Featured এশিয়া সিঙ্গাপুর

‘প্রবাসে মনের অজানা শঙ্কায় আমাদের দিন পার করতে হয়’

শেয়ার করুন

আমার রাতের ডিউটি চলছে।প্রতিদিনের মত অফিসে এসে সহকর্মীদের সাথে গল্প করছি৷ কাজ শুরু করার নির্ধারিত সময়ের এক ঘন্টা আগেই অফিসে পৌঁছে যাই৷ তাই গল্প করার সুযোগ পাওয়া যায়। প্রবাসে কাজের ব্যস্ততা, পারিবারিক সমস্যা,শারীরিক অসুস্থতায় প্রায়ই সময় প্রবাসীদের মন খারাপ থাকে৷ মনের মধ্যে অজানা শঙ্কা,ভয় নিয়ে আমাদের দিন পার করতে হয়৷ অফিসে এসে আমরা বাংলাদেশীরা একসাথে বসে একটু আড্ডা গল্পে মেতে উঠি৷ কাজ শুরু হবার আগ পর্যন্ত চলে এই আড্ডা৷

অনেক সময় তুচ্ছ সামান্য গল্প শুনেও সবাই হাসিতে ফেটে পড়ি। মানুষের যখন আনন্দের অভাব হয় তখন মানুষ সামান্য কারনেও হাসে বা হাসার অভিনয় করে যায়৷ আবার অনেকসময় হাসির গল্পেও হাসি আসে না৷ মনে বেদনা পুঞ্জীভূত হলে তখন মস্তিষ্কে হাসি নিয়ন্ত্রিত অংশ সাবকর্টেক্স কাজ করে না৷

আজকে আমাদের গল্প শুরু হয়,আরেক সহকর্মীকে নিয়ে। সে জিমে গিয়ে কয়েকটি ছবি তুলে ফেসবুকে আপলোড দিয়ে ক্যাপশনে লিখে, সুস্থ থাকতে হলে নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে৷তার ভাবখানা এমন যে সে প্রায়ই ব্যায়াম করে। অথচ সে ব্যায়াম না করে ছবি তুলেই বের হয়ে যায়৷ আমরা সেই ছবি দেখে একেকজন একেক কথা বলছি আর হাসাহাসি করছি। এমন সময় মতিউর ভাইয়ের মোবাইলে কল এলো৷

তিনি বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে একটু দূরে সরে কল রিসিভ করে হ্যালো বললেন৷ এরপর তার মুখে আর কোন কথা নেই৷ সে মোবাইল কানে দিয়েই দাঁড়ানো অবস্থা থেকে মাটিতে বসে পড়ল৷ তার চোখ গড়িয়ে অশ্রু পড়ছে। সবাই হতভম্ব হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছি৷

মুহূর্তে আনন্দময় পরিবেশে বিষাদে ছেয়ে গেলো৷ আমি উঠে গিয়ে তার পাশে বসে বললাম, ‘কি হইছে ভাই, আপনি কাঁদছেন কেন? কয়েকবার জিজ্ঞেস করার পর সে বলল, ‘ভাই আমার ছোট মেয়ে মইরা গেছে’। সে আর কিছু বলতে পারল না৷ হাউমাউ করে কেঁদে উঠল৷ সবাই মতিউর ভাইকে ঘিরে বসে তাকে শান্তনা দিচ্ছে৷

আমি তার মোবাইলের দিকে তাকিয়ে দেখি মোবাইলে ওপাশে এখনো সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়নি৷ আমি মোবাইলটা কানে দিয়ে বললাম, ‘হ্যালো কে বলছেন? বাড়িতে কি হয়েছে? মতিউর ভাই কান্না করছে? তাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে গেলাম’।

আশ্চর্য মোবাইলের ওপাশ থেকে আমার প্রশ্নের জবাবে কেউ কিছু বলছে না।শুধু বেদনাদায়ক কান্নার শব্দ ভেসে আসছে৷ এমন বিষাদময় কান্না শুনে সহ্য করতে পারলাম না। মোবাইলের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে মতিউর ভাইকে বললাম, ‘আপনার বাড়ির কারো নাম্বার দিন কথা বলি৷ এভাবে কান্না করে কি হবে ভাই? আপনি শান্ত হোন’৷ যদিও তাকে শান্তনা দেবার ভাষা আমার জানা নেই৷ প্রিয় সন্তান হারানোর বেদনায় পিতাকে কি বলে শান্তনা দিতে হয় তা আমার জানা নেই৷

মতিউর ভাই তার চাচীর নাম্বার দিলে আমি সাথে সাথে আমার মোবাইল থেকে কল দিলাম৷ কয়েকবার রিং হবার পর একজন কল রিসিভ করে ওপাশ থেকে হ্যালো বলল।আমি বললাম, ‘আমি মতিউর ভাইয়ের সহকর্মী বলছি। বাড়িতে কি হয়েছে আমাকে কি বলা যাবে? তিনি বললেন, হ্যাঁ বাজান। আমাদের মতিউরের ছোট মাইয়া পানিত পইরা মইরা গ্যাছে’৷ তিনি আর কিছু বলতে পারলেন না৷ তিনিও কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন৷

কিছুক্ষণ পর আবার কল দিয়ে জানতে পারলাম৷ মতিউর ভাইয়ের ছোট মেয়ে যার বয়স মাত্র একবছর। সবেমাত্র হাঁটা শিখেছে৷ সে নাকি অন্যান্য বাচ্চাদের সাথে বাড়ির আঙিনায় খেলছিল৷ তার বউ অসুস্থ হওয়ায় বিছানায় শুয়ে ছিল৷ আধাঘন্টা পর বাহিরে বের হয়ে তিনি অন্যান্য বাচ্চাদের দেখতে পান কিন্তু তার ছোট মেয়েকে দেখতে পান না৷ সাথে সাথে তিনি এদিক ওদিক মেয়েকে খুঁজতে শুরু করেন।কিছুক্ষণ পর বাড়ি সংলগ্ন পুকুরে মেয়ের মৃতদেহ দেখতে পান৷ যা দেখে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন৷ একজন মায়ের পক্ষে এমন অবুঝ সন্তানের লাশ দেখার ক্ষমতা নাই৷

মতিউর ভাই কান্না করছে৷ আর আমরা সবাই তাকে ঘিরে মন খারাপ করে বসে আছি৷ অনেকের চোখ ছলছল করছে৷ আমি তার কান্না সহ্য করতে না পেরে অন্যত্র চলে গেলাম।

কিছুক্ষণ পর আমাদের সিনিয়র সেফটি অফিসার সুব্রত ভাইকে কল দিলাম। তাকে বিস্তারিত জানানোর পর তিনি বললেন, মতিউর কি দেশে যাবে? আমি বললাম, ‘হ্যাঁ ভাই দেশে গেলে তো ভালই হয়’।
তিনিন বললেন, ‘ঠিক আছে আমি মতিউর রহমানের সাথে কথা বলে সব ব্যবস্থা করতেছি৷’

তিনি আর কথা বাড়ালেন না৷ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে সাথে মতিউর ভাইকে কল দিলেন৷সুব্রত ভাই মতিউরের সাথে কথা বলে তাকে শান্তনা দিয়ে আশ্বাস দিলেন তার দেশে যাবার ব্যাপারে সবধরনের সহযোগিতা তিনি করবেন৷

প্রবাস থেকে ইচ্ছে করলেই দেশে যাওয়া যায় না।কোম্পানি ছুটি মঞ্জুর করলে বিমান টিকেট কিনতে হবে৷ তাছাড়া অনেকসময় বিমানের টিকেট পাওয়া যায় না। টিকেট কেনার জন্য সাথে টাকাও তো থাকা চাই৷ অনেক প্রবাসীই বেতন পাবার পর নিজের খরচ বাবদ সামান্য টাকা রেখে সব টাকা দেশে আপনজনদের জন্য টাকা পাঠিয়ে দেয়৷

সুব্রত ভাই এইচআর ও বসদের সাথে আলোচনা করে মতিউরের ছুটি মঞ্জুর করালেন৷ শুধু তাই নয় পরের ফ্লাইটের বিমান টিকেটও অনলাইনে ক্রয় করে আমাকে কল দিয়ে বললেন, ‘মতিউরের দেশে যাবার সব ব্যবস্থা করেছি। আপনি মতিউরের সাথে কথা বলে তাকে শান্তনা দিন। আর তাকে সকালে অফিসে আসতে বলুন আমি সকালে তার বিমান টিকেট ও ছুটির ব্যাপারে আনুসঙ্গিক কাজ সেরে দেবো৷’

সকালে মতিউর অফিসে এলে তার চেহারার দিকে তাকাতে পারলাম না৷আমি নিশ্চিত সে প্রিয় সন্তান হারানোর বেদনায় সে সারারাত ঘুমায়নি৷ হয়ত সে সারারাত কেঁদেই পার করে দিয়েছে৷ সুব্রত ভাই মতিউর রহমানকে অফিসে ডেকে শান্তনা দিয়ে তার হাতে বিমান টিকেট ধরিয়ে দিলেন৷

সুব্রত ভাইয়ের কথা শুনে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলাম। তিনি আমাদের ডিপার্টমেন্টের প্রধান৷ তিনি যেভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন৷ শুনে সত্যি আমি কৃতজ্ঞ হলাম। এর আগেও তিনি কয়েকবার এভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন।

মানুষ মানুষের জন্য৷ সুব্রত ভাইয়ের এই ভালো কাজ হয়ত আমরা মনে রাখব না৷ কিন্তু যারা উপকৃত হয়েছে তারা আজীবন মনে রাখবে। তারা মনে না রাখলেও সৃষ্টিকর্তা ঠিকই তাকে এর প্রতিদান দিবেন৷ ভালো মানুষরা প্রতিদানের আশায় কিছু করেন না। তারা বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সুখানুভূতি লাভ করেন৷

মতিউর ভাই ভগ্ন হৃদয়ে বাড়ির উদ্দেশ্য রওনা দিলেন৷জানলাম তার হাতে কোন টাকা নেই৷ সুব্রত ভাই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে না দিলে হয়ত তার এই অবস্থায় দেশে যাওয়া হতো না৷

তার কথা শুনে উপলব্ধি করলাম আমারও মাস শেষে হাতেও কোন টাকা থাকে না। কোন জরুরি কারনে বাড়ি যেতে হলে আমার পক্ষে যাওয়া সম্ভব না৷ প্রত্যেক প্রবাসীর উচিত বাড়িতে টাকা পাঠানোর পরও কিছু টাকা নিজের কাছে রাখা৷ কখন কোন জরুরি অবস্থায় প্রয়োজন হয় তাতো বলা যায় না৷

প্রবাসে সবচেয়ে কষ্টকর হলো আপনজনদের মৃত্যু সংবাদ শুনে সারারাত বিছানায় ছটফট করা৷ শেষ বিদায়ে আপনজনের পাশে না থাকাটা যে কতটা কষ্টকর তা প্রবাসী ছাড়া কেউ উপলব্ধি করতে পারে না।

  • ওমর ফারুকী শিপন, সিঙ্গাপুর 

আরও পড়ুন- একজন মানুষের প্রবাসী হয়ে উঠার গল্প

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.