Featured এশিয়া সিঙ্গাপুর

প্যানাডল ও করোনাভাইরাস বাস্তবতায় সিঙ্গাপুরে প্রবাস জীবন

শেয়ার করুন

মনে করুন, আপনি অসুস্থ৷ জ্বর, সর্দি নাক দিয়ে ক্রমাগত পানি ঝরবে। এই নাকের পানি যেন আজ থামবার নয়। আপনি তখন উপলব্ধি করবেন কেউ একজন আপনার পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে৷ আপনার মাথায় জলপট্রি দিয়ে আপনাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলবে, ভয় নেই আমি আছি তোমার পাশে। কিন্তু দূর পরবাসে কোথায় পাবেন এমন আপনজন।

এখানে সবাই যার যার কাজ নিয়ে ব্যস্ত৷ সকালে ঘুম থেকে জেগে যখন অসুস্থবোধ করবেন, তখন অফিসে কল দিয়ে জানাবেন আপনি অসুস্থ৷ আপনার অসুস্থতার কথা শুনে বস রেগে বলবে, মিথ্যা অজুহাত দাড় না করিয়ে অফিসে চলে আসো৷ আপনি তখন বলবেন, বস আমার জ্বর, সর্দি। বস জ্বরের কথা শুনে গলার স্বর পরিবর্তন করে বলবে, তাহলে অফিসে আসার প্রয়োজন নেই৷ ডাক্তারের কাছে যাও৷ ডাক্তার কি বলে আপডেট দিও। কারন সিঙ্গাপুরে করোনাভাইরাসের কারনে সবাই ভয়ে আছে। কেউ চায় না একজন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে যেতে৷

আপনি সিদ্ধান্ত নিবেন ডাক্তারের কাছে না গিয়ে নিজেই দুটো প্যানাডল খেয়ে শুয়ে থাকবেন। সিঙ্গাপুর প্রবাসীদের পরম বন্ধু এই প্যানাডল৷ অনেকেই অবশ্যই দেশ থেকে আসার সময় নাপা, প্যারাসিটামল নিয়ে আসে৷ আপনিও নিয়ে এসেছিলেন কিন্তু আপনার নিয়ে আসা নাপা, প্যারাসিটামল শেষ৷ তাই আপনি প্যানাডল খেয়ে ঘুমানোর সিদ্ধান্ত নিবেন।

কিন্তু আপনার শরীরটা এতই খারাপ লাগবে যে বিছানায় উঠে বসার মতো শক্তি পাবেন না। ডাক্তারের কাছে গেলে ৫ দিন মেডিকেল লিভ পেতেন৷ সিঙ্গাপুর সরকারের নিয়ম অনুযায়ী জ্বর,সর্দি হলে ৫ দিন মেডিকেল লিভ পাবেন৷

তবুও ডাক্তারের কাছে না গিয়ে দুইটা প্যানাডল খেয়ে শুয়ে থাকার সিদ্ধান্ত নিবেন৷ ড্রয়ার খুলে দুইটা প্যানাডল খেয়ে শুয়ে পড়বেন। আস্তে আস্তে গভীর ঘুমে তলিয়ে যাবেন। ঘুম থেকে জেগে দেখবেন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামবে। অফিস শেষে লোকজন রুমে ফিরতে শুরু করবে৷

আপনার মন বলবে এক গ্লাস কুসুম গরম পানির সাথে আদা, লবন খেলেই আপনি সুস্থ হয়ে উঠবেন৷ কিন্তু কে আমাকে এক গ্লাস পানি কে এনে দিবে!

হঠাৎ একজন দরজা খুলে রুমে প্রবেশ করবে। আপনি তাকে বলবেন, ভাই আমাকে এক গ্লাস গরম পানিতে আদা, লবন মিশ্রিত করে দিতে পারবেন? তিনি আপনার কাছে এসে বলবে, ভাই আপনার কি জ্বর? আপনি জবাব দিবেন, হ্যাঁ ভাই জ্বর, সর্দি গলা ব্যথায় মরে যাচ্ছি৷

সে লাফ দিয়ে দূরে সরে দাঁড়িয়ে বলবে, ভাই তাহলে তো আপনার করোনাভাইরাসে আক্রমণ করছে৷ আপনি কিছু বলার আগে সে দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াবে।

রুমে কাউকে প্রবেশ করতে দিবে না। যে আসবে তাকেই সে থামিয়ে বলবে, ঘরে আইসেন না ভাইকে করোনাভাইরাস আক্রমন করেছে৷ তার কথা শুনে সবাই আতঙ্কিত হয়ে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকবে। আপনি টের পাবেন সবাই দরজার কাছে গোল হয়ে পরামর্শ করবে৷ একজন ডরমিটরির সিকিউরিটিকে ডাকতে যাবে৷

আপনি উপলব্ধি করবেন, এতদিন যাদের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে মিশেছিলেন তারাই আপনাকে করোনাভাইরাস আক্রমণ করেছে- এই সন্দেহে কাছে আসবে না। কেউ কেউ বলবে, এই মিয়া তো লোক সুবিধার না। নিজে মরবে সাথে আমাগো নিয়া মরবে৷ ডাক্তারের কাছে না গিয়া রুমে শুইয়া আছে কেন! তাদের কথায় আপনি ব্যথিত হয়ে ভাববেন, হায়রে মানুষ মৃত্যু ভয়ে আজ পরম বন্ধুকেও দূরে ঠেলে দিচ্ছে৷ আপনার মনে হবে এই পৃথিবীতে কেউ আপন নয়, সবাই ক্ষনিকের জন্য আপন হবার অভিনয় করে৷

এমনসময় সিকিউরিটি এসে বলবে, তোমাকে ডাক্তারের কাছে পাঠাচ্ছি৷ তুমি অসুস্থ সারাদিন আমাদের জানালে না কেন? তারা আপনার প্রতি বিরক্ত প্রকাশ করবে। তাদের ভাবসাব এমন আপনি অসুস্থ হয়ে ঘোরতর অপরাধ করেছেন। আপনি এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি সম্মুখীন হবেন যেখানে মুখে কিছু বলার মতো ভাষা খুঁজে পাবেন না।

কিছুক্ষণ পর এম্বুলেন্স এসে গেটে দাঁড়াবে৷ কয়েকজন লোক এপ্রোন পরিধান করে রুমে এসে আপনাকে স্ট্রেচারে করে নিয়ে এম্বুলেন্সে বসাবে। আপনাকে নিয়ে আসার সময় কৌতূহলী লোক, রুমমেটরা ছবি তুলবে৷

এম্বুলেন্স আপনাকে নিয়ে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা দিবে কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই আপনার ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়বে। সবাই ক্যাপশন দিবে আজকে অমক ডরমিটরিতে এক বাংলাদেশী ভাই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে৷ সবাই তার জন্য দোয়া করবেন।

রুমমেটরা আপনার সাথে তাদের আগের ছবি গোল মার্কে আপনাকে চিহ্নিত করে ফেসবুকে পোস্ট করে লিখবে, এই ভাইটি আজ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত সবাই তার জন্য দোয়া করবেন।

আপনি জানবেন না আপনার কি হয়েছে অথচ তারা আপনাকে করোনাভাইরাস আক্রান্ত বলে সনাক্ত করে ছবি ছড়িয়ে দিবে৷ আর তাদের পোস্টে হাজার হাজার লাইক কমেন্ট পড়বে৷ যারা আপনাকে চিনে তারা ম্যাসেজ দিয়ে সান্তনা দিবে।

হাসপাতালে যাবার পর ডাক্তার আপনাকে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে বলবে, “অতিরিক্ত টেনশন, কাজের চাপ ও শরীর দূর্বলতার জন্য আপনি অসুস্থ হয়েছেন৷ আপনাকে ঔষধ দিচ্ছি নিয়মিত খেলে খুব শীঘ্রই সুস্থ হয়ে যাবেন।” ডাক্তারের কথা শুনে আপনি স্বস্থি পাবেন। লোকজনের কাছ থেকে ম্যাসেজ, আর ফেসবুকের পোস্ট দেখে আপনি ভেবেছিলেন সত্যি আপনাকে করোনাভাইরাসে সংক্রমণ করেছে৷

কয়েকদিনের মধ্যেই আপনি সুস্থ হয়ে উঠবেন৷ কিন্তু রুমের লোকজন আগের মতো আপনার সাথে মিশবে না।

সুস্থ হয়ে ছুটিতে দেশে যাবেন৷ গ্রামে যাবার পর সবাই আপনাকে দেখে দৌঁড়ে পালাবে আর বলবে, ভাই করোনাভাইরাস নিয়ে আসছে সবাই পালাও। যে মানুষগুলো আপনার খুব কাছের ছিলো তারাও আপনাকে দেখে ভয়ে পালাবে৷

রাস্তাঘাটে কেউ আপনার সামনে আসবে না। বাড়িতে পৌঁছানোর আগেই গ্রামবাসী আপনাকে ঘেরাও করে দাঁড়াবে৷ কেউ কেউ বলবে গ্রামের সবাইকে বাঁচাতে তাকে পুড়িয়ে হত্যা করা হউক। আবার কেউ বলবে পিটিয়ে হত্যা করে লাশ পুড়িয়ে ফেলা হউক।

আপনি চিৎকার করে বলবেন আমি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হইনি। আমার স্বাভাবিক জ্বর হয়েছিল। কিন্তু কেউ আপনার কথা শুনবে না। লোকজনের দিকে তাকিয়ে দেখবেন লোকজন লাঠি, খন্তি, কোদাল,দা,শাবল, কেরোসিন, লাইটার হাতে দাঁড়িয়ে আছে। আপনি ভয়ে থরথর করে কাঁপবেন। লোকজন আস্তে আস্তে আপনার দিকে এগিয়ে আসবে। আপনি বাঁচার আকুতি নিয়ে চিৎকার করে উঠবেন।

চোখ দুটি খুলে দেখবেন আপনি বিছানায় শুয়ে আছেন৷ এমন ভয়াবহ দু:স্বপ্ন দেখার পর আপনি সত্যি কাঁপতে থাকবেন। চারপাশের গুজবের কারনে আপনি অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করেছেন। অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করার কারনেই আপনি এমন ভয়াবহ দু:স্বপ্ন দেখবেন। আপনি মনে মনে ভাববেন সব শঙ্কা দূর হয়ে সুদিন আসবে একদিন।

  • ওমর ফারুকী শিপন, সিঙ্গাপুর।
শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.