Featured অন্যান্য ইউরোপ

একখন্ড বাংলাদেশ আমি যেন হল্যান্ডের বুকে রেখে এলাম

Amsterdam, The Netherlands- হল্যান্ডে তখন বসন্ত শেষ। গ্রীষ্ম আসি আসি করেও আসছে না। পাতারা তখনো সতেজ সবুজ। পুরোনো হয়নি, ধুলো জমেনি। শিরশিরে সামুদ্রিক হাওয়া জামার ফাঁক-ফোকর দিয়ে গায়ে বিঁধছে। চিকচিকে রোদের আলো হাওয়ায় এলোমেলো। এমনি এক দিনে রাজধানী শহর আমস্টারডামে গিয়ে পৌঁছলাম।

আমস্টারডামে গায়ে গায়ে বাড়ী। এপাড়া থেকে ওপাড়া হাঁটি। কাঁচ দেওয়া বড় বড় জানালার ও ধারে কি আছে, দেখার চেষ্টা করি। হেঁটে হেঁটে ক্লান্ত হয়ে এক বাড়ির ধারে, খালের পাড়ে বসে পড়ি।
মনে হচ্ছিলো- দু’টাকার চিনে বাদাম কিনে খাই। হাঁটতে হাঁটতে কিঞ্চিৎ খিদে লেগেছে। বাদাম হচ্ছে আটকা খিদেয় টাটকা খাদ্য। বাদাম কেনা হলো, খাওয়াও হচ্ছে। কিন্তু খোসা ফেলার জায়গা অনেক দূরে। পকেটে কাগজ টাগজও নেই যে, খোসা ছাড়িয়ে পাশে রাখবো। ভাবলাম, এত আরাম করে বসেছি, উঠলে মুড নষ্ট হয়ে যাবে। হয়তো বাদাম খেতে আর ইচ্ছে নাও হতে পারে। আমার আবার মেয়ে মানুষের মন। কথায় কথায় ‘মুড ‘ নষ্ট হয়।
লে হালুয়া,যা হয় হোক। বাদামের খোসা খালে ফেলবো। রমনা পার্কে কত খোসা ফেললাম। রমনার ঘাস,বাদাম দিয়ে করেছি সর্বনাশ। আশেপাশে চেয়ে দেখি তেমন কেউ নেই। আস্তে আস্তে খালে খোসা ফেলে বাদাম খাচ্ছি। আর মনের সুখে গান গাইতে গাইতে পা দোলাচ্ছি। 
হঠাৎ শুনি-

‘এই যে, ভদ্দরলোক। খালে খোসা ফেলছেন কেন? খাল কি আপনার বাপ-দাদার?’

ভাবলাম- ‘সেরেছে রে, ধরা খেয়ে গেছি। এখন কি করি? পারলে, খালে ঝাঁপ দিয়ে পড়ি।’

পেছন ফিরে দেখি- এক অতি সুদর্শনা ,মাঝারী গড়না, নীল নয়না চোখ বড় বড় করে চেয়ে আছে। কিঞ্চিৎ বিরক্ত, রাগান্বিত।
আমি বললাম- ‘আপা, ভুল হয়ে গেছে । তওবা করছি ,মাফ চাইছি। আর এ রকম ভুল ইহজনমে হবে না। আপনি বললে দশবার কান ধরে উঠবোস করতে রাজি আছি।’

আমার কথা শুনে মেয়েটি হেসে কুটিকুটি। সে বললো- সে পেছনের ওই বড় জানালাওয়ালা বাড়ির তিনতলায় থাকে। সে ওখান থেকে আমার বাদাম খাওয়া দেখেছে। তাই নেমে এসেছে।
জিজ্ঞেস করলো- ‘তোমার দেশ কোথায়?’

চিন্তা করলাম- দেশের নাম বলা যাবে না। যে কাম করেছি তাতে শরমের ব্যাপার। পাকিস্তান বলে চালিয়ে দেই। বিশ্ব বাজারে এমনিই পাকিস্তানের ইজ্জত নেই। আমার জন্য না হয়, আর একটু গেলো।

আমি বললাম- ‘পাকিস্তান’। সে বললো- ‘ও আচ্ছা’। আর কথা বাড়ালো না। পাকিস্তানের কথা বলায় সে খুশী হলো, কি হলো না- তা আর জানা হলো না। কিন্তু আমরা খুব ভালো বন্ধু হলাম। তার নাম নোরা। আমরা ক’দিন আঠার মতো লেগে রইলাম। সারা শহর এ মাথা ও মাথা ঘুরে বেড়ালাম।

এয়ারপোর্টে এসেছি। যাবার বেলায় তাকে বললাম- ‘আমি একটা মস্ত অপরাধ করে ফেলেছি রে।’
‘বাদামের খোসা ফেলার চেয়েও বড় অপরাধ?’ – বলে সে হেসে উঠলো।
আমি বললাম- ‘আমি পাকিস্তানী নই। আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি।’
এবার তার চোখ ছলোছলো।সে বললো- তার এক বোন বাংলাদেশ থেকে দত্তক নেয়া। সে পঁচিশ বছর ধরে তার বাবা-মাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। তার জন্ম শেরপুরে। খুঁজে পাচ্ছে না।

আমি ভাবলাম- এত কাছে গিয়েও সেই বাঙ্গালী মেয়েটির সাথে দেখা হলো না। এ আফসোস কোথায় রাখি ! আগে কেন আমার দেশ বাংলাদেশ বললাম না। এই ব্যথা বুকে নিয়ে প্লেনে চড়লাম। কিন্তু শুধুই মনে হতে লাগলো, একখন্ড বাংলাদেশ আমি যেন হল্যান্ডের বুকে রেখে এলাম।

  • উত্তম বিশ্বাস, ভার্জিনিয়া, যুক্তরাষ্ট্র।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.