Featured ভারত

কাশ্মীরের সর্বশেষ পরিস্থিতি; ঠিক কি ভাবছে কাশ্মীরবাসী?

কাশ্মীর নিয়ে যেকোনো ছোটখাটো বিষয়ে বরাবরই পাকিস্তান এবং ভারত- এর মধ্যকার বৈরি সম্পর্ক টের পাওয়া যায়। কিন্তু হঠাৎ গত সোমবার ভারতের সংবিধানের ৩৭০-ক ধারা বাতিলের পর পুরো বিশ্বজুড়ে বয়ে গেছে বিষ্ময়ের হাওয়া। সংবিধানের এই ধারা বাতিলের পর কাশ্মীর ভারতের একটি বিশেষ রাজ্য হিসেবে মর্যাদা হারিয়েছে। সেই সাথে খোয়া গেছে কাশ্মীরের নিজস্ব স্বায়ত্তশাসনের অধিকারও!

কিন্তু একদিকে এই বিশেষ রাজ্য হিসেবে মর্যাদা বাতিল কিংবা নিজস্ব শাসনভারের ক্ষমতা হারানোর পর বর্তমানে কাশ্মীরের ভেতরকার অবস্থা বহির্বিশ্ব নয়, বরং ভারতবাসীদের কাছেও ছিল অনেকটা অজানা। কেননা এই ঘটনার পর একদিকে কাশ্মীরে ছিলনা ইন্টারনেট বা মোবাইল নেটওয়ার্ক, অপরদিকে পুরো কাশ্মীর জুড়ে বজায় ছিল ১৪৪ ধারা। তাই ভারতের অন্যান্য স্থানে অবস্থানকারী সাধারণ ভারতবাসীরাও যোগাযোগ করতে পারছিলেন না তাদের নিকটাত্মীয় বা কাছের মানুষের সাথে।

যদিও ভারত সরকারের হুট করে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নেওয়ার পরও মাঝে কেটে গেছে চারটি দিন কেটে, তাও এই কাশ্মীর নিয়ে জনমনে চাপা উত্তেজনা ঠিকই কাজ করছে প্রথমদিনের মতই। আজ শুক্রবার (৯ আগস্ট)ও  এই রাজ্য জুড়ে চলছিল কারফিউ, স্তব্ধ হয়ে ছিল স্বাভাবিক জনজীবন। রাজধানী শ্রীনগরের পথে পথে শুধুই দেখা মিলেছে ফৌজি টহল আর তল্লাসি, একইসাথে বন্ধ ছিল দোকানপাটও। সাধারণ মানুষ ঘরের বাইরে বেরোতেই পারছেন না বলা চলে।

যদিও আজ ঘোষণা এসেছে, তুলে ফেলা হচ্ছে ১৪৪ ধারা। কাল থেকে আবারও স্বাভাবিকভাবে খুলবে স্কুল-কলেজ। তবে এতকিছুর পরও ভারতের মুসলিম-গরিষ্ঠ একমাত্র এই প্রদেশটি তাদের সংবিধান-প্রদত্ত স্বীকৃতি হারানো যে ভালভাবে নেয়নি তা বোঝাই যায়।  ৩৭০ এর ধারা বাতিলের পর কাশ্মীরের সাধারণ বাসিন্দারা একটা কথাই বলছেন,

“কাশ্মীর আর বাকি ভারতের মধ্যে যে নড়বড়ে বিশ্বাস বা ভরসার  সেতুটি ছিল, সেটিও এবার পুরোপুরি ভেঙে গেল!”

কাশ্মীরের ১৪৪ ধারা তুলে ফেলার নোটিশ

কাশ্মীরের রাজপুরার ব্যবসায়ী ইরফান জাভিদ বলেন,

“সেই বিশ্বাসের সেতুটি যেহেতু ভারতই ভেঙে দিয়েছে – তাই এখন কাশ্মীরের রাজনৈতিক নেতৃত্বের খুব ভেবেচিন্তে ঠিক করতে হবে কাশ্মীরের ভবিষ্যত কাদের সাথে হবে। এই সিদ্ধান্ত নিতে হবে কাশ্মীরের নেতৃত্বের অর্থাৎ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বা মূল ধারার ভারতপন্থী রাজনীতিবিদদের।”

এই বিষয়ে কাশ্মীর ইউনিভার্সিটির অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মুদাসসর নাজির বলছেন,

“দেশভাগের আগে কাশ্মীর কিন্তু স্বতন্ত্র একটি দেশ ছিল, স্বাধীন অংশ ছিল। সাতচল্লিশের পর সেই দেশকেই ভারত আর পাকিস্তান আধাআধি ভাগ করে নিল। আর ভারত যে শর্তে কাশ্মীরকে নিয়েছিল তারই ভিত্তি ছিল এই ৩৭০ ধারা। তাহলে আমাকে এখন বলুন সেই আমলের ভারতীয় নেতারা কি দেশদ্রোহী ছিলেন?”

মুদাসসর নাজিরের এই কথার সাথে সুর মিলিয়েছেন ইরফান জাভিদও।

জাভিদ বলেন,

“৩৭০ যে শুধু কাশ্মীরের জন্য ছিল তা কিন্তু নয় – জম্মুর হিন্দুরা বা লাদাখের বৌদ্ধরাও এই স্বীকৃতি বা অধিকার ভোগ করে আসছেন গত সত্তর বছর ধরে। আর তা ছাড়া বিশেষ মর্যাদা তো ভারতের আরও নানা রাজ্যেও আছে, কিন্তু এটি (কাশ্মীর) শুধু মুসলিম-গরিষ্ঠ প্রদেশ বলেই এই অধিকার কেড়ে নেওয়া হল। তবে একটা কথা মনে রাখবেন, কাশ্মীরিরা হয়তো নিজের রুটি ভাগ করে নিতে পারে, কিন্তু কে নিজের জমি বা নিজের মা-কে অন্যের সঙ্গে ভাগ করতে চাইবে, বলুন?”

কিন্তু ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে কাশ্মীরের শ্রীনগরে। সেখানে বেশি কিছু এলাকায় এখনো হাতেগোনা কিছু হিন্দু কাশ্মীরি পন্ডিত পরিবার রয়ে গেছেন। কিন্তু ৩৭০ ধারা বাতিলের সিদ্ধান্তে তাদের প্রতিক্রিয়া ভিন্ন। যদিও প্রতিক্রিয়া দেওয়ার সময় বেশ সতর্কভাবেই কথা বলেছেন এই নাজুক বিষয়টি নিয়ে।

বিজিপির আনন্দ সভা

যেমন শ্রীনগরের কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা, সংযোগ মিশ্রা বলেছেন,

“কী আর বলব বলুন, পরিস্থিতি তো নিয়ন্ত্রণেই – মানুষ ঠিক সঙ্কটে আছে তাও বলা যাবে না। তবে হ্যাঁ, তাদের ওপরও অনেক চাপ যাচ্ছে, কারণ কেউই তো ঠিক এই অবস্থার জন্য প্রস্তুত ছিল না! এখন আমার স্কুলে ছোট বাচ্চারা ক্লাসে আসতে ভয় পাচ্ছে।  এমন তো  হওয়া উচিত না। সরকার একটা পদক্ষেপ নিয়েছে, কিন্তু পরিস্থিতি এখন যে কোনো দিকেই গড়াতে পারে, কিছুই এখনো বোঝা যাচ্ছে না।”

বাদামিবাগ এলাকা থেকে একটু এগিয়ে বাসস্ট্যান্ডের কাছে ট্যাক্সি ইউনিয়নের কয়েকজন নেতা জানান তাদের মতামত। এই ট্যাক্সি ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট গওহর বাট বলেন ,

“আমরা যেখানে আছি তার ঠিক পেছনের বিল্ডিংটাই কাশ্মীরে জাতিসংঘের মনিটরিংয়ের কার্যালয়। আমাকে বলুন তো, কাশ্মীর যদি ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশই হয়, তাহলে এই জাতিসংঘের ভবনের কাজ কী এখানে? কিন্তু সোজা কথা হল, জাতিসংঘের দৃষ্টিতেও কাশ্মীর একটি বিতর্কিত ভূখন্ড! এটি না ভারতের, না পাকিস্তানের, না চীনের। আমাদের তো এরা একেবারে গোলাম বানিয়ে রেখেছে”

গওহর বাটের এই মন্তব্যে একমত অন্যান্য  জনতাও। সত্যিকার অর্থেই বিগত সত্তর বছরে থেকেই কাশ্মীরের স্বাধীনতা  স্বপ্ন, স্বপ্নই রয়ে গেছে। কিন্তু তবুও এই স্বপ্ন দেখা থেকে বিরত থাকছেন না কাশ্মীরবাসীরা।

যদিও মুসলিম সংখ্যা গরিষ্ঠ এই রাজ্যের জন্য ভারতের ৩৭০ ধারা বাতিল অনেক বড় একটি আঘাত,তবুও এখনো আশার প্রদীপ ঠিকই জ্বলছে কাশ্মীরবাসীদের মনে। হয়তো সময়ই বলে দিবে তাদের নিয়তি কি নির্ধারণ করে রেখেছে তাদের জন্য।

  • সুমাইয়া হোসেন লিয়া, প্রবাস কথা, ঢাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.