Featured এশিয়া সিঙ্গাপুর

একটি পরবাসী জীবনের ইতিবৃত্ত

দশ মাস গর্ভে ধারন করে সংসারের প্রথম সন্তানটা যখন পৃথিবীতে আসে, তখন মায়ের মুখে যেই প্রশান্তি ফুটে উঠে তার বর্ননা এখন পর্যন্ত কবি সাহিত্যিকরা সঠিক ভাবে দিতে পারেনি। বাবা যখন আতুর ঘরের খবর শুনে উঠানের এক কোনায় আযানের ধ্বনি শুনিয়ে সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া আদায় করে তখন তার অন্তরের অনুভূতির খবর এখন পর্যন্ত কোথাও প্রকাশ পায়নি।

আজ থেকে পঁচিশ বছর পূর্বে সুবেহ সাদিকের পর চিৎকার করে নিরব আঁধারে মিষ্টি কলরব তুলেছিলো যেই শিশু, যার তুলতুলে দেহ থেকে নিঃশ্বাস ছড়িয়ে মুন্সিগঞ্জের কাওয়ের গ্রামের বাতাসকে পবিত্রতায় ভরিয়ে দিয়েছিলো, সেই শিশুটিকে নিয়েই আজকে আমার এই বুক ভরা উপছে পরা হাহাকার।

বাবা-মা নাম দিয়েছিলো হাসান। নিম্ন মধ্যবিত্তের সংসার। অর্ধশিক্ষিত কৃষক পরিবারে পরিকল্পনার অভাবে জন্ম নেয় আরো তিনটি ভাইবোন। এস এস সি শেষ করে হাসানকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় তার নানা বাড়ি। নাহ্, পড়াশুনাটা পরবর্তিতে আর হয়ে উঠেনি তার। মামাদের সঙ্গে কৃষি কাজেই চলে গেল বেশ কয়েক বছর। মাঝেমাঝে বন্ধুরা যখন বিদায় নিয়ে প্রবাস পারি দিতো, তখন অজানা অনুভূতি ঝিলিক দিতো তার মনে।

সংসারে ভারে নুয়ে পরা বাবার মুখটি ভেসে আসতো বারবার। অনেক আকুতি মিনতি করে সবাইকে অনুরোধ করেছিলো তাকে প্রবাসে পাঠানোর জন্য। অতঃপর প্রবাসী হতে হলে যা হয় আর কি। জমি বেঁচা, ধার-দেনা করে আপনজনকে চোখের নোনা জলে ভাসিয়ে, অজানা অচেনা স্বপ্নের শহর সিঙ্গাপুরে পারি দেওয়া।

হাসানও চেয়েছিলো জীবনকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে। একটা রঙিন দীর্ঘ জীবন। ২০১১ সালে সে যখন সিঙ্গাপুরে আসে তখন স্বপ্নগুলো যেনো হাতের মুঠোয়। একটা কুরিয়ান ভালো কোম্পানীতে কাজ হওয়ায় ভাগ্য যেনো বদলে যেতে শুরু করেছিলো।কাজের প্রতি মনযোগী হওয়ায় কুরিয়ানরা ওকে খুব পছন্দ করতো। সাড়ে তিন বছরে কোম্পানীতে খারাপ কোন রিপোর্ট নেই তার। এদিকে তার নির্ভরতায় সংসারের গতিও চলছিলো খুব স্বচ্ছলতায়। কিন্তু নিয়তি হাসছিলো। কারণ তার হিসাব যেনো কোথায় গড়মিল রয়ে গেছে।

সেদিন ছিলো শনিবার। অর্ধ দিবস কাজ থাকায় বেশীর ভাগ কর্মাকর্তারা সাধারন কর্মচারীদের কাজ বুঝিয়ে দিয়ে আগেই চলে গিয়েছিলো। এমনটিই হয়ে থাকে সাধারনত। হাসান গতানুগতিক কাজ করছিলো। তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল। চারদিকে ছন্দময় যান্ত্রিকশব্দ। হঠাৎ বাম পাশ থেকে মাটি স্তানান্তরিত করার (ইস্কাভেটর) একটা অংশ ছুটে এসে সজোরে আঘাত হানে তার শরীরে।

মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যাপার। কিছুদূরেই তার সহকর্মী কাজ করছিলো। ছুটে আসে তার কাছে। ততক্ষনে পিন্জর থেকে পাখি উড়ে গেছে। স্তব্দ হয়ে যায় সে। কারন রক্তের স্রোত তখনো বইছে। হয়তো কিছুক্ষন আগেই দুজনে গল্প করেছিলো। হয়তো রাতে গিয়ে কি খাবার রান্না করবে সেটাই ছিলো গল্পের বিষয় বস্তু।

অথচ নিমেষেই একটা কোমল প্রান লাশ হয়ে গেলো ? হায়, জীবন এতো ছোট কেনো? হাসানের এই মৃত্যুতে হয়তো বদলে যাবে পরিবারের গতিপথ। আবার শুর হবে নতুন অধ্যায়। জানিনা হাসানের বাবা মা’র বুকের পাজরে কতটুকু সহ্য ক্ষমতা আছে। হয়তো সেখানে এখন বৈরি বাতাস বইছে।

হায়রে প্রবাস জীবন! যেখানে আতংক আর উৎকন্ঠায় কাটাতে হয় প্রতিটা মুহুর্ত। যেখানে জীবন থেকে হারিয়ে যায় হাসানের মতো তরতাজা প্রাণ, যেখানে মৃত্যু প্রতিটি মুহুর্তে ওত পেতে থাকে তবুও আমরা প্রবাসী হতে ছুটে আসি এই ভীনদেশে। জানিনা আর কত হাহাকার অপেক্ষা করছে প্রবাসীদের ভাগ্যে।

  • মোঃ শরিফ, সিঙ্গাপুর 

আরও পড়ুন- লেবাননে অবৈধ প্রবাসীদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা

প্রবাসীদের সব খবর জানতে; প্রবাস কথার ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.