Featured অস্ট্রেলিয়া ওশেনিয়া

করোনাভাইরাস; অস্ট্রেলিয়ায় “প্যানিক শপিং”

শেয়ার করুন

অস্ট্রেলিয়ার আড়াই কোটি জনসংখ্যার মধ্যে চীনা বংশোদ্ভূত জনসংখ্যা প্রায় ১২ লক্ষ। এছাড়াও অস্থায়ী ওয়ার্ক পারমিট ভিসার মাধ্যমে বহিরাগত কর্মীদের মধ্যে ১০ ভাগ হচ্ছে চীনা অভিবাসী। ফলে অস্ট্রেলিয়া-চায়নাতে নিত্যদিনের যাতায়াত এখন কতকটা ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের বাস সার্ভিসের মতোই।

কাজেই চীন থেকে উৎপত্তি করোনা ভাইরাস বা কভিড-১৯ (COVID -19) এর অস্ট্রেলিয়াতে আগমনের বিষয়টা ছিল সময়ের ব্যাপার মাত্র। যেহেতু এই রোগের উপসর্গ প্রকাশ পেতেই প্রায় ১৫ দিন সময় লাগে, তাই চীন থেকে আগত লোকজনের উপর ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইন নিষেধাজ্ঞা নেমে আসার আগেই “জালের ফাঁক গলে” বেশ কিছু লোক যারা ইতিমধ্যে অস্ট্রেলিয়াতে ঢুকে পড়েছিল।

তাদের মাধ্যমেই যে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা আছে তা বলাই বাহুল্য। গত মাসের ১২ তারিখে ঢাকা থেকে সিডনিতে আসার পর এ নিয়ে আমি তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো উদ্বেগ রেডিও-টিভিতে দেখিনি।

তবে ইতিমধ্যে অস্ট্রেলিয়া চাইনিজদের সাথে ক্রমাগত ব্যবসা-বাণিজ্যের ধ্বস নামাতে ভবিষ্যতে অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতি কোন্ পথে যাবে তা নিয়ে বিস্তর তাত্ত্বিক আলোচনায় রেডিও টিভি সরগরম ছিল। বিশেষ করে উপর্যুপরি খরা, দাবানল ও সবশেষে চলমান বন্যার জন্য যখন অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতি এমনিতেই প্রবল হুমকির মুখে রয়েছে।

যার পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল (Reserve Bank of Australia) আরেক দফা সুদের হার কমিয়ে বর্তমানে করেছে ০.৫০ভাগ, যা কিনা অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে এই প্রথম!

তবে ২৮ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার হঠাৎ দেশটির প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন ঘোষণা দিলেন যে, অস্ট্রেলিয়াতে কভিড-১৯ ভাইরাস প্যানডেমিক হওয়ার সম্ভাবনা আছে। সে জন্য তিনি দেশে মেডিকেল ইমার্জেন্সি ঘোষণা করেন। তবে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। খুবই সাধারণ কিছু সাবধানতা গ্রহণ করলে এ রোগ নিয়ে বেশি দুশ্চিন্তার কারণ নেই।

এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে হাঁচিকাশি দেয়ার সময় হাতের কনুইয়ের মাঝে দেওয়া, নির্দিষ্ট বিরতিতে নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, আপাতত কারো সাথে হ্যান্ডশেক না করা ও অপ্রয়োজনে লোকজনের ভিড়ভাট্টার মধ্যে না যাওয়া।

এছাড়াও অস্ট্রেলিয়ার উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থার সাথে সমস্ত হসপিটাল ও ক্লিনিকগুলিতে রয়েছে সার্বিক প্রস্তুতি। মোটকথা হুজুগে “প্যানিক” পরিস্থিতি যাতে জনগণের মধ্যে না ঘটে তাই নিয়ে তিনি সবাইকে সতর্ক থাকতে বলেন।

যদিও ইতিমধ্যে বাজারের সব দোকান ও কেমিস্ট্র সপ থেকে মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার উধাও! না, এগুলো বাংলাদেশের মত দোকানিরা কালোবাজারির জন্য গো-এন-স্টক করে নাই। বরং এগুলো এখন বস্তাবন্দী হয়ে চায়নাতে যাচ্ছে প্রতিদিন। আর দোকানে যা অল্পবিস্তর আসছে তা মুহূর্তেই শেষ হয়ে যাচ্ছে মুড়ি-মুড়কির মতো!

তবে গেল শনিবার দিন ন্যূনতম সুরক্ষার জন্য আমি হার্ডওয়ার চেইন বানিংস থেকে কিনলাম চার জোড়া কটন গ্লাভস আমার ও আমার গিন্নির জন্য। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর এই সাবধান বাণীর পরদিনই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ঘোষনা দেয় যে এই কভিড-১৯ এবার সারা বিশ্বে প্যানডেমিক হারে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা আছে।

ফলে “প্যানিক” ছড়িয়ে পড়তে আর সময় লাগলো না। তাই, গত সপ্তাহ থেকেই শপিংমল ও দোকানপাটে কোনো এক অদ্ভুত কারণে শুরু হয় “প্যানিক শপিং”! এদিকে আমার বাসার চাল প্রায় শেষ, তাই গেল রবিবার রাতে যাই ল্যাকম্বার হ্যাল্ডন স্ট্রিটে এক পরিচিত বাঙালি দোকানে চাল কিনতে।

দোকানে ঢুকে আমার চোখ চড়কগাছ, তাকিয়ে দেখি চালের সেলফ একেবারে ফাঁকা! তবে হাতেগোনা কয়েক বস্তা অপরিচিত নতুন ব্র্যান্ডের চাল ছাড়া পরিচিত ব্র্যান্ডের একটা প্যাকেটও নাই। উপায় না দেখে রাস্তার ওপারে চলে এলাম বিখ্যাত “আলী সুপার স্টোরে”। এখানে এসে অঢেল চাল-ডালের স্টক দেখে মনে হল এখনো কেউ টের পায়নি হয়তো।

যাইহোক দেরি না করে প্রায় ৩৫ কেজি চাল কিনলাম, যেখানে সচরাচর ৫ কেজির বেশি কিনি না। ডাল, লবন, আটা, মসলা ইত্যাদি সহ আরো কিছু নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে গভীর রাতে বাড়ি ফিরে আসি বেশ অস্বস্তি নিয়েই।

এদিকে আজ সকালে টিভিতে চ্যানেল নাইন, চ্যানেল সেভেন, এবিসি ও অস্ট্রেলিয়ার জনপ্রিয় টকব্যাক রেডিও টুজিবি-তে গোটা দিন অন্যতম আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল বাজার থেকে হঠাৎ করে টয়লেট টিস্যু রোল কেনার হিড়িকের সংবাদটি।

সকালে টিভিতে বিভিন্ন গ্রোসারির চেইনের শূন্য সেলফগুলির সচিত্র প্রতিবেদন দেখে মনে হচ্ছিল অস্ট্রেলিয়াতে এখন যুদ্ধ লেগেছে! সিডনিতে গতকাল এক ভদ্রলোক বিখ্যাত গ্রোসারি চেইন উলওয়ার্তের এক আউটলেটে জনৈক চাইনিজ মহিলাকে জিজ্ঞেস করে যে, এত টয়লেট পেপার রোল সে কেন কিনছে? উত্তরে মহিলা বলে “আরে, তুমি জানো না ? প্রধানমন্ত্রী বলেছে!” এই উত্তর শুনে ওই ভদ্রলোকের বেহুশ হওয়ার উপক্রম।

এরইমধ্যে গতকাল সকাল সাড়ে দশটার দিকে আমাদের ব্যাংক্সটাউনের বিখ্যাত আন্তর্জাতিক গ্রোসারি চেইন (ALDI) তে গিয়ে দেখি সেখানেও মারমার কাটকাট অবস্থা! ঘরে আমাদেরও যেহেতু টয়লেট টিস্যু রোল প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, তাই গতকাল প্রথমেই যাই ওই সেলফে।

গিয়ে দেখি এক ডজন এর রেগুলার প্যাকেট গুলো সব শেষ, তাই বাধ্য হয়ে গোটাকয়েক পড়ে থাকা দুইডজনের দুই প্যাকেট টিস্যু রোল তাড়াতাড়ি সপিং ট্রলিতে তুললাম অন্য কেউ ছোঁ দেওয়ার আগেই। এর সাথে নানা ভাইয়ের জন্য কিনলাম দুই প্যাকেট ন্যাপি ও তিন প্যাকেট স্যানিটারি টিসু।

যদিও গেল বছর শীত মৌসুমে প্রতিবছরের মতোই অস্ট্রেলিয়াতে সাধারণ ইনফ্লুয়েঞ্জাতে আক্রান্ত হয়েছিল প্রায় ২ লক্ষ ১৭ হাজার লোক। এর মধ্যে মৃতের সংখ্যা ছিল ৯০০ জন। অথচ এখনো পর্যন্ত কভিড-১৯ ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ৪১, এবং মৃতের সংখ্যা মাত্র ২ জন।

কিন্তু আগামী জুন থেকে শুরু হতে যাওয়া আসন্ন শীত মৌসুমে এই সংখ্যা যে আরো বাড়বে তাতে কোন সন্দেহ নেই। তাই “প্যানিক শপিং” এর তালিকায় আর কোন্ কোন্ আইটেমের নাম অন্তর্ভুক্ত হবে সেটাই এখন দেখার বিষয়।

  • মহিউদ্দিন কিবরিয়া, সিডনি, অস্ট্রেলিয়া। 
শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.