। এমনকি শুনলাম উন্নত দেশগুলিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা রোবটের কাছে অনেকে চাকরি হারাচ্ছে।

হয়ত বা মানুষ বিকল্প কর্মসংস্থান খুঁজে নিবে৷ কিন্তু তারজন্য প্রয়োজন বুদ্ধিমান মানুষ৷ মূর্খ, অলসরা তখন পৃথিবীতে অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়বে।প্রযুক্তির নিকট তারা হেরে যাবে৷ এখন যে প্রজন্ম সারাদিন ফেসবুকে বসে বভিন্ন মানুষকে নিয়ে ট্রল করে দুই তিন ঘন্টা অযথা নষ্ট করে তখন তাদের কি হবে তা সহজেই অনুমান করা যায়।

তার কারন, পৃথিবীর প্রয়োজন এমন ব্যাক্তিদের যাদের প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রন করতে না পারে।তারাই প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রন করবে। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মকে প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রন করছে। তা কিভাবে? আমরা যখন ফেসবুকে যাই তখন যদি একজনকে ট্রল করে এক ঘন্টা ব্যয় করে ফেলি। আর যদি অনলাইনে নিউজে দেখি একি করলেন অমুক। সাথে সাথে নিউজ লিংকে প্রবেশ করে। সংবাদের সত্য মিথ্যা যাচাই না করে উত্তেজিত হয়ে ইচ্ছেমত মন্তব্য করতে থাকি। তাকে বিভিন্ন উপদেশ দিতে থাকি। এভাবে নিজের অজান্তে ফেইবুকে দুই ঘন্টা কাটিয়ে দেই।

এরপর যখন ইউটিউবে প্রবেশ করে দেখি যে, কাজের মেয়ের সাথে একি করলেন ওমুক। সাথে সাথে ভিডিও অন করে নিষিদ্ধ কিছু পাবার তীব্র আকাঙ্খা করি৷ সেখানে গিয়ে কিছু না পেলে। একের পর এক ভিডিও অন করি যাদের হেডিং থাকে অশ্লীল। এভাবে একের পর এক ভিডিও অন করে  ঘন্টার পর ঘন্টা ব্যয় করে ফেলি।

কিন্তু আমরা যখন ফেসবুক কিংবা ইউটিউবে প্রবেশ করি তখন কত মিনিট থাকব পূর্ব পরিকল্পনা নিয়ে প্রবেশ করি না। ফেসবুক ইউটিউবই আমাকে নিয়ন্ত্রন করে দুই তিনঘন্টা ব্যস্ত রাখল৷ আমাদের প্রযুক্তির দ্বারা পরিচালিত হতে হল। আমাদের দিয়ে জাতির কি হবে? প্রযুক্তি আমার মনোযোগ তার দিকে ধাবিত করে দৈনিক তিন চার ঘন্টা কেড়ে নিচ্ছে৷

চিন্তা করে দেখুন, গত কয়েক বছর আগেও ইউটিউব, ফেসবুক বলে কিছুই ছিল। আর এখন ইউটিউব ফেসবুক আমাদের নিয়ন্ত্রণ করছে৷ ভাবতে অবাক লাগলেও এটাই সত্য। ফেসবুকে, ইউটিউবে আমাদের অপছন্দনীয় কোন ব্যক্তির সম্পর্কে কিছু দেখলে আমরা উত্তেজিত হয়ে পড়ি। সেখানে গিয়ে বাজে মন্তব্য করি।

এই যে উত্তেজিত হয়ে বাজে মন্তব্য করলাম, তাতে আমার অপছন্দনীয় ব্যক্তির কোন ক্ষতি হয়নি। উনি উনার মত করেই এগিয়ে যাচ্ছেন। আমরা অযথা তাকে নিয়ে ট্রল না করতাম কে চিনত তাকে? মনে রাখতে হবে ঈর্ষান্বিত হয়ে অন্যের সমালোচনা করতে গিয়ে নিজেরই ক্ষতি করছি কিনা৷ নিজেরাই অকেজো, পঙ্গুত্ব বরন করছি কিনা।

বিখ্যাত ঐতিহাসিক লেখক ইউভাল নোয়াহ হারারি তার নতুন বই ‘টুয়েন্টি ওয়ান লেসন্স ফর দ্য টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি’-তে বলেছেন,ভবিষ্যতে রোবটরা আপনার চাকরিকে নিয়ে নেবে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আপনার মস্তিষ্ককে হ্যাক করে ফেলবে- এবং এই ভবিষ্যতটাও খুব দূরে নয়।”

তিনি বলেন, এই হুমকি থেকে রক্ষা পেতে দরকার এমন মানসিক নমনীয়তা এবং সংস্কারহীনতা, যাতে প্রতি দশকে আমরা নতুন করে আবিষ্কার করতে পারি নিজেদেরকে। আরও দরকার নিজেকে এমনভাবে জানা যে, প্রযুক্তি আমাদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিতে না পারে।

তার জন্য প্রয়োজন অন্যের সমালোচনা না করে নিজেকে জানা। বই পড়া। বই পড়া ছাড়া আমরা নিজেকে জানতে পারব না। জ্ঞানী হতে পারব না। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ধনী বিল গেটস দৈনিক দুই ঘন্টা বই পড়েন। ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জোকার বার্গও নিয়মিত বই পড়েন৷ প্রতিটি সফল ব্যক্তির ইতিহাস ঘেটে দেখা যাবে তারা অন্যের সমালোচনা না করে নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন।

  • ওমর ফারুকী শিপন, সিঙ্গাপুর

আরও পড়ুন- কাতারে পথচারীদের জন্য বসানো হচ্ছে রাডার

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.