Featured এশিয়া সিঙ্গাপুর

“প্রবাসীদের একটি বছর শেষ হওয়া মানেই দীর্ঘশ্বাস”

শেয়ার করুন

শেষ হয়ে গেলো আরেকটি বছর। অনেকেই বিদায়ী বছরে পাওয়া না পাওয়ার হিসেব কষছে। কিন্তু প্রবাসীদের একটি বছর শেষ হওয়া মানেই দীর্ঘশ্বাস। পরিবার থেকে দূরে থাকার সময় আরো এক বছর বাড়ল বৈকি কিছুই নয়৷

আত্নীয়দের অভিযোগ বেড়েছে, নিজের চির যৌবন, গায়ের শক্তি কমতে শুরু করেছে কিন্তু নিজের কোন পরিবর্তন হয়নি৷ বরাবরের মতো বছর শেষে হিসেবের খাতা শূন্য৷

যেখানে বিশ্ববাসী জাঁকজমকপূর্ণ বছর শুরু করবে, সেখানে আমার মতো সাধারণ প্রবাসীরা অন্যান্য দিনের মতো সাদামাটাভাবে বছর শুরু করব৷ তবুও আমাদের কোন অভিযোগ নেই৷ এই তো আছি বেশ ভালো।

সিঙ্গাপুর প্রবাসী তোফাজ্জল হোসেন রাজার কাছে নতুন বছরের প্রত্যাশা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের কাছে নতুন বছর আর পুরনো বছরের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই৷ প্রতিটি দিনই আমাদের কাছে সমান তবুও নতুন বছরের প্রত্যাশা থাকবে বিমানবন্দরে যাতে কোন প্রবাসীকে হয়রানি হতে না হয়। বিদেশে উপস্থিত দূতাবাস যেন সাধারণ কর্মীদের সাথে মাঝেমাঝে আলোচনার মাধ্যমে তাদের সমস্যার কথা শুনে সমাধানের চেষ্টা করে৷ সর্বোপরি প্রবাসীদের স্বার্থ রক্ষার্থে সরকার যেন আরো তৎপর হয়৷

তবে খুবই আতঙ্কের বিষয় প্রবাসীরা সবসময়ই দুশ্চিন্তায় ভুগেন৷ এই দুশচিন্তার কারন পরিবারের সবার ইচ্ছে পূরনে ব্যর্থতা। বছর শেষ হলেও নিজের একাউন্টে তেমন সঞ্চয় না থাকা৷ আমার সহকর্মী জাহিদ বলেন, ভাই বছর শেষ হয়ে গেলো অথচ নিজের হিসেবের খাতা শূন্য। পরিবারের সবার চাহিদা পূরন করতে গিয়ে দেখি নিজের জন্য কিছুই নেই। একটা বছর শেষ হওয়া মানেই টেনশন বেড়ে যাওয়া ।

অধিকাংশ প্রবাসীরা না পাওয়ার জন্য অতিরিক্ত দুশচিন্তা করেন আর এ কারনে অনেকে স্টোক করে মারা যাচ্ছেন। অতিরিক্ত দুশচিন্তা ও নির্ঘুম রাত মানুষকে দ্রুত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়৷

প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থা ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বিদেশ থেকে আসা মরদেহের সংখ্যা বাড়ছে। গড়ে প্রতিদিন ১১ জন শ্রমিকের মরদেহ দেশে আসছে। ২০০৯ থেকে ২০১৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় ১১ বছরে দেশে বিদেশ থেকে মরদেহ এসেছে ৩৪ হাজার ৩৮৫ জনের।

আর ২০১৯ সালের প্রথম ৯ মাসে বিদেশ থেকে এসেছে প্রায় ৩ হাজার ৬৬৮ জনের মরদেহ। এর মধ্যে ৬২ শতাংশ প্রবাসী মারা গেছেন স্ট্রোকে। স্বাভাবিক মৃত্যু পাওয়া গেছে মাত্র ৫ শতাংশ প্রবাসীর। বাকিদের মৃত্যু হয়েছে হৃদরোগে, দুর্ঘটনা, হত্যা বা আত্মহত্যার কারণে।

সংখ্যার বিচারে হয়ত সামান্য কিন্তু প্রবাসীদের পরিবারগুলো জানে আপনজন হারানোর কষ্ট। অনেক পরিবার তাদের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে৷

তাই আমাদের প্রত্যাশা আগামী বছরে যাতে কোন মায়ের বুক খালি না হয়৷ কোন পরিবার যেন প্রবাসীর মৃত্যুর কারনে মানবেতর জীবনযাপন করতে না হয়৷ তাই প্রবাসে কারো মৃত্যু হলে সরকার যেন তার পরিবারের পাশে দাঁড়ায়৷ তার সন্তানদের লেখাপড়ার দায়িত্ব সরকারি খরচে করার ব্যবস্থা করা হয়।

অনেক প্রবাসী দাবী করেন, সরকারের উচিত প্রবাসে কারো মৃত্যু হলে তার পরিবারকে পেনশনের ব্যবস্থা করা। যাতে অসহায় পরিবারটি স্বাচ্ছন্দ্যে বেঁচে থাকতে পারে৷ বর্তমানে আইন অনুযায়ী শ্রমিকের মরদেহ দেশে ফেরার পর দাফনের জন্য ৩৫ হাজার টাকা ও পরবর্তী সময়ে নিহত শ্রমিকের পরিবারকে ৩ লাখ টাকা করে দেওয়া হয়।যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।

আরো অনেক প্রবাসীর মতামত জানতে চাইলে তারা বলেন, অনেক প্রবাসী অবসরকালীন আর্থিক সংকটে মানবেতর জীবনযাপন করেন। তাই সরকারি চাকুরীজীবীদদের মত প্রবাসীদের জন্য পেনশনের ব্যবস্থা করা। প্রবাসীদের প্রেরিত অর্থ থেকে পেনশন ফান্ডে প্রতিমাসে কিছু করে টাকা জমা রাখার ব্যবস্থা করা এবং উপার্জনে অক্ষম কিংবা নিদিষ্ট বয়সসীমা অতিক্রম হলে তাদের পেনশন ভিত্তিক সে টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা করা।

প্রবাসীদের জন্য দেশে নিরাপদ ও লাভজনক বিনিয়োগের ক্ষেত্র তৈরি করা। যাতে প্রবাসীরা উৎসাহিত হয়ে বিনিয়োগ করে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারে। প্রবাসীদের জন্য আবাসন প্রকল্প তৈরি করা যাতে প্রবাসীরা নিরাপদে পরিবার পরিজনদের সাথে বসবাস করতে পারে।

  • ওমর ফারুকী শিপন, সিঙ্গাপুর।

আরো পড়ুন- সৌদির প্রবাসী প্রত্যাবাসনের কার্যক্রম ৩ দিনের জন্য স্থগিত

প্রবাসীদের সব খবর জানতে; প্রবাস কথার ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.