Featured আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র

এ যুগের জুহার আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম

জুহারের বয়স ১২ হলো এবছর। জন্ম আমেরিকার সানফ্রান্সিসকোতে বসবাসরত এক বাংলাদেশী পরিবারে। স্কুলে গ্রীষ্মের ছুটি চলছে বলে তার কম্পিউটারে সময়টা বেশী যাচ্ছে, বাবা-মা আর বড় ভাইকে খুব বেশী সময় দেয়া হয়না তার , বাবা দু’একদিন এমন দেখে অশনির প্রমাদ গুনলেন।

বাবা তাকে ডেকে বললেন তুমি কি গেম খেল? সে এক কথায় “হুম ” উত্তর দিয়ে চুপ করে রইলো। বাবা বললেন এটা খারাপ সংকেত, ছুটির দিনগুলো বই পড়া, খেলাধুলা, মা বাবা আর বড় ভাইয়ের সাথে সময় দেবে। নো কম্পিউটার নো গেম। আজ থেকে তুমি আর কম্পিউটার ধরবেনা।

জুহার মাথা নাড়িয়ে মন খারাপ করে সম্মতি দিয়ে ফিরে গেল নিজের রুমে। দুই-তিন দিন চলে গেছে জুহারের মন ভীষন খারাপ, তার মুখে হাসি নেই। সে সহজ হতে পারছেনা। বাবা লক্ষ্য করলো সবই। কথা বলার জন্য কাছে ডাকলেন, প্রশ্ন করলেন তুমি কি খেয়াল করেছ? একটা গেম তোমার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ? তুমি নিষেধাজ্ঞা র কারনে আমাদের সাথে স্বভাবিক হতে পারছনা।

জুহার আস্তে আস্তে বাবার কাছে নির্ভয় চাইলো আসল ঘটনা বলার জন্য। জুহার তার বাবাকে বোঝালো সে আসলে গেম খেলেনা। সে গেম তৈরী করে। 

ইতিমধ্যেই ৫-৬ দিনে সে যে গেম তৈরী করেছে তা সে ২-৩ ডলার করে বিক্রি করে কোন এক বন্ধুর পেপাল একাউন্টে প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ ডলার জমা করে ফেলেছে যা আগামী  দু’মাসে ১৪০০-১৫০০ ডলারে উন্নিত হবে।

আরো ৪ বছর আগে জুহারের বয়স যখন ৮ তখন খাবার টেবিলে জুহারকে তার বাবা প্রশ্ন করেছিল জুহার বড় হয়ে কি হতে চায়? জুহার তার বাবার কাছে জানতে চেয়েছিল কোন কোন পেশায় কত আয় করেন পেশাজীবীরা। তার বাবা ধারনা দিলেন, ডাক্তার এত হাজার ডলার, ইন্জিনিয়ার এত, কম্পিউটার ইন্জিনিয়ার এতো, অন্যান্য পেশায় এতো। জুহারের কোন প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। সে বলেছিল এত পড়াশোনা করে এই আয়? আমি এখনই জানিনা কি করবো।

আরও পড়ুন- এক প্রবাসী ছাত্রের প্রতি শিক্ষকের ভালোবাসা

গত বছর, জুহার স্কুলে গোপনে তার বন্ধুদের একটা চিপসের অসাধারন বর্ননা দিয়ে মোহিত করেছিল। চিপসের গুনাগুন ব্যাখ্যা দিয়ে ১ ডলারের ডিসকাউন্টে কেনা চিপস ২ ডলারে বিক্রি করে ফেললো, এই চিপস সে কোথায় পেল? মায়ের সাথে সে দুরের শহরে কোন এক হোলসেল মার্কেটে গিয়েছিল, সেখানে এই চিপসের ডিসকাউন্ট মুল্য দেখে মায়ের কাছে বাহানা করলো কিনে দেওয়ার জন্য।

তার মা ২৪ প্যাকেটের এক কার্টুন চিপস কিনে দিলেন। জুহার প্রথম দিন স্কুলে ২ প্যাকেট নিয়ে গেল বন্ধুদের একটু করে ইনভাইট করলো, সবাই যখন পছন্দ করলো তখন সে এই চিপসের উপাদান, উপকারিতার ব্যাখ্যা দিল, এবং সে জানালো যদি কেউ এটা পেতে চায় জুহারকে বললে সে এটা এনে দিতে পারে এত মুল্যে। এর পর কয়েক দিনের ভেতরে সে পুরো কার্টুন চিপস বিক্রি করে ফেলল বন্ধুদের কাছে।

এক রাতে খাবার টেবিলে সে তার বাবার কাছে দেশে থাকা বাবার এক অসুস্থ আত্মীয়ের বৃদ্ধার খবর জানতে চাইলো, পারিবারিক আলোচনাতেই জুহার তার কথা শুনেছিল, তার সাহায্য দরকার, বাবা তাকে সাহায্য করে এগুলো সে জানতো। বাবা যখন জানতে চাইলো তার এ খবর নেয়ার হেতু কি? তখন জুহার জানালো সে ও-ই বৃদ্ধাকে ৪০ ডলার সাহায্য করতে চায়।

তুমি টাকা পেলে কোথায়? এ প্রশ্নে জুহার তার চিপস কেনা ও বিক্রয়ের তথ্য ফাঁস করলো। বাবার তো মাথা চড়ক গাছে। বাবা প্রশ্ন করলো তুমি কেন এটা করলে? কিসের অভাব তোমার? সে জানালে এটা করে সে তার মার্কেটিং করার যোগ্যতা আছে কিনা সেটা যাচাই করেছে। তাছাড়া সে তো বন্ধুদের ঠকায়নি। বাজারের খুচরা মুল্য থেকে কম দামে বন্ধুদের দিয়েছে এবং আয়কৃত অর্থ তো সেই নিজের জন্য খরচ করছেনা।

জুহারের কথা, ভাবনা সব থেকে আলাদা, ম্যাথ নিয়ে সে মাথা ঘামায় না, যে কোন হিসাব সে এক সেকেন্ডে বের করে দেয় মুখে মুখে। সবাই যা এক ভাবে দেখে তার দেখা অন্যরকম, তার বুদ্ধিদীপ্ত কথা, অকাট্য যুক্তি তার বাব–মা, বন্ধুরা গোপনে হজম করে পাল্টা যুক্তি ছাড়াই।

তার ক্লাসের বন্ধুদের সে লীড করে বিভিন্ন বুদ্ধি দিয়ে। বাসায় থাকলে তার সমস্যাগ্রস্থ বন্ধুরা ফোন করে সমাধান জানতে চাইলে খুব স্বাভাবিক ভাবে এক কথায় সমাধান দিয়ে ফোন রেখে একটা হেয়ালি হাসি দেয়। তার বড় ভাইকে সে একদিন বললো আমার বন্ধু গুলো এত বোকা কেন বুঝিনা।

জুহারের সাথে যে কোন তর্কে তাকে ফাঁসানো খুব মুশকিল, খুব বিনয়ের সাথে সে সব সামলে নেয়। জুহারের মাথা খুব দ্রুত কাজ করে। ইউনিক সে। সে তার বাবাকে বিশ্ব শেয়ার মার্কেটের ভবিষ্যত পলিসি ব্যাখ্যা করে।

মাত্র ১২ বছরের জুহার। ৮ বছর বয়সে সে বলেছে এত কষ্ট করে পড়াশোনা করে একজন ডাক্তার মাত্র এত হাজার ডলার বছরে আয় করে? জুহার কি হবে? বড় হয়ে কোন পেশা বেছে নেবে সেটা অনুমান করা আমাদের জন্য মনে হয় বোকামী হবে। তবে আমি ভবিষ্যত কোন ট্রিলিয়নার কে নিয়ে যে লিখছি সেই স্বপ্ন রেখে গেলাম। জুহার আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম। আমাদের ১২ বছরের জুহার।

ও হ্যা, জুহার আমার প্রিয় বন্ধু, প্রবাস কথার সদস্য টিকু রহমানের ছোট ছেলে।
জুহারের জন্য রইল শুভ কামনা।

  • শাহ ইমরান, বার্সেলোনা, স্পেন 

প্রবাসীদের সব খবর জানতে; প্রবাস কথার ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.