Featured অস্ট্রেলিয়া ওশেনিয়া

এক প্রবাসীর অসহায়ত্ব; দাবানলে বিপন্ন অস্ট্রেলিয়ার প্রাণীকুল

শেয়ার করুন

আমরা বড় অসহায়, তার চেয়ে বিপন্ন অসহায় হয়েছে প্রাণীকুল। বলছি অষ্ট্রেলিয়ার প্রকৃতির অগ্নি বিলাস নিয়ে।

এখানে প্রচন্ড তাপমাত্রার দাবদাহে সংঘটিত হয় এই ভয়ংকর দানানল। এ মহাদেশে প্রায় ত্রিশ হাজারের মতো বিভিন্ন জাতের ইউক্যালিপটাস গাছ রয়েছে, যা খুবই শুষ্ক। প্রতি বছর গ্রীষ্মকাল আসলেই প্রচন্ড উত্তাপে আগুনের এ লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ে বনজঙ্গলে বিশেষ করে এ প্রজাতির গাছের শুষ্ক স্বভাবের জন্য।

অস্ট্রেলিয়ায় প্রতি বছরই দানানল হয়, কিন্তু এবার সাম্প্রতিক কালের সকল রেকর্ড ভেঙ্গে দাবানল মারাত্মক আকার ধারন করেছে। প্রায় এক যুগেরও কিছু আগে এরকম দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েছিলো এ মহাদেশ। কিন্তু এ বছর এর চিত্র যেনো সম্পূর্ণ ভিন্ন আর বিধ্বংসী।

শুকনো বৃক্ষরাজি সুর্যের তীব্র রশ্মির থেকে দগ্ধ হয় আর বাতাসের বেগ এই আগুন কে প্রভাবিত করে এক গাছ থেকে অন্য গাছে বিলিয়ে দেয়।

নিউ সাউথ ওয়েলসের অনেক স্হানে আগুন বেশ শক্ত ঘাঁটি তৈরী করেছে। সিডনি থেকে ব্লু মাউন্টেইন, নউরা, লিথগো, ক্যাঙ্গারু ভ্যালী ক্যানবেরা খুব একটা দুরে নয়।

বেশ কয়েকবার গিয়েছি আর উপভোগ করেছিলাম প্রকৃতির উদার সৌন্দর্য। বন্য প্রাণীগুলো নিশ্চিত হয়ে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াত, মানুষ দেখলে হরিণ, ক্যাঙ্গারু লাফিয়ে দূরে লুকিয়ে থাকে।

আজ তারা এত অসহায় যে, মানুষের কাছেই দৌড়ে চলে আসছে, যে কোয়ালাগুলো আপন করে বৃক্ষকে আলিঙ্গন করে জীবন যাপিত করে, সেই বৃক্ষ আজ নিজে ছাই হয়ে তাকে অগ্নিদগ্ধ করে রেখে গিয়েছে। কত নামজানা জীব জন্তু আগুন টের পাওয়ার আগেই জীবন দিল। কোথায় যাবে তারা, কে দিবে আশ্রয়?

৭০হাজার বর্গ কি.মি. মতো অরণ্য পুড়ছে আর ছাই হচ্ছে। অর্ধকোটির প্রানীকুল ধ্বংস হয়েছে। এ পর্যন্ত ১৮ জনের মতো জীবনহানি এবং প্রায় ২৮ জনের মতো নিঁখোজ। দমকল বাহিনী এবং প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবকদল জীবন বাজি রেখে আগুন থামানোর প্রচেস্টায় কাজ করছে, প্রায় ৩ হাজার মার্কিন সৈন্য এবং কানাডিয়ান ফায়ার ফাইটার যোগ দিয়েছে আগুন থামাবে বলে।

সিডনীর অদূরে অষ্ট্রেলিয়ার রাজধানী ক্যানবেরার, স্নোয়ি মাউন্টেইন খ্যাত এলাকায় এ মহাদেশের অন্যতম প্রধান বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্নোয়ি হাইড্রো পাওয়ার হাউস ব্যাপক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত।  ধারনা করা হচ্ছে, শীঘ্রই এ তান্ডব নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে, বিপর্যস্ত হতে পারে দেশের বিদ্যুত ব্যবস্থা।

যেহেতু বৃষ্টি একদমই হচ্ছেনা, তাই পানির সংকটেরও আশংকা দেখা দিচ্ছে এবং তাই পানি অযথা ব্যবহারের উপর নিষেধাজ্ঞা করা হয়েছে। অহেতুক গাড়ী ধোয়া বা বাগানে পানির অপচয়ের উপর কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে প্রশাসন।

স্বেচ্ছাসেবক দলকে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় কোন আহত পশু প্রাণীকে শুশ্রুষা প্রদানের পূর্বে সতর্কতা অবলম্বন করে অবশ্যই গ্লাভস ব্যবহার করতে বলা হয়েছে। কারন এসব আহত পুড়ে যাওয়া প্রানীকুল থেকে ক্লেমেডিয়া নামক ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ আরেক মহামারীর আবির্ভাব হতে পারে।

পুরো দেশ জুড়ে আগুনের ফলে সৃষ্ট ধোয়া থেকে এজমা এবং শ্বাসকষ্ট জনিত রোগীদের মাস্ক ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এ সকল কিছু পর্যালাচনা করে গত সপ্তাহ থেকে নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্যসরকার স্টেট জরুরী অবস্থা ঘোষনা করেছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার জনসাধারনকে দ্রুত বাসস্থান ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বেশীর ভাগ মানুষ সমুদ্র সৈকতের নিকট আশ্রয় নিয়েছে।

পরিশেষে, বেশ কিছুদিনের দাবদাহ শেষে বৃষ্টির আশায় আকুল প্রানীকুল আজ কিছুটা স্বাদ পেয়েছে বর্ষার। খুব অল্পমাত্রায় হলেও আবহাওয়াবিদরা আশা করছে খুব শীঘ্রই বৃষ্টিই একমাত্র এনে দিতে পারে প্রশান্তি।

সরকারী বেসরকারী বিভিন্ন সংগঠন যে যার অবস্থান থেকে সাধ্যমতো ত্রাণ সংগ্রহ করে দমকল বাহিনী এবং রাজ্য সরকারের মাধ্যমে পাঠিয়ে দিচ্ছে দুর্যোগপূর্ণ এলাকায়।

  • আয়েশা কলি, সিডনী, অস্ট্রেলিয়ায়। 
শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.