ক্রাইস্টচার্চ
Featured অভিবাসন ওশেনিয়া নিউজিল্যান্ড

কোন জায়গাটা নিরাপদ; নিউজিল্যান্ড ও এক টুকরো নিরাপদ পৃথিবীর সন্ধানে

নিউজিল্যান্ড, এই দেশটিকে আমরা বাংলাদেশীরা চিনি ব্রেন্ডন ম্যাককালাম বা রস টেইলর এর দেশ হিসেবে। অর্থাৎ ক্রিকেট সম্পর্কে জানে এমন যে কোনো জাতিই নিউজিল্যান্ডকে প্রথম চিনেছে ক্রিকেটের মাধ্যমে। নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্ট চার্চে আল নূর ও লিনউড মসজিদে হামলার ঘটনায় ৫০ জন নিহত হয়েছে। এই পুরো ঘটনাটি পুরো বিশ্বকে হতবাক করে দিয়েছে, সেই সাথে বিশ্ববাসীকে ভাবতে বাধ্য করেছে যে- ‘পৃথিবীর কোনো দেশই এখন নিরাপদ নয়।’

এমনটা কেন বলছি? তবে জেনে রাখুন, নিউজিল্যান্ড ‘গ্লোবাল পিস ইনডেক্স’ এর র‍্যাংকিং এ ২০০৮-২০১০ সাল পর্যন্ত ২য়, ২০১১-২০১৩ সালে ৩য়, ২০১৪-২০১৬ সালে ৪র্থ এবং সর্বশেষ ২০১৭-২০১৮ সালে পুনরায় ২য় অবস্থানে ছিল। অর্থাৎ ক্লাসের সেরা ছাত্রের মতো নিউজিল্যান্ডও শান্তিপ্রিয় দেশের তালিকায় বরাবরই বেশ ভাল অবস্থানে নিজেকে ধরে রেখেছিল।

আর রাখবে নাই বা কেন! ক্রাইস্ট চার্চের মতো ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড নিউজিল্যান্ডে খুবই বিরল। এমন মাত্রার অপরাধের খবর খুঁজতে গেলে যেতে হবে ১৯৪৩ সালে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলার সময়, এমন একটি অপরাধ দেশটিতে সংঘটিত হয়েছিল। সর্বশেষ এমন ঘটনা ঘটেছিল ১৯৯০ সালে। সেই ঘটনায় ১৩ জনের প্রাণহানি হয়েছিল। এর কারণ ছিল, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বিরোধ। কিন্তু এবার যে হামলার ঘটনাটি ঘটলো, তার সঙ্গে সরাসরি উগ্রবাদের সংযোগ পাওয়া যাচ্ছে, যা নিউজিল্যান্ডের ইতিহাসে আগে কখনো ঘটেনি।

এই ন্যাক্কারজনক ঘটনাটি ঘটার আগে পত্রিকা খুললে কিংবা টেলিভিশনের পর্দায় আপনি এর আগেও নিউজিল্যান্ডের নাম পেয়েছেন। কিন্তু শুধুমাত্র খেলার পাতায় অথবা খেলার সংবাদে। এ থেকে স্পষ্টই বোঝা যায়, নিউজিল্যান্ড বরাবরই একটি শান্তিপ্রিয় দেশ হিসেবেই পরিচিত ছিল। কিন্তু বর্তমানে সেটি যে আর নেই তা হয়তো সকলেই বুঝতে পেরেছেন।

আহমেদ খান
আহমেদ খান

আফগানিস্তানের আহমেদ খান ১২ বছর আগে নিউজিল্যান্ডে শরণার্থী হিসেবে আসেন। অন্যদের মত তিনিও ভেবেছিলেন সকল ধরণের হানাহানি, হতাহতের ঘটনা হয়তো তিনি পেছনে ফেলে এসেছেন। কিন্তু বাস্তবতা বড়ই নির্মম। গত শুক্রবার যখন তিনি লিনউড মসজিদে জুমআর নামাজ আদায় করতে যান, তখন একজন বন্দুকধারী এলোপাথাড়ি গুলি ছুঁড়তে শুরু করে। প্রথমে মসজিদের বাইরে এবং পরবর্তীতে জানালা দিয়ে গুলি করতে করতে এগিয়ে আসছিল হামলাকারী। শিশু এবং মহিলারা একত্রে চিৎকার করতে শুরু করেছিল। চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে আসছিল নারকীয় হত্যাযজ্ঞের কারণে।

খান তখনই একজন শিশুকে বিপদ থেকে দূরে সরিয়ে নেন এবং একজন লোককে তার পাশে আশ্রয় দেন যার কি না হাতে গুলি লেগেছিল। তখন হামলাকারী মসজিদের বাইরে বের হয়ে গিয়েছিল। খানের ভাষ্যমতে-

“সে (গুলিতে আহত ব্যক্তি) পানি চাচ্ছিল। আমি তাকে বলছিলাম শান্ত হতে। কারণ, ভেবেছিলাম পুলিশ এসে পড়বে। ঠিক তখনই বন্দুকধারী জানালা দিয়ে আবার মসজিদে প্রবেশ করে আর আহত লোকটির মাথা বরাবর গুলি করে তাকে মেরে ফেলে! অথচ একটু আগেই তাকে আমি আমার পাশে জীবন্ত পেয়েছিলাম।”

এই ঘৃনিত ঘটনাটি ঘটার পর পুরো বিশ্ব নড়েচড়ে বসেছে। সকলেই এখন ৫০ জন মানুষের জীবনের বিনিময়ে আবার নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে যে, এমন হত্যাকান্ড শুধু আফগানিস্তান, ইরাক ইত্যাদি দেশেই এখন আর ঘটে না, আপনার আমার সবচেয়ে নিরাপদ মনে হওয়া দেশটিতেও ঘটতে পারে।

তবে আশার বিষয় হলো ব্রেন্টন ট্যারান্ট নামের সেই ২৮ বছর বয়সী অস্ট্রেলিয়ান শ্বেতাঙ্গ হামলাকারীর বিরুদ্ধে সকলেই এখন সোচ্চার। স্থান-কাল-পাত্র ভেদে ধর্ম-বর্ণের উর্ধ্বে গিয়ে এখন সবার একটাই চাওয়া-

‘একটি শান্তিপ্রিয় দেশ নয়, বরং একটি শান্তিপ্রিয় পৃথিবী’

  • সুমাইয়া হোসেন লিয়া, প্রবাস কথা, ঢাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.