Featured বাংলাদেশ থেকে ভ্রমণ রঙ্গের দুনিয়া

তালাশের পর মুনজুরুল করিমের নতুন অনুষ্ঠান ‘মুভ উইথ মুনজুরুল করিম’

শেয়ার করুন

একটি সংবাদ মাধ্যম বরাবরই সাধারণ মানুষকে সব ধরণের তথ্য সরবরাহ করতে চেষ্টা করে। কিন্তু এত এত সংবাদ মাধ্যমের ভীড়ে একঘেয়ে অনুষ্ঠানের এক চক্রের মাঝেই যেন কমবেশি সবাই-ই আটকে পড়ছিল বারবার। এই চক্রাকার সীমানা থেকে বের হয়ে আসার জন্য আপ্রাণ পরিশ্রম করেছেন এবং এখনো করছেন একজন মানুষ, যার উদ্দেশ্য ‘নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়া’।

নাম তার মুনজুরুল করিম। জ্বি, বাংলাদেশের টেলিভিশন জগতে অপরাধ বিষয়ক এবং অনুসন্ধানমূলক অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন হয়েছে যার হাত ধরে, ইনিই সেই ব্যক্তি। দীর্ঘ ১৩ বছরেরও বেশি সময় দুর্দান্তভাবে নিজের প্রতিটি দিনকে আগের দিনের চেয়ে আরেকটু সুন্দর করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন তিনি। দর্শকখ্যাতির তুঙ্গে থাকা মুহূর্তে এই মানুষটি হঠাৎ ছেড়ে দিয়েছেন দেশের সবচেয়ে বড় অনুসন্ধানমূলক অনুষ্ঠান ‘তালাশ’। কিন্তু কেন? আজ থাকছে তার উত্তর।

শুরুর গল্পটা যেখানে

বলা হয়ে থাকে, একটি বৃক্ষ যত বিশালই হোক না কেন, তার জীবনের শুরুটা হয় একটি ছোট্ট বীজ থেকেই। যে সময়ের কথা বলছি তখন এতগুলো টেলিভিশন চ্যানেল ছিল না। ২০০৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে পড়া অবস্থাতেই টেলিভিশন চ্যানেল বাংলাভিশনের মাধ্যমে যোগ দিলেন সাংবাদিকতায়। চ্যানেলটি তখন পরীক্ষামূলক সম্প্রচারে ছিল। সেই অবস্থাতেই ২০০৬ সালের মার্চে যোগ দিলেন এনটিভিতে। ক্রাইম রিপোর্টিং এর মাধ্যমে শুরু হলো তার পেশাদার সাংবাদিকতার জীবন। তখন সুপন রায়ের উপস্থাপনায় অপরাধ বিষয়ক অনুষ্ঠান ‘ক্রাইম ওয়াচ’ খুব জনপ্রিয়। আরো বেশ কিছুদিন পর, সুপন রায় এনটিভি ছেড়ে চলে গেলে কর্তৃপক্ষ এই তরুণ সাংবাদিকের দিকে ‘ক্রাইম ওয়াচ’ উপস্থাপনার চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিলেন। সেই চ্যালেঞ্জে জয়ী হওয়া একটা দীর্ঘ সংগ্রাম আর সাধনার পথ ছিল। তারপর একটা সময় ঠিকই মানিয়ে নিলেন।

বিরতি নাকি ছন্দপতন?

নিজেকে মানিয়ে নেয়ার পর উপস্থাপনার ছন্দ তৈরি হলো। জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা অবস্থাতেই ছেড়ে দিলেন ‘ক্রাইম ওয়াচ’ উপস্থাপনা। এর পেছনের কারণ আর কিছুই নয়, একটি অনুষ্ঠানের মধ্যে নিজেকে আটকে ফেলতে চাননি সঞ্চালক। তাই নিয়েছেন বিরতি। তবে সেই টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠানটিতে আর দেখা যায়নি তাকে।

কি ছিল সেই নতুন মোড়?

নাহ, ৪ মিনিট নয় দীর্ঘদিনের বিরতি নিয়ে তবেই ফিরেছিলেন তিনি। ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন নামক আরেকটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে ২০১১ সালে যোগ দেন এই সাংবাদিক। যোগ দিয়েই ছোটখাটো একটি বিপ্লব বইয়ে দিলেন টেলিভিশনের পর্দায়। টেলিভিশন চ্যানেলের সংখ্যা তখন বেশ বেড়ে গেছে। কিন্তু  ঠিকই প্রতি শুক্রবার রাত সাড়ে ৯ টায় একঝাঁক দর্শক বসে যেতেন টিভি সেটের সামনে। কারণ অবশ্য একটাই, এই সময় টিভির পর্দায় আসে ‘তালাশ’। উপস্থাপকের ডায়ালোগ যেভাবে উপস্থাপন করা হয়, তাতে পুরো অনুষ্ঠানে নতুন এক মাত্রা যোগ করে প্রতিবার।

  • গুনে গুনে ৪ মিনিট পর আসছি।
  • আজ চলে যাচ্ছি, কিন্তু যাচ্ছি না।
  • আপনার অনুসন্ধানী মনের দরজা-জানালা খোলা রাখুন, কিছু বেরিয়ে এলে আমাদেরকে জানান। তালাশ টিম থাকবে আপনার সাথে।

এই কথাগুলো মানুষের মুখে মুখে ফিরতে থাকে। তালাশের এই ডায়লোগগুলো জানে না এমন মানুষ এদেশে খুঁজে পাওয়া খুব দুষ্কর। এত এত ভালবাসা, উষ্ণ অভ্যর্থনা পাওয়ার পরও নিজ হাতে গড়ে তোলা এই অনুষ্ঠানটিকেও ছেড়ে দিলেন উপস্থাপক স্বয়ং। কিন্তু কেন?

এর উত্তর দিলেন মুনজুরুল করিম নিজেই।

কেন এত দর্শকপ্রিয় হওয়া সত্ত্বেও তালাশ থেকে অব্যাহতি?

দর্শকপ্রিয়তা একটা সাময়িক মোহ, আমার কাছে। আসলে কাজটাই থেকে যায়। আমি আরো কাজ করতে চেয়েছি। নতুন নতুন সব সৃষ্টির মধ্যে ডুবে থাকতে চাই। জীবন একটাই। এই জীবনে নির্দিষ্ট একটা ছকের মধ্যে আটকে যাওয়ার কোন মানে হয় না।

তাহলে দর্শক নতুন কি পেতে যাচ্ছে?

‘মুভ উইথ মুনজুরুল করিম’ নামে নতুন একটা অনুষ্ঠান শুরু করতে যাচ্ছি এই ডিসেম্বরে। আমার নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেলে সপ্তাহে একটা করে পর্ব প্রচারিত হবে। এটা আসলে একটা সীমানা পেরোনোর অনুষ্ঠান। বলতে পারেন, আমার নিজের স্বপ্নের মতো করে তৈরি করার চেষ্টা করছি ‘মুভ উইথ মুনজুরুল করিম’।

এটা কি তবে ট্রাভেল শো?

আপাত:দৃষ্টিতে মনে হবে, এটা একটা ট্রাভেল শো। কিন্তু আমার কাছে তা মনে হয় না। ভ্রমণের গল্প থাকবে। গল্পে গল্পে আরো অনেক কিছুই চলে আসবে। তিনটি শব্দ এই অনুষ্ঠানের মূলমন্ত্র। শব্দগুলো হলো- ট্রাভেল, ইনফরমেশন, এডুকেশন। তাই এটাকে শুধুই ট্রাভেল শো বলতে চাই না আমি। এটা এমন একটা অনুষ্ঠান হবে যেখানে পিতা-মাতা তাদের সন্তানকেও এই অনুষ্ঠান দেখার পরামর্শ দিতে পারে।

এতদিন টেলিভিশনে কাজ করে, ইউটিউব চ্যানেলকে কেন বেছে নিলেন?

এখানে স্বাধীনতা অনেক বেশি। আমি যেসব চ্যানেলে কাজ করেছি, সেগুলোতেও আমার কাজের স্বাধীনতা ছিল। কিন্তু আমার কাছে মনে হয় স্বাধীনতার সাধ মানুষের কখনো পূরণ হয় না। একজন মুক্ত, স্বাধীন মানুষও একটা সময় মুক্তি চায়। এছাড়া বাস্তব কথা যদি বলি তাহলে বলবো, এমন একটা অনুষ্ঠানের অনুশীলন আমার ইউটিউব চ্যানেলে আগেই করেছি। সেখানে এখন ৩ লাখ ১১ হাজারেরও বেশি সাবস্ক্রাইবার আছে। চ্যানেলটিতে আমি যতগুলো ভিডিও প্রকাশ করেছি তার মধ্যে ভ্রমণ সংক্রান্ত ভিডিওর দর্শকই বেশি। তাছাড়া, বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প নিয়ে এখনো খুব বেশি কাজ হয়নি। আমি মনে করি এখানে আরো অনেক কাজের সুযোগ আছে। আমি সেটাই করার চেষ্টা করবো।

দর্শক এই অনুষ্ঠান কেন দেখবে?

ভালো কথা বলেছেন। আমি মনে করি, মানুষ ফুটবল খেলা যে কারণে দেখে ঠিক সেই কারণেই মানুষ তালাশ দেখতো এবং ঐ কারণেই মানুষ ‘মুভ উইথ মুনজুরুল করিম’ও দেখবে। আমি বলতে চাচ্ছি, অনুষ্ঠানের এগিয়ে চলার গতিই এর সৌন্দর্য্য। এই অনুষ্ঠানেও মানুষ গতিশীল গল্পের ভেতরে ঢুকে পড়বে এবং তার সাথে নিজেরাও চলবে।

অপরাধ বিষয়ক বা অনুসন্ধানমূলক অনুষ্ঠানের মোড়ক থেকে বের হয়ে, স্রোতের বিপরীতে এমন একটা অনুষ্ঠান করা- একটু বেশিই চ্যালেঞ্জিং নয় কি?

হ্যাঁ, চ্যালেঞ্জিং তো বটেই। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিজের এক ধরণের পরিচয় ঝেড়ে ফেলা এবং নতুন পরিচয়ের সাথে মানিয়ে নেয়া। কিন্তু এখন পর্যন্ত আমার জীবনে ঐ চ্যালেঞ্জ নেয়ার স্বাধীনতাটাই উপভোগ করতে চেয়েছি।

এখানেও কি থাকছে নির্ধারিত সময়ের বিরতি?

যে কোন প্রিয় অনুষ্ঠানে বিরতির সময়টাই মনে হয় দর্শকের কাছে সবচেয়ে বিরক্তিকর। এই জায়গাটা নিয়ে অনেকদিন ধরেই ভাবছিলাম। পরে একটা উপায় বের করেছি। এখানে বিরতির নির্দিষ্ট সময় থাকবে কি না এখনই বলতে পারছি না। তবে, এটুকু নিশ্চিত করতে পারি যে বিরতিও একটা দেখার ব্যাপার হবে।

শুধুই কি বাংলাদেশের দর্শনীয় স্থান সম্পর্কেই জানবে দর্শক?

নাহ, আগেই হয়তো বলেছি যে এটা সীমানা পেরোনোর অনুষ্ঠান। এখানে কোন বিবেচ্য বিষয় নয়। আর দর্শনীয় স্থানও বিবেচ্য বিষয় নয়। ধরুন, একটা মানুষের জীবন সংগ্রামও এই অনুষ্ঠানের কোন এক পুরো পর্বের বিষয় হয়ে যেতে পারে।

অন্য ১০টি ট্রাভেল শো এর সাথে এর ব্যতিক্রমের জায়গাটা আসলে কোথায়?

খুব পরিকল্পনা করে ব্যতিক্রমী কোন অনুষ্ঠান তৈরির চেষ্টা আমি কখনোই করিনি। অনুষ্ঠানের ধারাবাহিকতাতেই নিজের চরিত্র তৈরি হয়েছে। বিশ্বাস করি, এবারও হবে। তবে এই অনুষ্ঠানে প্রবাসীদের অনেক সম্পৃক্ততা থাকবে।

এই অনুষ্ঠানেও কি আমরা নতুন কিছু ডায়ালোগ পাবো?

হা হা হা, খুব পরিকল্পনা করে কেউ ডায়ালোগ তৈরি করতে পারে কি না জানি না। তবে আমি পারি না। স্ক্রিপ্ট লিখতে লিখতে, রাস্তায় চলতে চলতে বা কখনো আনমোনা থাকা অবস্থাতেও এসব দু’এক লাইন মাথায় এসে যায়। ভাগ্য ভালো হলে, মুভ উইথ মুনজুরুল করিম এর ক্ষেত্রেও তা হতে পারে।

সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ০৯ ডিসেম্বর রাত ১০:০০ টায় মুনজুরুল করিমের নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেলে ‘মুভ উইথ মুনজুরুল করিম’ এর প্রথম পর্ব প্রচারিত হবে। থাকছে কুইজ এবং সঠিক দিয়ে বিজয়ীর জন্য পুরষ্কার। প্রথম পর্বের পর সাপ্তাহিক এই অনুষ্ঠান প্রচারিত হবে প্রতি শুক্রবার রাত ১০ টায়।

ইউটিউব চ্যানেলটির লিংক: https://www.youtube.com/munzurulkarimtv

নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রত্যয় হয়তো কিছু মানুষকে সারা জীবনই তাড়িয়ে বেড়ায়। এই ব্যতিক্রমী ‘মুভ উইথ মুনজুরুল করিম’ এর সাথে দর্শকদের ‘মুভ’ করতে সময় বাকি আছে আর মাত্র ৬ দিন। এবার তাহলে দর্শকরাও নিয়ে নিতে পারেন ছুটে বেড়ানোর প্রস্তুতি।

  • সুমাইয়া হোসেন লিয়া, প্রবাস কথা, ঢাকা।
শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.