Featured বাংলাদেশ থেকে বাহরাইন মধ্যপ্রাচ্য

“এমন পরিবারে জন্মাইসি; না পারি রিক্সা চালাইতে, না পারি বদলি খাটতে”

শেয়ার করুন

মানিকগঞ্জের হিজবুল বাহার, ২০১২ সালে একটি ফার্মেসীতে মাসে ৬ হাজার টাকা বেতনের একটি ছোট্ট কাজ করতেন। কিন্তু সংসারের অভাব কাটাতে পাড়ি জমান বাহরাইনে। সেখানে ১৬ মাস একটি কোম্পানিতে হিজবুল কাজ করেছেন প্রবাসী শ্রমিক হিসেবে।

তার ভাগ্নে বেশ কিছু বছর ধরেই থাকেন বাহরাইনে। ভাগ্নের আশ্বাসের উপর ভরসা করে ২০১২ সালের পহেলা এপ্রিল আড়াই লক্ষ টাকা খরচ করে হিজবুল মধ্যপ্রাচ্যের দেশটিতে যান।

হিজবুলকে দেশের বাইরে পাঠানোর ক্ষেত্রে তার ভাগ্নে নানাভাবে আশ্বস্ত করেছিল এই বলে যে, দেশটিতে অনেক সুযোগ সুবিধা পাওয়া সম্ভব। কিন্তু আদৌ কি তা পাওয়া সম্ভব হয়েছিল?

হিজবুলের ভাষ্যমতে, তার ভাগ্নে ‘মায়ের কসম’ দিয়ে বলেছিল, বাহরাইন থেকে প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা তিনি পরিবারের কাছে পাঠাতে পারবেন।

কিন্তু একসময় দেখা যায় কোম্পানি থেকে হিজবুলকে প্রদানই করা হচ্ছে  ১৩ হাজার টাকা। কিছুদিন পর জানতে পারেন নিজের বন্ধুর মাধ্যমে তার ভাগ্নে তৈরি করিয়েছে তার ভিসা। যেখানে সবমিলিয়ে খরচ হয়েছিল মাত্র ৯০ হাজার টাকা।

কোম্পানি থেকে কম টাকা বেতন পাওয়াটাই হিজবুলের মূল সমস্যা ছিলনা। তার বেতন দেওয়া হতো মাসের ১০ তারিখ কিংবা মাসের ২৮ তারিখ। সেক্ষেত্রে পুরো মাস তাকে ধারদেনা করে চলতে হতো। বাহরাইনে কোনোভাবেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারছিলেন না এই প্রবাসী। এক প্রকার বাধ্য হয়েই মোটা অংকের সুদে ঋণ নিয়ে বাহরাইন থেকে দেশে ফিরে আসেন তিনি।

এখানেই শেষ নয় হিজবুলের বিদেশ থেকে ফেরার গল্প। দেশে চলে আসলেও কিছুদিন পর আবার ফিরে যান বাহরাইনে। কিন্তু এবার আর ভাগ্নে বা কোম্পানির সাথে সম্পৃক্ত হতে যাননি। গিয়েছেন কোম্পানির বাইরে কাজ করতে।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশটিতে গিয়ে কোনো কোম্পানি ছাড়াই অবৈধভাবে কাজ করা শুরু করেন তিনি। হিজবুলের ভাষ্যমতে, কোম্পানির বাইরে ২ বছরে আয় করেন ৬ লক্ষ টাকা।

এক সময় ছোটখাটো ধার শোধ করা শুরু করেন এই প্রবাসী। দেশেও পাঠানো শুরু করেন নির্দিষ্ট পরিমাণের অর্থ। কিন্তু এমন সময়ই অবৈধ প্রবাসী হিসেবে পুলিশের কাছে ধরা পড়েন তিনি। ‘ব্ল্যাক’এ বাহরাইনে অবস্থান করায় দেশে ফেরত পাঠানো হয় তাকে।

দেশে ফেরার পর আর ভাগ্য বদলায়নি হিজবুলের। জমি বিক্রি করে শোধ করেছেন সেই ঋণ। স্ত্রী, এক ছেলে এবং এক মেয়ে নিয়ে হিজবুলের সংসার।

হিজবুল প্রবাস কথাকে জানান, মেয়ে ৫ম এবং ৮ম শ্রেণিতে বৃত্তি পেয়েছে। এবার উঠেছে ক্লাস ৯ এ। আর ছেলেটি তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ছে।

ইউএনডিপি আয়োজিত তিনদিন ব্যাপী অভিবাসী কর্মীদের ‘ডিজিটাল লিটারেসী’ বিষয়ক এক অনুষ্ঠানে তিনি তার প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন।

কিন্তু কিভাবে সংসার চলছে হিজবুলের?

“এখন রাজমিস্ত্রীর কাজ করি। প্রতিদিন ৫০০ টাকা হিসাবে মাসে বড়জোর ১২ দিন কাজ করতে পারি।”, বললেন হিজবুল।

এই আয়ে সংসার চলে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,

“এত অল্প টাকায় সংসার চলেনা। এমন পরিবারে জন্মাইসি না পারি রিক্সা চালাইতে, না পারি বদলি খাটতে। আমার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা।”

নিজের পারিবারিক অবস্থা বলতে গিয়ে আপ্লুত হয়ে পড়েন হিজবুল বাহার। তার বড় ভাইও ছিলেন একজন প্রবাসী। ইরানের যুদ্ধের পুরোটা সময় সেদেশে ট্রাক চালক হিসেবে কাজ করেছেন তিনি।

আবার প্রবাসে যেতে চান কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইতে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। সুযোগ পেলেই প্রবাসী শ্রমিক হিসেবে আবার চলে যাবেন ।

  •    সুমাইয়া হোসেন লিয়া, প্রবাস কথা, ঢাকা।
শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.