Featured এশিয়া সিঙ্গাপুর

করোনা আতঙ্ক; সিঙ্গাপুরে প্রবাসী বাংলাদেশীদের দিনলিপি

শেয়ার করুন

সিঙ্গাপুরের আবহাওয়া এখন রাতে কিছুটা ঠান্ডা৷ আগে যেখানে ৫টি ফ্যান চালিয়ে ঘুমালেও ঘামে বালিশ ভিজে যেতো, এমনকি শরীরের একপাশ ভিজে জবজবে অবস্থা হতো। এখন সেখানে রাতে একটা ফ্যান চালিয়ে ঘুমালেও আমি পাতলা কম্বল জড়িয়ে ঘুমাই। প্রথম ভেবেছিলাম এটা বুঝি আমি একাই, পরে দেখি রুমের সবাই একটা ফ্যান অন করে পাতলা কাথা কিংবা পাতলা কম্বল জড়িয়ে ঘুমায়৷

আবহাওয়ার এই পরিবর্তন ও দিনে প্রচন্ড গরমে কাজ করার কারনে অনেকেরই সর্দি ও জ্বর হওয়া স্বাভাবিক৷ কিন্তু করোনাভাইরাসের কারনে এখন সামান্য সর্দি কিংবা জ্বর হলেই অনেকেই ভয়ে অস্তির হয়ে উঠেন।

গতকাল আমার এক বন্ধুকে দেখলাম মুখে সার্জিক্যাল মাস্ক পরিধান করে বসে আছে৷ তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম কি ব্যাপার মাস্ক পড়ে বসে আছেন কেন? সে মন খারাপ করে বলল, ভাই আমার নাক গড়িয়ে পানি ঝরছে আর জ্বরজ্বর লাগছে। আমারে মনে হয় করোনাভাইরাসে আক্রমন করলো। এই অল্প বয়সে মরে গেলে কি করে হবে! আজ পর্যন্ত বিয়েটা করতে পারলাম না, তাই এত তাড়াতাড়ি মরতে চাই না। ভাই আমি মনে হয় আর বাঁচুম না৷

আমি তাকে আশ্বাস দিয়ে বললাম, সর্দি আর সামান্য জ্বর মানেই করোনা ভাইরাস না। সে আমার যুক্তি মানতে নারাজ।

তাকে বললাম, গত সপ্তাহে আমার সর্দি হয়েছিল৷ সর্দির কারনে গত তিনদিন বড় সমস্যায় ছিলাম৷ সর্দির কোন সময় জ্ঞান নেই, যখন তখন আমাকে আক্রমণ করে কাবু করে দেয়। এমন ভয়ঙ্কর সর্দি আগে কখনো হয়নি। নাক দিয়ে ক্রমাগত পানি বেরুচ্ছিল, যা হাত দিয়ে সামলানো প্রায় অসম্ভব ছিল। বিছানার চারপাশে যা পাচ্ছিলাম তা দিয়েই নাকের পানি আটকানোর ব্যর্থ প্রচেষ্টা করছিলাম। ক্রমাগত হাঁচি আর নাক ঝাড়ছিলাম। একসময় দেখা গেল আমার চারপাশে কোন শুকনো কাপড় নেই। নাকের পানিতে সব একাকার।

এই ভয়ঙ্কর সর্দির কারনে রুম থেকে বের হতে পারছিলাম না। আপনি জানেন, সিঙ্গাপুরে রাস্তায় থুথু ফেললে জরিমানা গুনতে হয় আর নাকের পানি ফেললে কি অবস্থা হবে তা বুঝতেই পারছেন। দেশে হলে একটা রুমাল হাতে নিয়ে বের হয়ে যেতাম, রুমাল ভিজে গেলে রাস্তায় নির্জন এলাকায় দাঁড়িয়ে এদিক সেদিক তাকিয়ে জোরছে নাক ঝেড়ে জামার হাতায় নাকটা মুছে কিছু হয়নি এমন ভাব ধরে হেঁটে যেতাম।

আমার কথা শুনে সে হেসে দিলো৷ বুঝলাম সে কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে আসছে৷ তার দিকে তাকিয়ে আবারো বলতে শুরু করলাম, বাংলাদেশে থাকতে সর্দি হলে মায়ের হাতের সরষে ভর্তা, আদা গরম পানি খেয়ে কম্বল গায়ে জড়িয়ে শুয়ে থাকতাম। এবার সে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ঠিক আছে ডাক্তারের কাছে যাই। তারপর বাসায় গিয়ে সরষে ভর্তা বানিয়ে গরম ভাত খেয়ে দেখি কি অবস্থা।

আজ তাকে দেখলাম সুস্থভাবে অফিসে এসেছে৷ আসলে করোনাভাইরাস নিয়ে খবর শুনতে শুনতে আমাদের মস্তিষ্ক এখন করোনাভাইরাস ছাড়া অন্যকিছু ভাবতে পারে না।

তাছাড়া গতকাল একজন বাংলাদেশী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হবার খবর শোনার পর অনেকেই দেখলাম ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছে, সিঙ্গাপুর প্রবাসী ভাইয়ের খুব বেশি প্রয়োজন না হলে মোস্তফা সেন্টারের দিকে আসবেন না। অবস্থা খুব খারাপ সবাই সাবধানে থাকবেন। কারন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত বাংলাদেশী ভাই মোস্তফা সেন্টারে গিয়েছিলেন৷ রোগটা যেহেতু মানবদেহ থেকে মানবদেহে ছড়ায় তাই সবার ভয় পাওয়াটা স্বাভাবিক৷

আমার এক পরিচিত বড় ভাই তো আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে কেঁদেই দিয়েছেন৷ গতকাল রাতে তিনি তার বাবাকে কল দিয়ে বলেন, বাবা তুমি আমাকে চাও নাকি টাকা চাও?

তার প্রশ্ন শুনে আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকালাম৷ মোবাইলের ওপাশ থেকে কি জবাব এলো আমি তা শুনতে পেলাম না। সে আবারও বলল, বাবা সিঙ্গাপুরের অবস্থা খুবই খারাপ৷ একজন বাংলাদেশী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে৷ সকাল-বিকাল শরীরের তাপমাত্রা মাপা হয়৷ চারপাশে শুধু করোনাভাইরাস। আমি সিঙ্গাপুর থাকলে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হইয়া মইরা যামু৷

আমি কিছু বলতে যাবো কিন্তু তার দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে পারলাম না৷ তার দু’চোখে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে৷ আমি তাকে কিছু না বলে অন্যত্র চলে গেলাম৷

আমার মতে ভয় পাওয়া ভালো তবে অতিরিক্ত ভয় পাওয়াটা বোকামী। আমার মতে, সিঙ্গাপুরে থাকলেই আমরা নিরাপদে থাকতে পারব৷ এখানে বিশ্বের সেরা চিকিৎসা পাওয়া যাবে৷ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তি প্রাথমিকভাবে বুঝতে পারবে না সে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত।

আক্রান্ত হবার ১৫ দিনের মধ্যে এর উপসর্গ দেখা দিবে৷ তাই এখন সুস্থভাবে দেশে ফিরে গেলাম কিন্তু দেশের যাবার পর যদি করোনাভাইরাসে লক্ষন দেখা দেয় তাহলে নিজের সাথে গোটা পরিবার, সমাজ এমনকি পুরো গ্রাম করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তাই অতিরিক্ত চিন্তা না করে আল্লাহর উপর ভরসা করুন৷ নিজেরা একটু সচেতন ও পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকলে করোনাভাইসে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা নেই৷

  • ওমরা ফারুকী শিপন, সিঙ্গাপুর।
শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.