Featured স্পেন

প্রতিবেশী কারমেন; যার ঝকঝকে দাঁতে এক ঝলক হাসি যেন লেগেই থাকে সারাক্ষণ

শেয়ার করুন

সত্তোর্ধ বয়সী কারমেন আমার এপার্টমেন্টের নীচ তলায় নিজের বিশাল ফ্ল্যাট নিয়ে একাই থাকেন। বিয়ের পর স্বামীকে নিয়ে যে ঘরে হাসি,আনন্দ ও ভালবাসায় সুখের সংসার পেতেছিলেন, সে ঘরে এখনও আছেন। সংসারও আছে । তবে, প্রিয়তম স্বামী বিহীন সংসার! কয়েক বছর হল স্বামী মারা গেছেন।

এরপর থেকে নিজের একটি পোষা কুকুর নিয়েই জীবনের বাকি দিনগুলো পার করছেন। এছাড়া সুখ দুঃখ ভাগাভাগি করার আর কেউই তার অবশিষ্ট নেই। সিঁড়ি দিয়ে উঠা নামায় প্রায়ই দেখি তিনি নিজ হাতে সিঁড়ি পরিস্কার করে রাখেন। আমি যখনই তাকে এ অবস্থায় দেখি তখনই অনেকগুলো ধন্যবাদ দিই। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। একটু প্রাণ খুলে কথা বলি। প্রশংসা করি।

বলি যে, সিঁড়ি পরিস্কার রাখার দায়িত্বটি পুরো এপার্টমেন্টের সবার। আপনি এই বয়সে একা একা কেন কষ্ট করছেন। আপনাকে আমি সাহায্য করতে চাই। আমার কথায় তিনি বেশ আনন্দ পান। কৃতজ্ঞ হন। খুশি হয়ে ধন্যবাদ দেন। মুখে একরাশ মিষ্টি হাসি নিয়ে বলেন, যে ক’দিন বেঁচে আছি কিছু একটা অন্তত করি। আমারতো বয়স হয়েছে ।

এখন ইচ্ছে থাকলেও মানুষের উপকারের জন্য, ভালোর জন্য তেমন কিছুই তো করতে পারবো না। সিঁড়িগুলো পরিস্কার রেখে অন্তত ভাল কিছু করতে না পারার আক্ষেপ কিছুটা হলেও গুছালাম। কারমেন যখন কথা বলেন আমি তখন তার চোখে চোখ রাখি। নীল চোখ জোড়ায় অদম্য কর্ম স্পৃহা দেখতে পাই। বয়সের তেমন কোন ছাপ নেই চোখে মুখে। ঝকঝকে দাঁতে এক ঝলক হাসি যেন লেগেই থাকে সারাক্ষণ।

কথা বলতে বলতে তিনি তার হাতের কাজ শেষ করে আমাকে তার নিজ হাতে করা কিছু কাজ দেখাতে ঘরের ভিতরে নিয়ে যান।ঘরে প্রবেশের পর বসার ঘরে নিয়ে গেলেন। এন্টিক সব আসবাবপত্রে সাজানো গুছানো পরিপাটি বসার ঘর। বসার ঘরের সাথেই ছোট একটি ফুলের বাগান। টবে লাগানো ফুলের গাছগুলোতে হরেক রকমের ফুল ফুটেছে। বসার ঘরের সাথেই বিশাল বেড রুম।

বেড রুমের প্রতিটি দেয়াল জুড়ে স্বামী স্ত্রীর অসংখ্য ফ্রেমে বাঁধা ছবি ও স্মৃতি রয়েছে। এরপর নিয়ে গেলেন দুটো আলাদা আলাদা রুমে। একটা রুমে প্রবেশ করতেই নতুন পূরাতন মিলে চার/পাঁচটা সেলাই মেশিন চোখে পড়লো। মেশিনগুলো স্বামীর হাতে কেনা। এজন্য পরম যত্নে সাজিয়ে রেখেছেন। মাঝে মধ্যে এগুলো দিয়ে তিনি নিজের মনের মতো করে ঘরের দরজা, জানালার পর্দা ও অন্যান্য কাজ করেন।

অন্য রুমটিতে বসে অবসর সময়ে পেইন্টিং করেন। পুরো ঘর জুড়ে যতগুলো পেইন্টিং চোখে পড়লো সবগুলোই তার নিজে হাতে করা। আমাকে অবাক করে দিয়ে বললেন, আমি প্রতিদিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠি। কুকুরটিকে সাথে নিয়ে ভোরেই হাঁটতে বের হয়ে পড়ি। তারপর বাসায় ফিরে নাস্তা সেরে সারাদিন ঘরে এটা ওটা করে কিভাবে যে দিন চলে যায়, বুঝতেই পারিনা।

এভাবে অনেক্ষণ তার জীবনের গল্প, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ভ্রমনের গল্প ও স্বামীর স্মৃতি বিজড়িত অনেক গল্পের পর আমি যখন উঠবার জন্য অনুমতি চাইলাম, তখন তিনি ইশারায় আমাকে বসতে বলে তার নিজ হাতে করা দুটো পেইন্টিং নিয়ে এসে আমার হাতে দিয়ে বললেন, এটা আপনার বাচ্চাদের জন্য।

আমি অসংখ্য ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে হাসি মুখে বিদায় নিয়ে একটি একটি করে সিঁড়ি বেঁয়ে উপরে উঠছি আর কারমেনের কথাগুলো কানে ভাসছে, “আমি মানুষের জন্য জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অন্তত ভাল কিছু করে যেতে চাই”।

এখলাছ মিয়া,  বার্সেলোনা, স্পেন   

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.