Featured ইউরোপ ইতালী

কিছু দূরেই একটা মেয়েকে দেখছি একটু পর পর চোখ মুছতে; খুব কান্না করছে

জুতার হিলের খটখট শব্দে খানিকটা বিরক্ত লাগছে। তারপরও দৌড়াচ্ছি ট্রেনটা ধরার জন্য। বিদেশের মাটিতে আরেক প্রকার যুদ্ধ হচ্ছে সময় মতো বাস, ট্রেন, ধরা। আর এই ট্রেনটা মিস হলে পরবর্তী দুই ঘন্টার মধ্যে ট্রেন নেই। যদিও বাস আছে, কিন্তু ডাবল সময় ব্যয় হবে ট্রেনের চেয়ে। যাক অবশেষে হাঁপাতে হাঁপাতে ট্রেনটা ধরতে পেরেছি। ধন্যবাদ টি টি মামীকে। কারণ, হুইসেলও দিয়ে দিয়েছিলো আর সব দরজাও বন্ধ করে দিয়েছিলো।শুধু মামী যে দরজা দিয়ে উঠবে সেটা খোলা ছিল।আমি তো আশাই ছেড়ে দিয়েছিলাম।কিন্তু মামী আমাকে হাত দিয়ে ইশারা দিলো- ‘তাড়াতাড়ি আয়’। আমিও ঝেড়ে দৌড় দিলাম আর উঠেও পড়লাম মামীর সাহায্যে। সেজন্য অসংখ্য ধন্যবাদ জানিয়েছি মামীকে।

একটা সিটে বসে পড়লাম। তখনও হাঁপাচ্ছি আর খুব ক্লান্ত লাগছিলো।কারণ, ক্ষুধাও ছিলো এবং মাত্র কাজ থেকে বের হলাম। বেশ কিছুক্ষণ রেস্ট নেয়ার পর ভালো লাগছিলো। বসে বসে মোবাইল টিপছি আর প্রবাস কথার পোস্টগুলো দেখছি। কিন্তু আমার থেকে কিছু দূরেই একটা মেয়েকে দেখছি একটু পর পর চোখ মুছতে। খুব কান্না করছে। মেয়েটাকে এর আগেও দেখেছি কিন্তু কখনো কথা হয়নি। দেখে মনে হলো, আমাদের দেশের বা ইন্ডিয়ান হতে পারে। ওকে কাঁদতে দেখে নিজের কাছেই খুব খারাপ লাগছে। ইচ্ছে করছে গিয়ে জিজ্ঞেস করি- ‘কি হয়েছে? একটু মাথায় হাত বুলিয়ে দেই বা ওর কষ্টের কারণটা জানার জন্য মনটা খুব ব্যাকুল হয়ে গেলো। অবশেষে সব দ্বিধা দ্বন্দ্ব, নিজের ইগো বাদ দিয়ে তার কাছে গিয়ে বসলাম।

পাশে বসেই তো আর হুট করে কিছু জিজ্ঞেস করা যায় না। আমি আবার আমার মোবাইলটা নিয়ে নাড়াচাড়া করছি। কিন্তু মোবাইলের প্রতি মন নেই, মেয়েটার সাথে কথা না বলা পর্যন্ত। যাক, তারপর চোখাচোখি হলো দু’জনের। এক পর্যায়ে ইতালিয়ান ভাষায় সালাম বিনিময় করলাম। তারপর জিজ্ঞেস করলাম, কোন দেশের সে এবং তার নাম কি?

মেয়েটার নাম বললো ‘বিন্দু’। নাম শুনে নিজের মাঝেই একটা কেমন ভালোলাগার অনুভূতি হলো। আমি ফট করে জিজ্ঞেস করে ফেললাম- আপনি বাঙ্গালী? সেও এক গাল হাসি দিয়ে বললো- ‘হ্যাঁ, আমি বাঙ্গালী আমার বাড়ী একদম কলকাতার পাশেই’। জেলার নাম বলেছিল কিন্তু মনে নেই আমার। খুব সম্ভবত পঞ্চগড়ের কথাই বলেছিলো। আমিও আমার পরিচয় দিলাম। ইতালির কোথায় থাকে জিজ্ঞেস করলাম। আমাদের সাভোনায় থাকে।কিন্তু ‘ভারাজ’ নামে আরেকটি শহর আছে, সেই শহরে থাকে বিন্দু।

অনেক বছর হয় ইতালিতে আছে। শুধু সে একা নয় ফ্যামিলিও আছে। মুহূর্তের মধ্যেই দুজনের মাঝে আমিচিভাব (মানে বন্ধুত্ব) হয়ে গেলো। কিন্তু খেয়াল করলাম, কথা বলার মাঝে মাঝে বিন্দু কষ্টের নি:শ্বাস ফেলছে। বললাম, কি ব্যাপার তোমার মন খারাপ মনে হচ্ছে? সে বললো- ‘হুম, খুব মন খারাপ আজ আমার’। আমি বললাম- ‘যদি কিছু মনে না করো, তবে আমাকে বলতে পারো। হয়তো তোমার কষ্ট আমি দূর করতে পারবো না। কিন্তু তোমার মনটা হাল্কা হবে।’

সে ট্রেনের জানালা দিয়ে কিছুক্ষণ বাহিরে তাকিয়ে থাকলো। তারপর বললো-

‘ঠিক আছে বলবো তবে আজকে নয়। আজকে আর কষ্টগুলো মনে করে আর কাঁদতে চাই না। আর তোমার সাথে তো আমার দেখা হয়ই প্রায়দিন। এরপরের বার না হয় বলবো। আর তুমিতো আরেকটু পর নেমে যাবে, আজ বললেও শেষ করতে পারবো না।

বিন্দু আরো বললো- ‘আগে তো তোমার সাথে চোখের চেনাচিনি ছিল। আজ কথা হলো। তোমার সাথে আমার অনেক আগেই কথা বলার ইচ্ছে ছিলো।কিন্তু তুমি কি ভাবো তাই বলিনি। তুমি যে বাঙ্গালী আমি জানতাম।কারণ, তোমাকে ফোনে কারো সাথে কথা বলতে শুনেছি। আজ আমার সেই ইচ্ছেটা পূর্ণ হলো তোমার সাথে কথা বলার।’

আমি ওর কথা শুনে হেসে দিলাম। বললাম- বললে না কেন কথা? সে বললো- ‘আসলে তোমাকে দেখলে মুডি মনে হয় বা ভয় লাগে কথা বললে কি ভাবো তাই। কিন্তু তোমার সাথে কথা বলে আমার ধারনা পাল্টে গেছে।’

আমিও আর জোর করলাম না বিন্দুর কষ্টের কথার শোনার জন্য। কারণ, বিন্দু তো ঠিকই বলেছে- আমি একটু পরে নেমে যাবো।

চলবে
  • শাহানা আক্তার, সাভোনা, ইতালী।

প্রবাস কথার সাথে থাকুন।
প্রবাস কথা আপনাকে নিয়ে যাবে দুনিয়ার সব প্রান্তে-

প্রবাস কথার ফেসবুক পেজ: https://www.facebook.com/probashkotha/

প্রবাস কথার ইউটিউব চ্যানেল: https://www.youtube.com/channel/UCq8FpsRwHq7VZxDNyC7xNWQ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.