Featured এশিয়া খেলা বাংলাদেশ থেকে ভারত

‘চিরচেনা’ ভারতকে হারিয়ে ‘বিশ্বকাপজয়ী’ বাংলাদেশ!

শেয়ার করুন

ক্রিকেটের যেই ফরম্যাটই হোক না কেন, ভারত যেন বাংলাদেশের চিরচেনা প্রতিপক্ষ। এশিয়া কাপ থেকে বিশ্বকাপ, কোথাও যেন ভারত-বাংলাদেশের খেলা ছাড়া জমেই না। তবে প্রতিবার এই পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কাছেই অল্প কিছু রানের ব্যবধানে এক কঠিন হার বাংলাদেশের ভাগ্যে জুটেই যায়।

তবে এবার সেই ‘খরা’ কাটিয়েই দিলো অনূর্ধ্ব-১৯ যুবদল! এই প্রথম আইসিসির কোনো ইভেন্টে বড় ট্রফি জয়ের স্বাদ পেল বাংলাদেশ। ফাইনালে ভারতকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ-চ্যাম্পিয়ন টাইগাররা!

পুরো ক্রিকেট বিশ্বের নজর যখন এই খেলায়

এই পুরো অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের আসরটিই ছিল জমজমাট। কোনো দলই যেন নিজেদের দুর্বল প্রমাণ করতে রাজি নয়। শেষমেষ আসরের বাকি সব দলকে হারিয়ে আসরের দুই অপরাজিত দল উঠে এলো ফাইনালে।

তবে শুধু এই আসর না, এই ২০২০ বিশ্বকাপের আগের ৯টি ম্যাচের কোনোটিতেই হারেনি বাংলাদেশ কিংবা ভারত। কিন্তু দিনশেষে বিজয়ের পতাকা উঠলো একটি মাত্র দেশের হাতেই!

সর্বোচ্চ বিশ্বকাপজয়ী ভারত, তবে…

পঞ্চমবারের মত চ্যাম্পিয়ন হতে বড্ড পরিকর ছিল ভারত। ফাইনালের শুরুতেই টস জিতে ক্যাপ্টেন আকবর আলী বোলিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন। আগের রাতে বৃষ্টি হওয়ায় পরিপক্ব সিদ্ধান্ত নেন আকবর। পেয়েছেন তার ফলও। ইনিংসের ষষ্ঠ ওভারেই দিবায়ানস সাক্সেনাকে ২ রানে ফিরিয়ে দেন অভিষেক দাস।

দ্বিতীয় উইকেটে ইয়াশবি জশওয়াল ও তিলাক বার্মা জুটি থেকে আসে ১০২ রান।  দলীয় ১০৩ রানের মাথায় ব্রেক-থ্রু এনে দেন যুব দলের সাকিব। ৩৮ রানে তিলক বার্মাকে ফেরান এই পেসার।

টাইগারদের বোলিং এর আঘাতে ভারতের উইকেটের পতন শুরু হলেও, ক্রিজের অন্য প্রান্তে দেয়াল হয়ে দাঁড়ায় ইয়াশবি জশওয়াল। ৩৯.৫ ওভারের মাথায় সেমি-ফাইনালের সেঞ্চুরিয়ান জশওয়াল ৮৮ রানে সাজঘরে ফেরেন।এই  জশওয়ালের ব্যাটে ভর করেই ৪৭.২ ওভারে ১৭৭ রানে গুটিয়ে যায় ভারতের ইনিংস। বাংলাদেশের হয়ে অভিষেক নেন ৩ উইকেট। ২টি করে উইকেট নেন শরিফুল ও সাকিব। ১উইকেট নেন রকিবুল হাসান। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের পঞ্চমবারের মত বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন যেন ওখানেই ভেঙ্গে দেয় বাংলাদেশ।

আত্মবিশ্বাসী টাইগাররা, জয় যেন তাদেরই প্রাপ্য

৫০ ওভারের খেলা, লক্ষ্য মাত্র ১৭৮ রান। দুই টাইগার ওপেনার তানজিদ হাসান ও পারভেজ ইমন মিলে জুটি গড়েন ৫০ রানের। টাইগাররা যেন হেসেখেলেই জিতে নিবে ট্রফি। কিন্তু বিধিবাম। ধীরে ধীরে এই ছোট লক্ষ্যই হয়ে ওঠে ভারী। শুরুটা দুর্দান্ত হলেও হঠাৎ-ই খেই হারাতে থাকে বাংলাদেশ।

এক প্রকার হারতে বসা ভারতকে উদ্ধার করেন রবি বিষ্ময়। ৮ ওভার পাঁচ বলের মাথায় ওপেনার তানজিদ ইমনকে বিদায় করেন ১৭ রানে। এরপর পারভেজ ইমন চোট পেয়ে মাঠ ছাড়েন ২৫ রানে। এর মাঝে বাংলাদেশের টপ-অর্ডারই ভেঙে দেন বিষ্ময়। মাহমুদুল হাসান জয়কে ৮, তৌহিদ হৃদয়কে শূন্য আর শাহাদাৎ হোসেনকে ১ রানে সাজঘরে ফেরান এই লেগ স্পিনার।

শামিম হোসেন আর আকবর আলীর জুটি আশার আলো দেখালেও তা বেশি সময় টিকেনি। সুশান্ত মিশ্রার বলে ক্যাচ দিয়ে শামিম ফেরেন ৭ রানে। শামিমের বিদায়ের পর আকবরকে সঙ্গ দিতে নামেন অভিষেক দাস। কিন্তু থাকতে পারলেন না বেশীক্ষণ। এলোমেলো শর্টে ক্যাচ দিয়ে তিনিও বিদায় নেন ৭ রান করে।

আবারও ‘সেই’ চিরচেনা ভারত?

১০২ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে বিপদে পড়ে যায় বাংলাদেশ। এই বিপদে পড়া দলকে টেনে তোলার চেষ্টায় আবারও মাঠে আসেন চোটে পড়া ইমন। দলের কঠিন মুহূর্তে আকবর আলীর সঙ্গে জুটি গড়েন ৪১ রানের। এক প্রকার মিইয়ে যাওয়া  জয়ের স্বপ্নটা আবারও উজ্জ্বল করে এই জুটি। কিন্তু চোট নিয়ে আর কতক্ষণ? ৭৯ বলে ৪৭ রানের ইনিংস খেলে সাজঘরে ফিরে যান পারভেজ।

একে তো হাতে উইকেট আছে মাত্র ৩ টি, অপরদিকে বৃষ্টি আসার সমূহ সম্ভাবনা। সবই যেন ছিল বাংলাদেশের প্রতিকূলে। ইমনের আউটের পর জয় নিয়ে চিন্তায় পড়ে যায় বাংলাদেশ।  আবারও যেন ভারতের কাছে হারকে ‘নিয়তি’ মেনে নিতেই প্রস্তুত হচ্ছিল পুরো বাংলাদেশ।

স্বপ্নের জয় এলো স্বপ্নের মতই

কিন্তু দলনেতা যেন হাল ছাড়েননি। রকিবুল হাসানকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যান আকবর। এই জুটি থেকে আসে ২৭ রান। জয় থেকে মাত্র ১৫ রান দুরে থাকার সময়ই বৃষ্টির হানায় খেলা সাময়িক বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

সে সময় বৃষ্টি আইনে ১৬ রানে এগিয়ে বাংলাদেশ। খেলা আর শুরু না হলে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন—এমন এক সমীকরণ জেনেই সাজঘরে ফিরলো বাংলাদেশ। বৃষ্টি দ্রুত থেমে গেল, কমে এলো লক্ষ্যও। বৃষ্টি আইনে নতুন লক্ষ্য, জয়ী হতে ৩০ বলে লাগবে ৭ রান।

গোটা আসরে সবমিলিয়ে মাত্র ২১ রান করা আকবর আলী যেন অপেক্ষা করেছিলেন এই সময়ের। ফাইনালে এসে ৭ রান তুলতে দেরি করেননি একটুও। তার ব্যাটের জোরেই বাংলাদেশ পৌঁছে যায় বিশ্বকাপ জয়ের দ্বারপ্রান্তে।

অধিনায়কের অপরাজিত ৪২ রানের ইনিংসে ভর করে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ভারতকে ৩ উইকেটে হারিয়ে ইতিহাসে নাম লেখায় এই টাইগাররা!

পুরো আসরের কোথাও যেন ‘চ্যাম্পিয়ন’দের কমতি ছিলনা।  ১৬ কোটি ভক্তের উচ্ছ্বাসকে সাথে নিয়ে বিশ্বে অপর প্রান্তে জয়ী হয়ে এলো এই বাংলাদেশ যুবদল। জয়ের দামামা বাজিয়ে টাইগার শাবকদের বিশ্বকাপ ছিনিয়ে আনার এমন হুঙ্কার আজীবন মনে রাখবে ক্রিকেট বিশ্ব।

  • সুমাইয়া হোসেন লিয়া, প্রবাস কথা, ঢাকা।
শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.