Featured মধ্যপ্রাচ্য সৌদি আরব

প্রবাসে এসে হোঁচট খাওয়া, ছন্নছাড়া জীবন, কেন এত জটিলতা?

শেয়ার করুন

মন্তব্য প্রতিবেদন-

কেন বাংলাদেশিরা বিদেশে এসে তুলনামুলক স্বল্প বেতনের নিন্মমানের চাকুরী করতে হয় এবং কেন ভিসাগত জটিলতা তথা অন্য দেশের তুলনায় অনেক বেশী অবৈধ হিসেবে গণ্য হয়?

আমার ১০ বছরের মধ্যপ্রাচ্যের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি- যারা দেশ থেকে আসার সময় কোন একটা হাতের কাজ ও শিখে নাই তারা বিদেশে এসে পরতে পরতে হোঁচট খেয়েছে, যাকে অদক্ষ শ্রমিক বলে। আর এই অদক্ষ শ্রমিকের পরিমানে বাংলাদেশীরাই বেশি। শিক্ষার কথা না হয় বাদ-ই দিলাম।

আমি যখন বাহরাইনে গেলাম, তখন নিজের চোখের সামনে আশপাশের শত শত মানুষের হাহাকার দেখেছি, যারা জীবনে দেশে কোন হাতের কাজ করেনি। এদের মধ্যে খুবই অল্প কয়েকজন মোটামুটি মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক পড়েছে। তারা হয়ত কোনরকমে কয়েকটা সিভি বানিয়ে বিভিন্ন অফিসে পিয়ন বা অন্য কোন পোস্টের জন্য আবেদন করেছে অথবা রেস্টুরেন্ট বা হোটেল গুলোতে আবেদন করেছে।

কয়েক মাস পর আস্তে আস্তে ২-৪ জনের চাকুরীও হয়েছে। তবে যে কয়দিন চাকুরী হয়নি সে কয়দিনে নিদারুন কষ্ট ভুক্তভোগীরাই বুঝবে। আর যারা নুন্যতম শিক্ষাও নেই আবার অদক্ষ তাদের অবস্থা এতটাই নাজুক যে অনেকেই দেশে ফিরে গেছে। কেউবা অবৈধ ব্যবসা এবং অসামাজীক কার্যকলাপের ব্যবসায় নিয়োজিত হয়েছে।

এগুলো করে কি আর চিড়া ভিজে? ঋণের টাকা, সুদের টাকা, আত্মীয়-স্বজনের বিশ্বাস করে দেয়া টাকা, মায়ের গহনা বিক্রি করা টাকা, বোন অথবা ভাবি, খালা-ফুফুর গহনা বন্ধক রেখে টাকা, ধান পাকা জমিন বন্ধক দিয়ে টাকা, এসব টাকা দিয়ে বিদেশে এসে কি এরকম ছন্নছাড়া জীবন নিয়ে চলা যায়?

এই অদক্ষ অশিক্ষিত কিংবা অল্প শিক্ষিত শ্রমিক গুলো হয়ে উঠে, ভিসার দালাল, অবৈধ ব্যবসায়ী, মাদকজাত দ্রব্যের ধারক ও বাহক, চোর, ধার নিয়ে পালিয়ে যাওয়া, ধান্দাবাজ, জুয়াড়ি, অবৈধ সালিশদার, এমন কোন অপকর্ম নেই যা করে না। অদক্ষদের মধ্যে কেউ কেউ গাড়ি পরিষ্কার করা, রাস্তাঘাট পরিষ্কার করা, কম বেতনে কনস্ট্রাকশান এর কাজ করা, রাস্তায় সবজি বিক্রি করা, পেপসির খালি ক্যান কুড়িয়ে বিক্রি করা এসব কাজে জড়িত।

সবাই হয়ত এই একটা কারনে এসবের সাথে জড়ায় না, কেউ কেউ অল্প দিনে পয়সাওয়ালা হওয়ার জন্যও করে থাকে, কেউ আবার দেশে থাকার সময়ই এসব করতো এখন সেটাকে আন্তর্জাতিক রুপ দিয়েছে ( দেশে গিয়ে নামের আগে টাইটেল দেয় আন্তর্জাতিক শিল্পপতি )।

আবার যারা অদক্ষ এদের এগুলো করতে করতে ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যায়, এরকম ছন্নছাড়া জীবনের জন্য নতুন করে ভিসা লাগানোর টাকাও থাকে না, কেউ এদের কোন কোম্পানিতেও নিতে চায় না। যা হবার তাই হয়, শুরু হয় এবার তাদের অবৈধ অভিবাসন। যেটা বেশির ভাগ দেশের একটা আতংকের নাম। কারন কখন যে উপরওয়ালা রিজিকের ব্যবস্থা দেশে করে ফেলে তার কোন গ্যারান্টি নেই। এমন হতাশা থেকেই তারা মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে, মাদকের টাকা যোগান দিতে নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে।

অথচ যারা দক্ষ তাদের কোন চিন্তা নেই, তাদের  বসে থাকতে হয় না, মোবাইলের কাজ, গাড়ির কাজ, স্টীল, কাঠ মিস্ত্রী, হেয়ার কাট, ড্রাইভিং, দর্জি, বাবুর্চী, টাইলস, যে কোন কাজ শিখে আসুক দেশ থেকে তার চাকুরীর অভাব নেই।

তারা চাইলে যে কেউ তাদের ভিসার ব্যবস্থা করে তাদের প্রতিষ্ঠানে স্থায়ী করে নেয়। কারন দক্ষ শ্রমিকের কদর পৃথিবীর সকল দেশেই আছে। আপনি যে দেশেই যাবেন আপনাকে বসিয়ে কেউ বেতন দিবেনা। কাজ করতে হবে। তো-আপনি যখন দেশ থেকে আসবেন তখন যদি কোন একটা কাজ শিখে আসেন, আপনি বিদেশে আসলে অন্তত সেই কাজটা করে উপার্জন করতে পারবেন।

এখানে কর্তৃপক্ষ হয়ত কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে আমি বলবে সেটা ফরম্যালিটি মেন্টেইন ছাড়া কিছু নয়।
এই সমস্যার জন্য আমার কাছে যে উদ্যোগ গুলো কার্যকরী মনে হয় তা হল—

যিনি বিদেশে আসার সিদ্ধান্ত গ্রহন করবেন তিনি যেন বিদেশে আসার আগে ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করে নিজের জন্য সহজ এমন কোন কাজ শিখে রাখেন, কোন দেশে যাবে সেটা আগে থেকে জানা থাকলে সেই দেশের চাহিদা অনুযায়ী একটা কাজ ঠিক করে শিখে নেয়া।

বিদেশে অদক্ষ শ্রমীক হয়ে যেন ফ্রী ভিসা (যে ভিসায় মালিকের কাজ নেই) নিয়ে না যায়। সমস্ত টাকা ঋণ করে নিয়ে আসার প্রয়োজন নেই, সেক্ষেত্রে দেশে থেকে কাজ করে কিছু টাকা নিজে উপার্জন করে তারপর বিদেশের জন্য চেষ্টা করা ( ২ টা লাভ সেটা হল মানসিকতা তৈরী করা, ঋণের বোঝা কমে আসা) নুন্যতম ইংরেজী ভাষা শিক্ষা গ্রহন করা, নয়তো যে দেশে যাবে সে দেশের ভাষা মোটামুটি শিখে আসা।  আসার পরই যদি ফ্রী ভিসা হয় ১ দিনও বসে থাকার প্রয়োজন নেই। তাকে চিন্তা করতে হবে দেশবেধে নুন্যতম বাংলাদেশী ১৩৬৯ টাকায় কেনা, তাকে অন্তত পক্ষে প্রতিদিন ২০০০ টাকা উপার্জন করতে হবে।

কোম্পানির লোক হলে নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী বেসিক ডিউটির সাথে ওভারটাইমের চেষ্টা করা।
কোন অবস্থাতেই ইচ্ছে করে অবৈধ হওয়ার প্রবনতা বন্ধ করা, কারন আপনার জন্য পুরো দেশের বদনাম কুড়োতে হবে এই কথা মাথায় রাখা জরুরী।

যেকোন সমস্যায় দূতাবাস এবং বিদেশে অবস্থিত প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক বা সংগঠন গুলোর সাহায্য নিবেন। ভিসার ব্যাবসায় জড়াবেন না, যদি কখনো কেই অফার করে এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করবেন।
মাদক দূরে থাকবেন, সেবন, ক্রয়-বিক্রয়, পরিবহন থেকে বিরত থাকবেন।

  • নুরুদ্দিন ফরহাদ, জেদ্দা, সৌদি আরব।
শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.