Featured এশিয়া মালয়েশিয়া

ডিজিটাল প্রতারণার ভয়ঙ্কর ফাঁদ, কেন টার্গেট করা হয় প্রবাসীদের?

শেয়ার করুন

প্রতারণা হলো কাউকে ঠকিয়ে নিজে লাভবান হওয়া৷ বাংলাদেশে পথেঘাটে প্রকাশ্য দিবালোকে চলে এই প্রতারণা। মাঝেমাঝে শুনি অজ্ঞাত পার্টির কবলে পড়ে সব খুয়ালেন জৈনিক পথচারী। তাছাড়া মাঝেমাঝে প্রতারকরা রিক্সাচালক সেজে সহজ সরল যাত্রীদের কৌশলে সবকিছু কেড়ে নেয়। এই প্রতারকদের প্রধান টার্গেট নারীরা৷

দেশ এখন ডিজিটাল হয়েছে তাই প্রতারণায় এসেছে নতুন কৌশল। এখন প্রতারকরা অনলাইন ভিত্তিক প্রতারণা করে৷ আর এই প্রতারণার জন্য রয়েছে সংঘবদ্ধ চক্র। এদের প্রধান টার্গেট প্রবাসীরা৷ এই চক্র সংঘবদ্ধভাবে প্রবাসীদের সাথে প্রতারণা করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এরা প্রবাসী নামে বিভিন্ন ফেইসবুক পেইজে গ্রুপ খুলে প্রবাসীদের এড করে।

সেসব পেইজ ও গ্রুপে কিছু মেয়েকে লাইভে আসার জন্য ঘন্টা ভিত্তিক চুক্তি করে। দেখা গেছে একটি মেয়েকে এক ঘন্টা লাইভে থাকার জন্য পাঁচশ কিংবা এক হাজার টাকা দেওয়া হয়। সেই লাইভ প্রোগ্রাম থেকে এই সব প্রতারক চক্র কিছু সহজ সরল প্রবাসীদের টার্গেট করে।

তাছাড়া অনেক সময় অনলাইনে অফার দেয় এক ঘন্টা অডিও কলে অন্তরঙ্গ চ্যাট করলে বিনিময়ে পাঁচশ টাকা দিতে হবে। আর ভিডিও কলে অন্তরঙ্গ চ্যাট করলে এক ঘন্টায় এক হাজার টাকা দিতে হবে। প্রবাসীরা একাকী নি:সঙ্গ জীবনযাপন করে তাই নি:সঙ্গতা দূর করতে এসব ফাঁদে পা দেয়। আর যারা প্রবাসে থাকে তারা পাঁচশত কিংবা এক হাজার টাকা দিতে দ্বিধাবোধ করে না।

দেশ ছেড়ে প্রবাসে অবস্থানরত প্রবাসীদের ফাঁদে ফেলা খুবই সহজ। একজনকে ফাঁদে ফেলে ইমুতে চলে অন্তরঙ্গ ভিডিও চ্যাট ও কথাবার্তা। অনেকসময় প্রবাসীরা যদি টাকা দিতে অনীহা প্রকাশ করে তাহলে হুমকি দেওয়া হয় যে, ভিডিও চ্যাটের স্কিন শট ফেইসবুকে পোষ্ট করা হবে। তাই এক প্রকার বাধ্য হয়েই সহজসরল প্রবাসীরা তাদের টাকা দেয়।

কিছুদিন আগে একটি মেয়ে আমাকে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠায়৷ মেয়েটির প্রোফাইল ঘেটে দেখলাম সে যথেষ্ট রুপবতী। আর রুপবতী মেয়েদের বন্ধু হতে কে না চাইবে৷ আমি সাথে সাথে তাকে এড করি৷ কিছুদিন পর শুরু হয় আমাদের চ্যাট৷ হঠাৎ একদিন সে বলল, মোবাইলটা ভালো না একটা মোবাইল পাঠাও। আমি বললাম, আমার কাছে টাকা নেই।

এরপর আমাদের চ্যাট বন্ধ হয়ে যায়। আমি ম্যাসেজ দিলেও সে রিপ্লাই দেয় না। আবার হঠাৎ একদিন সে আমাকে ম্যাসেজ পাঠিয়ে বলল, আমার মা হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য জরুরি টাকা লাগবে। আমি অপারগতা প্রকাশ করলাম এবার সে আমাকে অশ্লীল ভাষায় গালাগালি করে ব্লক করে দিলো। আমি নিশ্চিত আমার জায়গায় অন্য কেউ হলে তাকে মোবাইল এবং টাকাও দিতো।

এতো গেলো বাংলাদেশে প্রতারণার নমুনা। এখন অনলাইন ভিত্তিক সারাবিশ্বেই চলছে প্রতারণা। আপনি সাবধান না হলে সহজেই এই প্রতারকদের ফাঁদে পা দিয়ে সর্বোচ্চ খুয়াবেন।

সিঙ্গাপুরের মতো দেশেও অভিবাসী ও স্থানীয়রা এই প্রতারনার স্বীকার হচ্ছে৷ সিঙ্গাপুরের জাতীয় দৈনিক স্ট্রেইট টাইমস এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালের তুলনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছদ্মবেশী প্রতারকদের দৌরাত্ম্য নয় গুন বেড়েছে৷ ২০১৭ সালে ভুক্তভোগী ছিল ৭১ জন ২০১৯ সালে প্রথম ১১ মাসে তা বেড়ে দাড়ায় ৬৭২ জন৷

২০১৭ সালে ছদ্মবেশে প্রতারণা সংক্রান্ত ১৮৮ টি অভিযোগ জমা পড়ে৷ এবং গত বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বরে ৪০১ টি অভিযোগ পাওয়া গেছে। একই সময়ে অর্থসংক্রান্ত প্রতারণা ১ কোটি ২৮ লক্ষ থেকে ১ কোটি ৮৮ লক্ষ ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে।

এই তথ্য শুধু প্রাপ্ত অভিযোগের ভিত্তিতে৷ অনেকেই প্রতারিত হোন কিন্তু আত্নমর্যাদার ভয়ে তা কারো সাথে শেয়ার করেন না এমনকি থানায় অভিযোগও করেন না৷ সিঙ্গাপুরে ২০১৯ সালে অর্থ সংক্রান্ত প্রতারণা বেড়েছে ৪৩ গুন। ১৬৮ হাজার ডলার থেকে ৭ কোটি ২ লক্ষ ডলারে উন্নীত হয়েছে৷ গত ৬ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্র এবং আইনমন্ত্রী শানমুগাম সংসদে এক এক প্রশ্নের জবাবে এ তথ্য দেন৷

২০১৯ সালে তুলনামূলকভাবে তরুণদের টার্গেট করা হয়৷ যাদের বয়স ৩০ থেকে ৪০ এর মধ্যে। প্রতারকরা এতই স্মার্ট যে তারা সহজ সরল অভিবাসী ও স্থানীয়দের টার্গেট করে তাদের প্রতারণা চালিয়ে যায়৷ এই প্রতারকদের হাত থেকে রক্ষা পেতে স্থানীয় প্রশাসন বিভিন্ন ক্যাম্পেইন পরিচালনা করে। তবুও এই প্রতারণা বন্ধ করা যাচ্ছে না।

অনলাইনে একটি অসচেতনতাই আমাদের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে৷ তাই আসুন নিরাপদ অনলাইন ব্যবহার করে প্রতারণা থেকে নিজেকে এবং পরিচিতজনদের রক্ষা করি৷

  • ওমর ফারুকী শিপন, সিঙ্গাপুর।
শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.