Featured আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র

একজন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসীর দুই মায়ের গল্প

আমি মা কে হারিয়েছি প্রায় নয় বছর! মৃত্যুর কিছুদিন আগে আম্মুর লাঞ্চে পানি চলে এসেছিল। অকেজো হয়ে গিয়েছিল আম্মুর শরীরের একটা বড় অংশ। প্রায় ২ বছর ধরে শারিরিকভাবে মা ভিষন ভুগেছে। এরপর এক সময় জীবন যুদ্ধের কাছে পরাজয় বরণ করে।

পবিত্র রমজান মাসের ১৭ তারিখে আমাদেরকে ছেড়ে চলে যান। আম্মু মারা যাওয়ার আগে কখনো চিন্তাই করি নি, মা হারা জীবন কত কঠিন হতে পারে!

তখন আমার কেবল বিয়ে হয়েছে। নতুন একটা জীবনের সাথে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করছি। এক জন আরেকজনকে বোঝার চেষ্টা করছি। সারাদিন ইউনিভার্সিটিতে পড়িয়ে বাসায় এসে মাহমুদ ( স্বামী) আমাকে নিয়ে সন্ধ্যার পরে একটু বের হতে চাইতো।

বাইরে খাওয়া, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়া, টুকটাক আনন্দ করা এই আর কি, কিন্তু এসব কিছুই আমার ভালো লাগতো না। আমার শুধু ইচ্ছা করতো হসপিটালে মা এর পাশে গিয়ে চুপচাপ বসে থাকতে।

প্রতিদিন বাসায় ফিরে আমার মলিন মুখটা দেখে হয়তো ওর ভালো লাগতো না। কিন্তু ধীরে ধীরেমাহমুদও ব্যপারগুলো বুঝতে শুরু করল। আসলে মা কে হাসপাতালের বিছানায় দেখে কারো মুখেই হাসি খাকা সম্ভব নয়। অনেক সাপোর্ট করেছে সে আমাকেকঠিন সেই সময়গুলোতে।

সকাল বেলা হাসপাতালে চলে যেতাম, প্রায় সারাদিন আম্মুর সাথে সময় কাটিয়ে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরতাম। সংসার বলে তেমন কিছুই ছিল না তখন আমার। সেই দিনগুলোতে আম্মুর পাশে বসে শুধু একটাই দোয়া করতাম, মা যেন আবার সুস্থ হয়ে আমাদের মধ্যে ফিরে আসেন।

বিছানায় মা অসার হয়ে শুয়ে থাকতো, আর আমি ঘন্টার পর ঘন্টা মাকে দেখতাম । মা এর সাথে কাটানো চমৎকার স্মৃতিগুলি মনে করতাম।

একদিন ডাক্তার রাউন্ড ভিসিটে এল, আমি তাকে আলাদা করে ডেকে নিয়ে জিজ্জেস করলাম, মা কে কবে বাসায় নিয়ে যেতে পারবো। ডাক্তার বললো, আপনারা চাইলে যে কোন সময় নিয়ে যেতে পারেন, উনার তো আসলে আর বেশিদিন সময় হাতে নেই, তাই আপজনদের মাঝে থাকায় ভালো।

ডাক্তারের মুখে কথাগুলো শোনার পর, কিছুক্ষনের জন্য আমার মাথা মনে হচ্ছিল খালি হয়ে গেছে। চোখের পানি লুকানোর জন্যে দৌড়ে বাথ্রুমে গিয়ে দরজা দিলাম। বাথ্রুমে বসে অনেকক্ষন ধরে কাঁদলাম।

শুধু মনে হচ্ছিলো কেন আমাদের সাথেই এমন হলো। সবার মা বেঁচে থাকে, কেন আমার মা চলে যাবে! কিছুতেই মানতে পারছিলাম না এই করুণ ভাগ্যকে। 

প্রায় আধা ঘন্টা পর বের হলাম। আম্মুর পাশে এসে দাঁড়ালাম। আম্মুর হাতে একটা কমলা, সেটি খাচ্ছিলো তখন। কেন জানি আম্মুর চেহারাটা দেখে খুব নিষ্পাপ মনে হল। আবার আমার চোখ ভিজে এল। পুরো পৃথিবীটা এলোমেলো লাগছিলো।

আম্মু, আমার চোখ লাল কেন জিজ্জেস করল, আম্মুর প্রশ্ন শুনে আমি আর চোখের পানি আর আটকাতে পারলাম না। মাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলাম। জিজ্জেস করলো কি হয়েছে? আমি শুধুই কাঁদছিলাম, সেদিন আম্মুর সেই প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে ছিলো না।

আল্লাহর কাছে মনে মনে বল্ললাম, আল্লাহ তুমি আমার মাকে নিয়ে যেও না। আমি যদি জীবনে কোন ভালো কাজ করে থাকি, সেই কাজের বিনিময়ে আমার মাকে আমাদের মাঝে রেখে দাও।

মনের মধ্যে শুধু আমার ভাই আবির আর বোন ফাতিমার চেহারাটা ভাসছিলো। ওরা তখন অনেক ছোট। ছোট বোনটা কেবল ক্লাস ফাইভে পড়ে। মা ছাড়া ওদের জীবনটা কেমন হবে ভাবতেই আমার বুকটা কেঁপে উঠলো, শরীর নিথর হয়ে গেল। মায়ের সাথে কাটানো শেষ মুহুর্তগুলো এখনো আমার স্পষ্ট মনে আছে।

এরপর একদিন মাকে হাসপাতালা থেকে আমরা বাড়িতে নিয়ে এলাম। কিন্তু আম্মু আর বিছানা থেকে কোনদিন উঠতে পারেনি। বিছানায় শুয়েই অবশেষে মা জীবনের শেষ নি;শ্বাস নিল। দিনটি ছিলো ১৭ই রমজান।

সবাই আমাকে বোঝালো, মা নাকি খুব সুন্দর একটা সময়ে এই পৃথিবী ছেড়ে গেছেন। রমজান মাস এর থেকে পবিত্র আর ভালো সময় কি হতে পারে! নিশ্চয়ই আমার আম্মু জান্নাতবাসী হবেন। মনকে বোঝালাম, আল্লাহর উপর আস্থা রাখলাম। হয়ত এর মধ্যেই ভালো কিছু ছিলো।

মাত্র ৪৬ বছরের জীবনে, আমার মা জীবনের সব হিসেব চুকিয়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। আম্মুর সাথে সাথে তার জীবনের গল্প, অধ্যায়গুলিও যেন শেষ হয়ে গেল। একই সাথে আমাদের জীবন থেকে চলে শেষ হয়ে গেল মায়ের আদর, শাসন আর ভালোবাসার মত বিষয়গুলো। এর পরের দিনগুলো আর মনে করতে চাই না।

আম্মুকে ছাড়া অনেক ঝড়-ঝঞ্জাট পাড়ি দিয়েছি আমরা সবাই। আম্মু মারা যাওয়ার পরএকটা বড় সময় লেগেছে আমাদের পরিবারে আম্মুর শুন্যস্থান এর ধাক্কাটা সামলাতে। কিন্তু সময় তার গতিতে চলতে থাকে। কোন কিছুই থেমে থাকে না এই পৃথিবীতে। এর পরে কেটে গেছে অনেক বছর। সময় এবং জীবন অনেক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে এর মাঝে।

অতঃপর আম্মু চলে যাওয়ার প্রায় ৬ বছর পর, ১ অক্টোবর রাতে ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার ইউসিএল হাসপাতালে আমি আবার এক মা কে ফিরে পেলাম। 

দীর্ঘ ১৭ ঘণ্টার প্রচন্ড যন্ত্রনাদয়ক লেবার পেইনের পর আমার সন্তান আফরিন এই পৃথিবীতে এল। সাদা স্যডেলে মোড়ানো ছোট্ট ফুটফুটে একটা পরীকে ডাক্তার আমার কোলে তুলে দিল। আমাদের ছোট্ট আফরিন, আমার নতুন বুড়ি মা!

সেদিন আফরিনকে কোলে নিয়ে কেন জানি খুব আম্মুকে আরেকবার দেখতে ইচ্ছা করছিলো। আরেকটা বার যদি সুযোগ পেতাম, মা কে দেখার, মা কে জড়িয়ে ধরার! তাহলে, শুধুই বলতাম, “মা তোমাকে অনেক ভালোবাসি, তোমাকে অনেক মিস করি, তোমাকে অনেক অনেক কষ্ট দিয়েছি, মাফ করে দিও আমাকে মা”।

  • সুমাইয়া মাহমুদ, ক্যালিফোর্নিয়া, যুক্তরাষ্ট্র  

আরও পড়ুন- পর্তুগালে উচ্চ শিক্ষা; বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য ও ভর্তি প্রক্রিয়া

প্রবাসীদের সব খবর জানতে; প্রবাস কথার ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.