Featured এশিয়া সিঙ্গাপুর

উদ্যোমী এক বাংলাদেশি ইঞ্জিনিয়ারের প্রবাস জীবন, পর্ব- ০৩

শেয়ার করুন

হঠাৎ কে যেনো দূর থেকে ডাকছে, “নাজমুল…নাজমুল…নাজমুল, আর ইউ ওকে? নাজমুল, আর ইউ লাইভ? চোখ খুলে তাকিয়ে দেখি সারা আমার সামনে দাঁড়িয়ে আমাকে ডাকছে। সারার চোখ-মুখ ফোলা, লাল রঙের ড্রেস পরা। সকালে সে কালো ড্রেস পরে ছিলো, কিন্তু এখন লাল।

আমার প্রচন্ড ক্লান্ত লাগছে, অনেক কষ্টে বসা থেকে উঠে দাঁড়ালাম। বুঝতে পারলাম, দোয়া পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পরেছিলাম। এজন্য হয়তো মনে হচ্ছিলো দূর থেকে কেউ ডাকছে, আসলে সারা আমার সামনেই ছিলো। সারাকে দেখে যেমন সাহস পেলাম তেমনি রেগেও আছি, কেন তার আসতে এতো দেরি হলো? কিন্তু আমার রাগটা প্রকাশ করলাম না। প্রকাশ করার মতো শক্তি, ইচ্ছা ও সময় কোনোটাই ছিলোনা।

সারাকে বললাম, “আমার কাজ শেষ, তুমি সার্ভারে লগইন করে সব চেক করে নাও।” সারা সার্ভার এর সামনে দাঁড়িয়ে লগইন করছিলো আর বার বার বলছিলো “আই এম সো সরি নাজমুল, আই ডিড ম্যাচআপ।” ১৫ মিনিট পর সারা বললো “নাজমুল এভরিথিং ওকে, লেটস গো।”

আমি সার্ভিস রিপোর্ট রেডি করতে গিয়ে চিন্তায় পরে গেলাম, চেক-আউট টাইম কয়টা লিখবো! ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি প্রায় রাত ১০টা বাজে, মানে আমি ১২ ঘন্টা এই কাজে আটকা, আর সেটা তো রিপোর্টে লিখতে পারবো না। আমার বস এই কাজের জন্য ১২ ঘন্টা ওভার টাইম দিবে না। আর তাই চেক-আউট টাইম ১টা লিখে সারা কে বললাম, রিপোর্টে সাইন করতে।

সারা বললো নাজমুল, “ক্যান ইউ রাইট চেক-আউট টাইম টেন পিএম? সারাকে বুঝলাম দুই ঘণ্টার কাজ করতে এসে ১২ ঘন্টা আটকে ছিলাম আর তাই আমার বসকে আমি ১২ ঘন্টা ওভার টাইম জাস্টিফাই করতে পারবো না। সারা আর কথা না বলে সার্ভিস রিপোর্টে সাইন করে দিলো।

ডাটা সেন্টার থেকে বের হয়ে সোজা সমারসেট ট্রেন স্টেশনে চলে আসলাম। সারা আমাকে ফলো করতে করতে ট্রেন স্টেশনে চলে আসলো, আর ডিনার করতে আমাকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছিল। বুঝতে পারলাম আমাকে ডিনার করাতে পারলে সে নিজেকে হয়তো হালকা করতে পারবে। কিন্তু আমার মাথায় এসব কিছু যায় আসে না। কারণ মৃর্তুর কূপ থেকে বেঁচে এসেছি, এর চেয় বড় আর কি হতে পারে?

পর দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলাম ১১টা মেসেজ, সব গুলোতেই একটা কমন শব্দ সরি। বুঝতে পারলাম এটা সারার মোবাইল থেকে এসেছে। কোনো উত্তর না দিয়ে মোস্তফা এলাকায় গিয়ে গুরু ট্রাভেল থেকে ঢাকার রাতের  একটা ফ্লাইট টিকেট কাটলাম। বসকে একটা মেসেজ দিয়ে, মোবাইল বন্ধ করে একদিনের জরুরী ছুটি সহ তিন দিনের জন্য ঢাকা চলে গেলাম।

ঢাকা থেকে ফিরে মোবাইল খুলে দেখতে পেলাম সারা এই কদিনে ৩০ বারের বেশী কল দিয়েছে। ১৫টা মেসেজ দিয়েছে। অফিসে গিয়ে জানতে পারলাম, সারা অনেক বার অফিসেও কল দিয়ে জানতে চেয়েছে আমি কোথায়। বুঝতে পারলাম সে কিছু একটা বলতে চাচ্ছে। এবার তার মেসেজের উত্তর দিলাম “হোয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট? সারা উত্তর দিলো- “লাঞ্চ এট কেঅফসি ১২:৩০পিএম শার্প এট বুজিস জাঙ্কশন।”  আমি রিপ্লাই দিলাম “ওকে”।

এটাকে আপনি ডেট লাঞ্চ বলতে পারেন, কিন্তু আমার জন্য ছিলো কৌতুহলী লাঞ্চ। আমার জানার খুব আগ্রহ ছিলো, সেই দিন কি হয়েছিলো? কেনো সে ১২ ঘন্টা পরে ডাটা সেন্টারে এসেছিলো? কি এমন জরুরী কাজ ছিলো তার? সব উত্তর জানতে লাঞ্চ করতে চলে গেলাম। গিয়ে দেখি সারা আমার জন্য খাবার সহ টেবিলে অপেক্ষা করছে। সিটে বসে জিজ্ঞাস করলাম কি হয়েছিলো সেদিন? সারা বললো কোথা থেকে শুরু করবো বুঝতে পারছিনা। আমি বললাম ডাটা সেন্টারে আমাকে রেখে কোথায় গিয়েছিলা? এবার সারা বলা শুরু করলো…

তোমাকে রেখে আমি আমার বয় ফ্রেন্ড এর সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। আমরা একসাথে লাঞ্চ করে, মুভি দেখে, কেনাকাটা করে একটা কফি শপে বসে যখন কফি খাচ্ছি হটাৎ ওর মোবাইলের মেসেজ এ গিয়ে দেখি কিছু প্রাইভেট ইন্টিমেসি মেসেজ যেটা সে তার আগের গার্ল ফ্রেন্ড এর সাথে লিখা। ও আমার সাথে প্রমিস করেছিল তার সাথে আর কোনো দিন যোগাযোগ করবেনা। সেটা দেখে আমার মাথা ভীষণ খারাপ হয়ে গিয়েছিলো। রেগে গিয়ে ওর আর আমার মোবাইল ভেঙ্গে ফেলেছি। ওর সাথে অনেক জগড়া হয়েছে, তারপর রাগে বাসায় গিয়ে কাঁন্না কাটি করেছি এবং গোসল করে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।

আমি রেগে গিয়ে বললাম তুমি কি মানুষ নাকি কচ্ছপ? আমাকে মৃত্যুর কোলে ফেলে তুমি বাসায় গিয়ে ঘুমাচ্ছিলে? ওর মুখ লাল হয়ে গেছে, মনে হচ্ছে আর কিছু বললে কেঁদে ফেলবে। এবার নিজেকে সামলে নিয়ে হেসে বললাম তার পর কি হলো? তোমার বয়ফ্রেন্ড বুঝি তোমার বাসায় এসে আমাকে রক্ষা করতে বললো? ও আমার দিকে তাকিয়ে আমাকে আবার বললো “নাজমুল আই এম রিয়েলি সরি”।

তারপর আবার বলা শুরু করলো… ঘুম থেকে উঠে টিভিতে মুভি দেখছিলাম হঠাৎ মনে হলো ওর কাছে একটা চিঠি লিখি- আওয়ার রিলেশন এন্ড হেয়ার। লিখতে গিয়ে স্টাডি ডেস্ক এ একটা সুন্দর সান মাইক্রোসিস্টেম এর কলম পেলাম। তখন চিন্তা করছিলাম কলমটা কোথায় পেলাম? পরে সব মনে পড়েছে…সকালে তুমি দিয়েছিলে আর তুমি তখন ডাটা সেন্টারে হয়তো আটকা আছো। তাই দ্রুত ডাটা সেন্টারে তোমার সাথে দেখা করতে এসেছি। তার পরের ঘটনা সবই তুমি জানো .. বলে সে চুপ করে আছে।

আমি বললাম- “যা হয়েছে সব ভুলে যাও কিন্তু আর কখনো এই রকম করোনা। লাঞ্চ এর জন্য তোমাকে ধন্যবাদ, আমাকে এখন অফিস যেতে হবে। যখন চলে আসবো তখন পিছন থেকে ডেকে বললো, “নাজমুল আই থিঙ্ক আই লাইক ইউ”। আমি হেসে বললাম “ডোন্ট গো বিয়ন্ড দিস”।

সময়টা ছিলো ২০০৭ সাল তখনও হোয়াটসএপ, ভাইবার, ফেইসবুক ছিলোনা। যোগাযোগ বলতে মোবাইল, মেসেজ। তিনদিন হয়ে গেছে এর মধ্যে সারা অনেকগুলো মেসেজ দিয়েছে, যার কোনোটার উত্তর আমি দেয়নি। একদিন সকালে আমাদের কল সেন্টার থেকে কল দিয়ে পলিন জানালো, আমাকে জরুরী সিংটেল যেতে হবে, একটা সার্ভার এ সমস্যা হয়েছে।

আমি ভেবেছিলাম সারা তাই কল সেন্টারে পলিনকে জিজ্ঞাস করলাম, কাস্টমার এর নাম কি? ও বললো মিঃ তান। আর কোনো প্রশ্ন না করে সোজা চলে গেলাম সিংটেল এর সেই ডাটা সেন্টারে। কিন্তু গিয়ে দেখি সারা দাঁড়িয়ে আছে। দেখে আমার মেজাজ খারাপ হলো কিন্তু কিছু বললাম না। তাকে বললাম “আমি মিঃ তান এর সাথে দেখা করতে এসেছি। তার একটা সার্ভার এ সমস্যা হয়েছে।”

সারা বললো “মিঃ তান আমার বস, সে ছুটিতে আছে” আমি তার নাম দিয়ে কেস লগ করেছি যেনো তুমি বুঝতে না পারো। ওর কথা শুনে আমার মেজাজ খারাপ হচ্ছে, কিন্ত নিজেকে কন্ট্রোল করলাম। বললাম “কোন সার্ভার এ সমস্যা হয়েছে আমাকে নিয়ে চলো।” ও বললো- “সার্ভারে আমি সমস্যা করেছি আমি নিজেই ফিক্স করতে পারবো। আমি তোমার সাথে সময় কাটানোর জন্য এই কেস লগ করেছি এবং কল সেন্টারে রিকোয়েস্ট করেছি যেন তোমাকে এই কাজে এসাইন করে কারণ তুমি আমাদের সেটআপ সমদ্ধে ভালো জানো।”

এবার আমি রেগে গেলাম, বলাম- “তোমার মাথা খারাপ! আমার আর কাজ নেই, অফিসের সময়ে তোমার সাথে ডেটিং করবো? তাছাড়া তোমাকে আগেও বলেছি, এখনো বলছি আমি বিবাহিত। আমার মনে হলোনা সারা আমার কথা বিশ্বাস করেছে! সে আবার বললো, “নাজমুল আই থিংক আই ফল ইন লাভ উইথ ইউ” আমি আবার বললাম- “সারা তুমি ভুল করছো, আই এম নোট ইউর টাইপ। আমি সত্যি বিবাহিত।” সে আবার বললো “নাজমুল, আই টোল্ড এভরিথিং টু মায় মম এন্ড সি ওয়ান্টস টু মিট ইউ”। বুঝতে পারলাম সে আমার কথা বিশ্বাস করছে না।

এবার আমার মোবাইল থেকে আমার আর আমার ওয়াইফ এর কিছু ছবি দেখলাম। বললাম- এগুলো আমাদের বিয়ের ছবি, সারা আমার হাত থেকে মোবাইলটা নিয়ে অনেক বার একটা একটা করে ১৫-২০ টা ছবি দেখলো | ছবি দেখেই যেকেউ সহজেই বুঝতে পারবে আমাদের বিয়ের ছবি। সে ছবির প্রোপারটিস দেখে ডেটও নিশ্চিত হলো এগুলো কয়েক মাস আগের ছবি। ভালো করে খেয়াল করলাম সারার চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছে।

সারা আমাকে বললো- “নাজমুল ইউ ক্যান গো নাউ।” আমি সারার মানসিক অবস্থা বুঝতে পারলাম। ওকে হালকা করতে বললাম আমার ওয়াইফ খুব শিগ্রই সিঙ্গাপুরে আসছে। সে আসলে আমি তোমাকে ডিনার এর আমন্ত্রণ করবো। সারা বললো- “নাজমুল আই এম সরি হোয়াট হাপেন বাট ডোন্ট ট্রাই টু কন্টাক্ট মি এনিমোর।” আমি আর কিছু না বলে চলে আসলাম।

বেশ কিছুদিন পর আমার এক বন্ধুর সাথে লাঞ্চ এ দেখা, নাম জেফ্রি। ও বললো- “নাজমুল তোমার গার্লফ্রেন্ডটা আমার খুব পছন্দ সে দেখতে একদম হায়ুন জুন এর মতো”। আমি আবার জিজ্ঞাস করলাম- “কার কথা বলছো সারা? কার মতো? ও বললো কোরিয়ান এক্টর হায়ুন জুন। তুমি কি “মাই সাসি গার্ল মুভিটা দেখেছো? আমি বললাম না। তখন সে বললো- “আজ রাতে বাসায় গিয়ে অবশই ডাউনলোড করে মুভিটা দেখবা!

আমি অফিসে এসে ইন্টারনেট এ সার্চ করে দেখলাম সত্যি সারা দেখতে অলমোস্ট হায়ুন জুন এর মতো। এরপর শুধু সারার কথা মনে করে সেই মুভিটা পাঁচ থেকে সাতবার দেখেছি। আমার ওয়াইফ সিঙ্গাপুরে আসার পরও ওকে নিয়ে বেশ কয়েক বার মুভিটা দেখেছি। এর পর থেকে সারা নামটা শুনলেই কেন যেনো সারা আর (My Sassy Girl) এর ক্যারেক্টারটা চোখের সামনে ভাসতে থাকে।

  • নাজমুল খান, সিঙ্গাপুর।  

গত পর্বের লিঙ্ক- উদ্যোমী এক বাংলাদেশি ইঞ্জিনিয়ারের প্রবাস জীবন, পর্ব- ০২

প্রবাসীদের সব খবর জানতে; প্রবাস কথার ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.